ধর্ষণ গুরুতর অপরাধ: কোনো অজুহাতই গ্রাহ্য নয়

পূরবী বসু: চট্টগ্রামের বিস্তার সাহিত্য গোষ্ঠীর মাহিয়া আবরারের কাছ থেকে সদ্য আসা পোস্টারটি যা এই লেখার সঙ্গে গাঁথা রয়েছে, আমার আজকের মন্তব্যের প্রণোদনা। দেশে তথা উপমহাদেশে এবং যুদ্ধপীড়িত দেশগুলোতে যে হারে ধর্ষণ বেড়ে চলেছে তাতে বলতেই হয়, বিবেকবান মানুষের সহনশীলতা ও ধৈর্যে্যর সীমা পার হয়ে গেছে এতোদিনে। আমার নিজের দেশে আজ ছাব্বিশ বছর ধরে চলছে নারী সরকার প্রধানের রাজত্ব। প্রতিটি মন্ত্রীসভা আলোকিত করে বহাল রয়েছেন বেশ কয়েকজন নারী মন্ত্রী। আইন প্রণয়নের সুতিকাগৃহ সংসদে সাধারণ নির্বাচনে জিতে আসা নারী সাংসদরা ছাড়াও নারীর জন্যে সংরক্ষিত আসনে বসে আছেন সমাজের বেশ কিছু মান্যগণ্য নারী আইন প্রণেতা। সহস্রের মধ্যে ছেঁকে তোলা হয় বলে এঁরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশের নেত্রীস্থানীয় নারী হবার কথা। তবে দলীয় স্বার্থে সবসময় মনোনয়ন ঠিকভাবে না হলেও এক উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সমাজের নেত্রীগোছের নারী রয়েছেন সেখানে। এছাড়া, ইউনিয়ন কাউন্সিল, পৌরসভার প্রতিটি কেন্দ্রে আইন অনুযায়ী নারী নেতৃত্বের উপস্থিতি এখন বাধ্যতামূলক।

কিসিঞ্জার উল্লেখিত এককালের ‘তলাবিহীন ঝুড়ির দেশ’ বাংলাদেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। সেই সেই সঙ্গে রেকর্ড গড়া বিদেশী রেমিটেন্স ও রপ্তানী শিল্পে, বিশেষ করে বস্ত্রশিল্পের, অকল্পনীয় সাফল্যে (প্রধানত নারী শ্রমিকের কারণেই) দেশের অর্থনীতি সচল ও চাঙ্গা। রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক এই সাফল্যের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে স্বাস্থ্যখাতেও অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে। মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে, শিশু মৃত্যুর হার কমেছে, সফল হয়েছে পরিবার-পরিকল্পনা প্রকল্প। এমন কি মাতৃত্বজনিত মৃত্যুর হারও শেষ পর্যন্ত কমেছে। সংক্রামক ব্যাধির প্রতিশেধক টিকা কর্মসূচির সাফল্যের সঙ্গে কলেরা, পেটের অসুখের মতো অনিবার্য ও বিধ্বংসী মহামারী ওর স্যালাইনের মতো অতি-সহজ ও সস্তা উপকরণে দমন করা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ অর্জনের উদাহরণ।

তবে উন্নতি কেবল অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক বা স্বাস্থ্য খাতেই হয়নি, সরকারি উদ্দীপনায় ও ইতিবাচক কিছু নীতি গ্রহণে এবং এনজিওগুলোর কর্মতৎপরতায় নারী শিক্ষার অগ্রগতি, বিস্তারও চমকপ্রদ। নারীর মৌলিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হার, এমন কি তাদের মধ্যে উচ্চতর শিক্ষার সম্প্রসারণ আজ ঈর্ষণীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে।

দেশের সার্বিক এই উন্নয়ন ও প্রগতির সঙ্গে একেবারেই বেমানান ধর্ষণসংক্রান্ত অপরাধের এই উর্ধ্ব গতি। যত্রতত্র শহর-গ্রাম, সকল শ্রেণীর ধনী-দরিদ্র, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, সকল ধর্মের, সকল জাতিসত্তার নির্বিশেষে মেয়েদের ওপর দিনের পর দিন নির্বিচারে ধর্ষণের ঘটনা ও ধর্ষকের শাস্তি না পাওয়ার কাহিনি শুনে শুনে আমাদের পিঠ এখন দেয়াল ছুঁয়ে গেছে। কিছু একটা করতেই হবে। একই রকম জঘন্য ঘটনার এতো ঘন ঘন পুনরাবৃত্তি আমাদের সমাজ কাঠামোর চেহারা কোথায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছে, তা ভাবার সময় এসেছে আজ।

এই অবস্থায় দশ বছর বয়সী কন্যার শ্রমিক পিতা যখন তার শিশু কন্যার ধর্ষণের বিচার না পেয়ে, নিজের অসহায়ত্ব সইতে না পেরে কন্যাসহ ট্রেনের নিচে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন, যখন হিজাব পরেও তনু ধর্ষিত ও খুন হয়, নিজের স্কুল ঘরে দিনেদুপুরে ধর্ষণের শিকার হয় কিশোরী ছাত্রী, এমন কি যখন এই রাজধানীতে বন্ধু বা পরিচিতের দেয়া জন্মদিন বা অন্য কোনো অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রিত হয়ে ধর্ষণের মতো ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় উচ্চ মধ্যবিত্ত ঘরের শিক্ষিতা নারীকে, তখন কষ্টের চেয়েও বেশি ঘৃণায় ও রাগে শরীর জ্বলে যায়। প্রায় সব জায়গায় মৌলিক কাহিনি কিন্তু এক। ধর্ষিতা দুর্বল। অথবা অপেক্ষাকৃত দুর্বল। সে একজন নারী এবং তার পেশীশক্তি কম। এই শারীরিক দুর্বলতার জন্যে ততটা নয়, যতটা ঘটে ধর্ষকের সামাজিক অতিরিক্ত প্রতিপত্তি ও ক্ষমতার দাপটে বা সম্পদের প্রাচুর্যে।

এসব বিবেচনায় মেয়েটির কমজোর হবার খেসারত দিতে হয় বিনা শব্দে বা প্রতিবাদে ধর্ষণকে মেনে নিয়ে। হয়তো মেয়েটির পরিবার গরিব। হয়তো ক্ষমতাহীন; সামাজিক বলয়ে অবস্থান হয়তো অপেক্ষাকৃত নিচে। অথবা সংখ্যায় তারা হয়তো স্বল্প- ধর্মে বা জাতিসত্তার বিচারে। তাদের ওপর সংঘটিত কুকর্মের অপরাধী জানে, অপরাধের শিকারদের কোনো খুঁটির জোর নেই যা দিয়ে তাকে প্রতিহত করা চলে। ফলে গর্বে বুক ফুলিয়ে চলে সে। এদিকে সমাজকর্মী, নেতা, পাড়াপ্রতিবেশী, বন্ধু, খবরের কাগজ বা টেলিভিশনসহ যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ধর্ষণের সংবাদ পরিবেশনে থেকে যায় প্রচণ্ড সংবেদনশীলতার অভাব।

প্রকট দায়িত্বহীনতার আভাস পাওয়া যায় অনায়াসেই তাদের অনেকের কথাবার্তায়, আলোচনায়, পরিস্থিতির মূল্যায়নে। পরিণতিতে এই বিষয়টি গোটা সমাজ ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সুযোগমতো ধর্ষকের গা ঢাকা দেবার কারণেই হোক, বা তার বা তার পরিবারের অর্থ বা সন্ত্রাসের সঙ্গে মৈত্রীর কারণেই হোক, এই অপরাধের সংবাদ পরিবেশনে অপরাধের শিকার মেয়েটির কথা, তার পরিচয় ও ছবি যতটা লোকচক্ষুর সামনে ফলাও করে তুলে ধরা হয়, অপরাধীর কথা, ছবি, তার অতীত, পারিবারিক ইতিহাস ততটা স্পষ্টভাবে উন্মোচিত হয় না। ফলো-আপ তো হয়ই না। ফলে কত নিরপরাধ নারী যে কোনো সুবিচার না-পেয়ে এবং সামাজিক নিগ্রহ সইতে না পেরে আত্মহত্যা করে তার হিসাব নেই। আমি তাদের উদ্দেশ্য করে সম্প্রতি ‘পদ্মস্নান’ শিরোনামে একটি কবিতা লিখি। এতে ধর্ষণ বা তার গুরুত্ব লঘু করে দেখতে আমি মোটেও চাইনি। আমি শুধু দোষীর বিচার না পাওয়া ঐ অপরাধের শিকার মেয়েকে বলতে চেয়েছি- জীবন অনেক বড়। অন্যের অপরাধের শাস্তি সে নিজে কেন গ্রহণ করতে যাবে? বিচারক বা আইন প্রয়োগকারী তাদের কর্তব্যে হেলা করেছেন বলেই মেয়েটির জীবন মূল্যহীন হয়ে যেতে পারে না। ফলে জীবনের স্বাদ থেকে কেন সে নিজেকে বঞ্চিত করবে? নিচে আমার লেখা ‘পদ্মস্নান’ কবিতাটি তুলে দেওয়া হলো।

পদ্মস্নান
কাঁদিস্‌ না আর, ওঠ এবারে, দূর করে দে ভয়,
মনে রাখিস্‌ এমনি করেই আমাদের বেঁচে থাকতে হয়।
পুলিশ-ডাক্তার সব করেছিস, সব বলেছিস্‌, সঙ্গে ছিল মায়,
তবু তারা গা করে না, রা’ করে না, রিপোর্ট লিখে যায়।
যা পাগলী, পুকুর ঘাটে, গোসল সেরে আয়
ঘষে মেজে নাইবি যাতে নোংরা মুছে যায়।
কান্না কীসের? বলি মেয়ে, চোখে কেন জল?
এমন কী আর হয়নি কারো নিজের মুখেই বল্‌!
গেল বছর চৈত্র মাসের কালবৈশাখীতে,
জয়া গেল ঝড়-তুফানে আম কুড়াইতে।
কোথায় আম! কোথায় জয়া! সন্ধ্যা নামে ঘাটে
বেহুঁশ মেয়ে খুঁজে পেতে সারাটা রাত কাটে।
ভাগ্য তবু ভালো জয়ার, বেঁচে তো সে আছে!
মুখে রা’ নেই, যদি আরো ক্ষতি হয় তার পাছে।
আরো ক্ষতি? সে কী জিনিস জানতে আমি চাই,
ওরা বলে, ‘হতেই পারতো জীবনটাই আর নাই’।
তাইতো বলি, কান্না ভুলে ওঠ্‌ এবারে, স্নানটা সেরে আয়
জানিস্‌ না কি পদ্মপুকুর জলে সকল ময়লা ধুয়ে যায়!

আসলেই মেয়েটি তো কোনো অপরাধ করেনি! কিন্তু অন্যায়ের, ভয়ঙ্কর এক অপরাধের শিকার হয়েছে সে। তাহলে এই অপকর্মের লজ্জা তাকে কেন বহন করতে হবে? নিজ জীবনাবসানই বা করবে সে কোন যুক্তিতে? লজ্জা যদি কারো পেতে হয়, পাবে দোষী নিজে, পাবে আমাদের মতো ভীতু ও নির্জীব সামাজিক জীব যারা সবকিছু চেয়ে চেয়ে দেখি আর চুপ করে বসে থাকি।

আরো একটি কথা, আমাদের সমাজে বা যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্ষণকে আজো প্রায়ই সরাসরি ‘ধর্ষণ’ বলে উল্লেখ না করে বলা হয়, মেয়েটির শ্লীলতাহানি ঘটেছে। কেউ বলবে তার ইজ্জত লুট হয়েছে, কেউ বলবে তার সতীত্ব খোয়া গেছে, তাকে কলঙ্কিনী করা হয়েছে। এসব শব্দ প্রয়োগ নারীর জন্যে অবমাননাকর। নারীর মানসম্ভ্রম এতোটা ঠুনকো নয় যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত অনুপ্রবেশ তার সম্ভ্রম-শালীনতা-শ্লীলতা লুট করে নিয়ে যাবে, তার ইজ্জত হবে ধূলিধূসরিত। ওদিকে আবার কোনো সাহসী, আধুনিক সাংবাদিক হয়তো বলে বসবেন, মেয়েটিকে যৌন নির্যাতন করা হয়েছে। এই শেষের বাক্যটিও অপরিচ্ছন্ন, কেননা এখানে যৌন নির্যাতনের পরিষ্কার ধরণ বা মাত্রা বোঝা যায় না। যৌন নির্যাতন হতে পারে বহুমাত্রিক অন্যায় এক আচরণ, আর ধর্ষণ হলো একটি সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট অপরাধ, যা অবশ্যই অন্যতম চরম যৌন নির্যাতন।

আজ আমার অনুরোধ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, তাঁর মন্ত্রী পরিষদ ও সংসদ সদস্যদের কাছে, সকল শুভবুদ্ধির মানুষের কাছে। আমাদের বলার সময় এসেছে এখন ১. ধর্ষণকে অতি জঘন্য ও নিম্নশ্রেণীর একটি অপরাধ বলে চিহ্নিত করে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দোষী ব্যক্তিদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে জনসম্মুখে তাদের যথোপযুক্ত শাস্তি দেবার ব্যবস্থা নিশ্চিত করুন। ২. সেই দোষী ব্যক্তি ও তার অপরাধ এবং শাস্তির সংবাদ গুরুত্ব সহকারে সকল যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করুন যাতে অন্যরা এই ধরনের দুষ্কর্মে লিপ্ত হবার সাহস সঞ্চয় করতে না পারে। ৩. ধর্ষণের বিচার সবসময় অপরাধের নিজস্ব গুরুত্বেই পরিচালিত হবে। সেখানে অন্য কোনো অছিলা বা অজুহাতকে গ্রাহ্য করা হবে না।

মেয়েটির কাপড়চোপড়, ব্যবহার বা জীবনযাপন, যেমন, ব্যক্তিগতভাবে সে একাধিক পুরুষসঙ্গে অভ্যস্ত কিনা, সে ওড়না পরেছে নাকি টাইট-ফিট কামিজ পরেছিল, রাতে-বিরাতে ঘরের বাইরে রাস্তায় প্রায়ই হাওয়া খেতে বের হতো কিনা, একা একা মোড়ে দাঁড়িয়ে পরপুরুষদের সঙ্গে কথা বলত কিনা, এমন কি সে পেশায় যৌনকর্মী কিনা, সেসবই হবে ধর্ষণ বিচারের বহির্ভূত ব্যাপার। কোনো কারণে মেয়েটির চলাফেরা, কাজকর্ম, কথাবার্তা, পোষাক, তার জীবনযাপন আমরা যদি পছন্দ না করি, আমাদের অধিকার রয়েছে সামাজিকভাবে তাকে বয়কট করার। তার সঙ্গে না মেশার, এমনকি কথাবার্তা না বলার। কিন্তু তাই বলে একটি নারীকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে, তার ব্যক্তিসত্তাকে বুড়ো অঙুল দেখিয়ে জোর করে ভোগ করবে কেউ, আর সেই অসভ্যতা, বিশাল অন্যায় নির্বিচার মেন নেবে সবাই- কোনো মতেই তা হতে পারে না আমাদের দেশে।

মানবো না তা আমরা কেউ-ই। আর এতেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে সকলকে। এ ধরনের অপরাধ যে করে, সে রক্ষা বা মুক্তি পাবে না, সে যেই হোক না কেন, এমন সামাজিক কাঠামো তৈরি করে নারীদের ওপর সংঘটিত অন্তত এই একটি অপরাধকে, ধর্ষণকে, দমাতে সহযোগিতা করুন সরকার তাঁর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে কঠিন হাতে। সমাজে নারী নির্যাতন তাতে যে একেবারে কমে যাবে, মনে হয় না। কেননা মেয়েরা শুধু বাইরেই অ-নিরাপদ নয়, গৃহের অভ্যন্তরেও তারা অহরহ নির্যাতিত হচ্ছে। পরিসংখ্যান বলে, প্রতি ৫টি বিবাহিতা মেয়ের মধ্যে ৪ জনই শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের শিকার। অবিবাহিতাদের নির্যাতিত হবার সঠিক পরিসংখ্যান জানা না গেলেও আঁতকে ওঠার মতো সংখ্যা হলেও আমি চমকাবো না। কেননা, ঘরের অভ্যন্তরে ঘনিষ্ঠ আত্মীয় বা পারিবারিক বন্ধুরাও যে সবসময় কোমলমতি মেয়েদের সঙ্গে দায়িত্বপূর্ণ ব্যবহার করে না, তার নজির তো পেয়েছি আমরা আমাদের দেশের নির্ভীক নারীদের আত্মস্মৃতিতে। হায়রে, আমাদের পিতামাতা! তাঁরা ভাবেন পাত্রস্থ করতে পারলেই কন্যা নিরাপদ থাকবে। ভয় তাদের শুধু অবিবাহিতা কন্যাদের নিয়ে। তাও বাইরের অনিয়ন্ত্রিত পরিবেশের কারণে। কিন্তু কোনো বয়সেই কোনো নারীই যে কোথাও নিরাপদ নয়, এটা যদি তারা বুঝতেন! বিবাহের রক্ষাকবচ তাদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ।

আর যারা ধর্ষিতা মেয়েটিকে সম্ভ্রমহারা, ইজ্জতলোটা, চরিত্রহীনা, জাতিচ্যুত, কলঙ্কিনী বা অসতী বলে আখ্যা দেন, তাদের মনে করিয়ে দিতে চাই একটা সত্য। আমাদের জাতির সাহসিকতার সেই ইতিহাসের কথা। তাদের মনে করিয়ে দিতে চাই, যে দেশের স্বাধীনতার জন্যে সে দেশের লক্ষ লক্ষ নারী ধর্ষিতা হয়েছিল পাকসেনা বাহিনীর দ্বারা, যুদ্ধ শেষে স্বাধীনতার পর সরকারের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের সর্বোচ্চমণ্ডলীর অনুমোদনে যারা একদিন পুনর্বাসিত হয়েছিল, সেই দেশের সন্তান হয়ে এই জঘন্যতম অপরাধের শিকারদের অশ্রদ্ধার চোখে বা হেয় চোখে দেখার কোনো অবকাশ থাকার কথা ছিল না। এই কাজটি করে ধর্ষিতা মেয়েটির সম্ভ্রম নয়, হারাতে বসেছি আমরা আমাদের চিরন্তন মূল্যবোধ, শুভ-অশুভের স্বাতন্ত্র, শ্লীলতা-শোভনতার সচেতনতা। আমাদের মানবিকতা, সংবেদনশীলতা সকল অমসৃণ পথ পার হয়ে এসে সহজে স্বস্থানে নিজ জন্মভূমিতে অবশেষে পুনর্বাসিত হোক।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

রাইজিংবিডি