জমি অধিগ্রহণে বাধার মুখে বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান

গজারিয়ায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের জন্য অনুমোদিত এলাকার অনেকাংশই চলে গেছে নদীতে। এ অবস্থায় প্রয়োজনীয় জমির জন্য স্থানীয় কৃষকদের তিন ফসলি জমির দিকে হাত বাড়ানোর অভিযোগ উঠেছে বাস্তবায়নকারী সংস্থার বিরুদ্ধে। পাশাপাশি জমি দেয়ার জন্য ভূমি মালিকদের নানাভাবে ভয়ভীতিও দেখানোর অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। অন্যদিকে জীবন-জীবিকা ও সুস্থ পরিবেশের প্রশ্নে প্রাণ দিয়ে হলেও জমি রক্ষার অঙ্গীকার জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

রাজধানীর উপকণ্ঠ মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) আওতাধীন সংস্থা রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (আরপিসিএল)। গজারিয়া উপজেলার ষোলআনি-দৌলতপুর মৌজায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণের কথা। প্রকল্প শেষ হওয়ার সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত। প্রকল্পের জন্য প্রস্তাবিত এলাকার অনেকাংশই এখন নদীতে। এ অবস্থায় প্রয়োজনীয় জমির জন্য আরপিসিএলের বিরুদ্ধে কৃষকদের তিন ফসলি জমি দখলের চেষ্টার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে জমি মালিকদের নানাভাবে ভয়ভীতিও দেখানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা।

জানা গেছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে জমির প্রয়োজন হবে মোট ৩৩০ একর। এজন্য গজারিয়া উপজেলার ইমামপুর ইউনিয়নের দৌলতপুর ও ষোলআনি মৌজাকে বেছে নেয়া হয়। কিন্তু মেঘনা নদীর ভাঙনে দুই গ্রামের একাংশ চলে গেছে নদীতে। ফলে পুরো প্রকল্পটি এখন ষোলআনিতেই বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে আরপিসিএল। এতে ভূমিহারা হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন ষোলআনি গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দা।

স্থানীয়রা জানান, গজারিয়ায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের জন্য সরকার অনুমোদিত জায়গার একাংশ এখন নদীতে। এ কারণে কোনো কোনো স্থানে প্রকল্পের সাইনবোর্ড লাগানোর পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় তা পুঁতে রাখা হয়েছে নদীতীরে। এখন বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় জমি সংগ্রহ করতে গিয়ে স্থানীয়দের তিন ফসলি জমির ওপর হাত বাড়িয়েছে বাস্তবায়নকারী সংস্থা। এ জমি হারালে নিঃস্ব হয়ে পড়বে গ্রামের দুই শতাধিক পরিবার। এ কারণে জীবন গেলেও জমি ছাড়বেন না তারা।

এদিকে বিদ্যুত্ বিভাগের দাবি, ষোলআনি মৌজায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে হলে মাত্র ১৭টি বাড়ি অন্যত্র স্থানান্তর করতে হবে। এজন্য এসব বাড়ির বাসিন্দাদের জন্য অন্যত্র পরিবারপ্রতি ১ হাজার ১০০ বর্গফুট আয়তনবিশিষ্ট তিন কক্ষের আধাপাকা ঘর নির্মাণ করে দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া অন্যান্য মেগা প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণের জন্য স্থানীয় বাজারদর হিসেবে জমির মূল্যের দেড় গুণ পরিশোধ করা হলেও, এ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য জমির মূল্য পরিশোধ করা হবে আড়াই গুণ।

কিন্তু জমি রক্ষায় এরই মধ্যে প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। নিজেদের আবাসস্থল ও জীবিকার উত্স সংরক্ষণে একাট্টা হয়ে আন্দোলনে নেমেছেন গজারিয়া ও দৌলতপুর এলাকাবাসী। একনেকে প্রকল্প পাস হওয়ার পর পরই ভূমি রক্ষায় স্থানীয়দের নিয়ে কমিটিও গঠন করেছেন গজারিয়ার তিন ইউনিয়নের বাসিন্দারা। যেকোনো মূল্যে জমি রক্ষায় সোচ্চার তারা।

স্থানীয়দের একজন ষোলআনি গ্রামের বাসিন্দা হাফিজ আহমেদ বলেন, এ প্রকল্প করা হলে আড়াই একর জমির পুরোটাই হারিয়ে ভূমিহীন হতে হবে আমাকে। তখন আশ্রয় নেয়ারও জায়গা থাকবে না। এর ওপর ভুগতে হবে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ছাইয়ের দূষণ উদ্ভূত নানা রোগব্যাধিতে। তাই জীবন দিলেও জমি দেব না।

জানা যায়, গজারিয়া উপজেলার ইমামপুর ইউনিয়নের উর্বর গ্রাম ষোলআনি ও দৌলতপুর। মেঘনার তীরঘেঁষে গড়ে ওঠা এ অঞ্চল আলু উত্পাদনের জন্য প্রসিদ্ধ। নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ফেব্রুয়ারির শুরু পর্যন্ত তিন মাস আলু, ধান ও ক্ষীরা উত্পাদন করেন এলাকার কৃষকরা। এখানকার প্রতি শতাংশ জমিতে আলু উত্পাদন হয় আড়াই থেকে তিন মণ। এর পর ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ভুট্টা-তিল বপনের পর তা উত্তোলন করা হয় এপ্রিল নাগাদ। এর পর জমিতে রোপা আমন আবাদ করেন কৃষকরা। এলাকার অধিকাংশ মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি, মত্স্য চাষ ও ব্যবসা-বাণিজ্য। এখানকার উত্পাদিত ফসল সংরক্ষণের জন্য উপজেলায় কয়েকটি হিমাগারও স্থাপন করা হয়েছে।

স্থানীয়দের অধিকাংশই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির পক্ষে বলে দাবি করেছেন আরপিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুস সবুর। তিনি বলেন, অধিকাংশ মানুষ বিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষে। দু-একজন নানাভাবে প্রভাবিত হয়ে এর বিরোধিতা করছে। তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্রের নতুন নতুন প্রযুক্তির বিষয় ও ঝুঁকি হ্রাসের বিষয়গুলো বোঝানো হচ্ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমি অধিগ্রহণের কাজও শিগগিরই শেষ হবে।

প্রসঙ্গত, গজারিয়ায় ৩৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন পায় গত বছরের জুলাইয়ে। ওই সময় ৩৬ মাস তথা তিন বছরের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার জন্য সময় বেঁধে দেয়া হয়। এ অনুযায়ী, ২০১৯ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হওয়ার কথা।

বনিক বার্তা

Comments are closed.