আদালতপাড়ায় নিরাপত্তাহীন বিচারপ্রার্থীরা!

জেলার আদালতপাড়া সন্ত্রাসী আর দালালদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বিচারপ্রার্থীরা। জেলার ছয়টি উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত বাদী-আসামি পক্ষের ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীরা আদালতপাড়া থেকে অপহরণের চেষ্ঠা করছে প্রতিপক্ষকে।অপহরণ করে নিয়ে রক্তাক্ত জখম করার ঘটনাও ঘটছে। বেড়েছে দালালদের উৎপাতও।

আদালতে আগত লোকজনের মোটরসাইকেল চুরি হচ্ছে একের পর এক। এসব ঘটনার সঙ্গে কোনো কোনো আইনজীবীও জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে।আদালতপাড়ার ফটকগুলোতে নেই পুলিশি নিরাপত্তা। যেন অরক্ষিত হয়ে পড়েছে মুন্সীগঞ্জ আদালতপাড়া।

আদালতএমতাবস্থায় আদালতপাড়ার নিরাপত্তা জোরদারের দাবি তুলেছেন, আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী ও সাধারণ মানুষেরা। তাদের দাবি, আদালতপাড়ায় জরুরি ভিত্তিতে সিসি ক্যামেরা বসানো উচিত। এদিকে, মুন্সীগঞ্জ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলম (পিপিএম) বলেছেন, বিচারপ্রার্থী ও অন্যান্যদের পুলিশ সদস্যরা চেক করে কোর্ট এলাকায় প্রবেশ করান এবং আশপাশ ও আদালতের বাইরে টহল পুলিশ থাকে। এরপরও অনেক সময় বেশি লোক এক সঙ্গে চলে আসলে একটু সমস্যার সৃষ্টি হয়। এমতাবস্থায় আদালতপাড়ার পুরো এলাকাকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা গেলে কোর্টের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভালো হবে।

মুন্সীগঞ্জ আদালতপাড়ার বাউণ্ডারির ভেতরে জেলা ও দায়রা জজ এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়। পাশেই রয়েছে জেলা ও দায়রা জজের বাসভবনসহ অন্যান্য বিচারক ও জেলা প্রশাসকের বাসভবন। এতো গুরুত্বপূর্ণ এ এলাকাটিতে ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীরা প্রবেশ করে বিচারপ্রার্থীদের অপহরণ করে নিয়ে কুপিয়ে-পিটিয়ে আহত করছেন। আদালতে চুরির মোটরসাইকেল চুরির ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে।

আদালতআগে মূলফটকে প্রবেশের সময় পুলিশের চেকপোস্ট ছিলো। কিন্তু বর্তমানে আদালত চত্বর ও তার আপশপাশে কোনো পুলিশ চোখে পড়ে না বলে আইনজীবীদের অভিযোগ। আদালতপাড়ায় পুলিশের কিছু সদস্য থাকেন কোর্টের হাজতখানায়। হাজতখানায় সব সময় থাকে আসামির স্বজনদের উপচেপড়া ভিড়। স্বজনদের আসামি দেখা ও খাবার দেয়ার বাবদ টাকা উত্তোলন নিয়ে ব্যস্ত থাকেন কোর্ট পুলিশের ওই সদস্যরা। কিন্তু আদালতপাড়ায় তাদের কোনো নজরদারি নেই।

এদিকে, কি পরিমাণ বিচারপ্রার্থী হামলার শিকার হয়েছেন এবং আদালত চত্বর থেকে মোটরসাইকেল চুরি হয়েছে-এর পরিসংখ্যান নেই আইনজীবী সমিতি ও পুলিশের কাছে। গত ৩-৪ মাস আগে চ্যানেল নাইনের ঢাকায় কর্মরত স্টাফ ক্যামেরা পারসন জহিরুল ইসলাম আসেন মুন্সীগঞ্জে। আদালত চত্বরে তার মোটরসাইকেল রেখে কয়েক মিনিট পর এসে দেখেন তার মোটরসাইকেলটি চুরি হয়ে গেছে। এ ঘটনায় তিনি মুন্সীগঞ্জ সদর থানায় মামলা করেছেন।

আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. হালিম হোসেন জানিয়েছেন, মুন্সীগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের ১ নং আমলী আদালতের বারান্দা থেকে কিছুদিন আগে তার এক বিচারপ্রার্থীকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্ঠা করে প্রতিপক্ষের ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীরা। এ সময় আইনজীবী মো. হালিম হোসেন অন্যদের সহায়তায় তার মক্কেলকে রক্ষা করে সংশ্লিষ্ট আদালতের বিচারককে বিষয়টি লিখিতভাবে জানান। পরে ওই আদালতের বিচারক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. হায়দার আলী কোর্ট পুলিশ এনে ভুক্তভোগীকে নিরাপদে বাড়িতে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

আদালতসর্বশেষ গত ৪ই মে দুপুর সোয়া ১২টা দিকে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নিচতলায় মুন্সীগঞ্জ অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম কোর্ট) আদালতের বারান্দা থেকে প্রতিপক্ষের ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীরা মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার পূর্বরাখি গ্রামের মৃত গণি বেপারীর ছেলে শাকিল বেপারী (৪০) নামে এক বিচারপ্রার্থীকে ডেকে নিয়ে যায়। পরে তাকে আদালতের বাইরে মাঠপাড়া এলাকায় নিয়ে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়।

শাকিল বেপারী এডিএম কোর্টে একটি সিআর মামলার স্বাক্ষীদের তালিকা জমা দিয়ে ওই আদালতের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলো। শাকিলকে আশপাশের লোকজন রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর জরুরি বিভাগের ডাক্তার শাকিলকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করেন। শাকিল বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এ ঘটনায় গত ৬ই মে সন্ত্রাসী হামলার শিকার শাকিলের ভাই মো. শামীম বেপারী বাদী হয়ে ফিরোজা বেগম, আনোয়ার হোসেন ও আতিক বেপারীকে এজাহারনামীয় এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৪-৫জনকে আসামি করে মুন্সীগঞ্জ সদর থানায় মামলা করেছেন। এ ঘটনায় আসামিদের কাউকে পুলিশ আটক করতে পারেনি।

এদিকে, শিলই ইউনিয়নের পূর্বরাখি গ্রামের ফিরোজা বেগম বাবা দেলোয়ার হোসেন ও চাচা (বর্তমানে বাবা) আনোয়ার হোসেন মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করায় মুক্তিযোদ্ধারা ধরে নিয়ে বস্তায় ভরে পদ্মা নদীতে ফেলে দেয়। এতে ফিরোজার বর্তমান বাবা আনোয়ার হোসেন বেঁচে গেলেও দেলোয়ার হোসেনের হদিস মেলেনি আজও। ফিরোজার মাকে চাচা আনোয়ার হোসেন বিয়ে করে। দূর্ত ফিরোজা বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান পরিচয় দিয়ে এবং মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় দেলোয়ারের নাম লেখিয়ে সুযোগ-সুবিধা নেয়ার নেয়ার চেষ্ঠা করছে বলে মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযোগ।

আদালতশিলই ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বিল্লাল মিজি জানান, কোনো মুক্তিযোদ্ধাই বলবে না দেলোয়ার হোসেন ও আনোয়ার হোসেন মুক্তিযোদ্ধা ছিলো।

শহর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও প্রত্যক্ষদর্শী মো. মালেকুন মাকসুদ বিপুল বলেছেন, এই আদালতের জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে বিচারপ্রার্থীরা আসেন। কিন্তু এখানেই এসে প্রতিপক্ষের ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন। তিনিও হামলার শিকার একাধিক বিচারপ্রার্থীকে রক্ষা করার চেষ্ঠা করেছেন বলে জানিয়েছেন। সাবেক এই ছাত্রনেতার দাবি, কোট প্রাঙ্গণে সিসি ক্যামেরা বসানো হলে অপরাধীদের সনাক্ত করা সহজ এবং এতে অপরাধ কমে যাবে।

মুন্সীগঞ্জ আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম পল্টু, সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. মাসুদ আলম, আইনজীবী ও সংষ্কৃতি কর্মী শাহীন মোহাম্মদ আমানউল্লাহ বলেছেন, আদালতে দালাল চক্র বৃদ্ধি পেয়েছে।আদালতের বারান্দা আবার কখনও আদালতের মাঠ থেকে বিচার প্রার্থীদের অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিছুদূর নিয়ে কুপিয়ে ও পিটিয়ে রক্তাক্ত জখম করা হচ্ছে। বিচার প্রার্থীসহ আইনজীবী ও এজলাসে বিচারকদেরও নিরাপত্তা নেই। আদালতপাড়ায় সিসি ক্যামেরা বসানো জরুরি। এতে করে বিচারপ্রার্থীরা হয়রানি, হামলা ও অপহরণের হাত থেকে অনেকটা রক্ষা পাবেন।

তারাও নিরাপদে মামলা পরিচালনার কাজ করতে পারবেন। অপরাধ রোধে আইনজীবীরা জেলা পুলিশ সুপারের কাছে আদালত চত্বরের প্রবেশমুখে ও টহল পুলিশ মোতায়েনের দাবি তুলেছেন। এসব বিষয়ে জেলা আইনজীবী সমিতির কার্যকরী পরিষদের সদস্যরা জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরীর সঙ্গে আলোচনা করেছেন বলে তারা জানিয়েছেন।

মুন্সীগঞ্জমুন্সীগঞ্জ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলম, পিপিএম, জানালেন, মামলায় স্বামী-স্ত্রী কোর্টে আসে, স্বাক্ষী দেওয়ার সময় একে অপরকে আক্রমণ করে বসেন-এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা। আদালতের পুরো এলাকায় সিসি ক্যামেরা বসানোর জন্য জেলা ও দায়রা জজের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। সিসি ক্যামেরা বসানো গেলে কোর্টের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভালো হবে বলে পুলিশ সুপার জানানেলন।

পূর্ব পশ্চিম

Comments are closed.