শুধু একটি বেফাঁস কথা, পদত্যাগে বাধ্য হলেন মন্ত্রী

রাহমান মনি: শুধু একটি বেফাঁস কথা বলে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন জাপানের পুনর্গঠনমন্ত্রী মাসাহিরো ইমামুরা। ২৬ এপ্রিল ২০১৭ বুধবার তিনি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের কাছে পদত্যাগপত্র দাখিল করেন এবং ওইদিনই আবে সেটা গ্রহণ করেন। এর ফলে তিনি আর মন্ত্রী নন। তবে, একজন আইন প্রণেতা হিসেবে ইমামুরা তার দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখবেন। ৭০ বছর বয়স্ক এই নেতা একজন ঝানু পার্লামেন্টারিয়ান।

এর আগে ২৫ এপ্রিল ২০১৭ এক সাংবাদিক সম্মেলনে ইমামুরা বলেন, এটা ভালো ছিল যে, ‘সুনামি টোকিওতে আঘাত না করে তোহোকু (ফুকুশিমা, ইওয়াতে, মিয়াগি) অঞ্চলে হয়েছিল। ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কম হয়েছে। যদি টোকিওতে ২০১১ সালের মার্চের সুনামিটি আসত তাহলে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করত।’

আপাতদৃষ্টিতে দেখলে মন্তব্যটি মন্ত্রিত্ব চলে যাবার মতো তেমন বেফাঁস কথা নয়। আমাদের দেশে মন্ত্রীরা তো এর চেয়ে আরও বেশি বেফাঁস কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রী, সাংসদ এমনকি বিভিন্ন বাহিনীর প্রধানগণও আরও বেশি এবং ভয়াবহ বেফাঁস কথা বলেন। তাদের তো মন্ত্রিত্ব যায় না। এমনকি কোনো কৈফিয়ত পর্যন্ত দিতে হয় না। বরং যে যত বেশি বেফাঁস বলতে পারে সরকারে তার গুরুত্ব তত বেশি।

কিন্তু এটা তো জাপান। এখানে মিডিয়া যেমন শক্তিশালী, তার চেয়েও বেশি শক্তিশালী দেশের জনগণ। তাই আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে, জানের বদলে ২টা করে ছাগল দেয়া কিংবা বেডরুমে পাহারা দেয়া সম্ভব নয় বলে পার পাওয়া যাবে না। এখানে প্রতিটি বাক্যের জন্য জনগণের কাছে জবাবদিহিতা করতে হয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের। মিডিয়া এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। সরকারি মিডিয়ার ভূমিকা আরও বেশি থাকে। কারণ, সরকারি মিডিয়া চলে জনগণের করের অর্থে। কাজেই জনগণের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে এমন কোনো কার্যে কোনো প্রকার ছাড় দেয়া হয় না জাপান মিডিয়া থেকে।

ইমামুরার বক্তব্যটি জাপান রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এনএইচকে (ঘঐক) বারবার প্রচার করেছে এবং জগণকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে, ইমামুরার বক্তব্য রাজধানীবাসীকে স্বর্গ মনে করেছেন আর তোহোকু এলাকাবাসীকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছেন। একজন মন্ত্রী হিসেবে তিনি সেটা করতে পারেন কিনা? কারণ, একজন মন্ত্রী শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নন, তিনি সমস্ত দেশবাসীর মন্ত্রী তাই তিনি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসীকে শুধু অপমানই করেননি, তিনি শপথ ভঙ্গ করেছেন এবং তার উপর ন্যস্ত দায়িত্বের প্রতি অবিচার করেছেন। তাই এই পদে আর এক মুহূর্ত থাকার অধিকার তার নেই। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জনগণকে তা বোঝাতে সক্ষম হয়েছে। জনগণ বুঝতে পেরেছে মাসাহিরো ইমামুরা পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছে এবং তাকে সরে দাঁড়াতে হবে।

জনগণের দাবির মুখে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ইমামুরা তার নড়বড়ে অবস্থান বুঝতে পেরে প্রধানমন্ত্রী আবের কাছে তার পদত্যাগপত্র পেশ করেন। বুধবার সকালে আবে তা গ্রহণ করেন।

শুধু তাই নয়, জনগণের মনে আঘাত দিয়ে কথা বলার জন্য ইমামুরা দুঃখ প্রকাশ করে নিঃশর্ত ক্ষমা চান।

প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ও সরকারপ্রধান, দলীয়প্রধান এবং নিয়োগদাতা হিসেবে মাসাহিরো ইমামুরা দায় কাঁধে নিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তিনি বলেন এই পদে থেকে আমিও দায় এড়াতে পারি না। আমি জনগণের ব্যথা অন্তর দিয়ে অনুভব করতে পারি তাই আমিও দেশবাসীর কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।

এরপর আবে তোহোকু অঞ্চলের বিশেষ সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান মাসাইয়োশি ইয়োশিনোকে ইমামুরার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে নাম ঘোষণা দেন।

ইমামুরা ১৯৪৭ সালের ৫ জানুয়ারি কিয়োশু অঞ্চলের সাগা প্রিফেকচারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৭০ সালে টোকিও ইউনিভার্সিটি থেকে আইন বিষয়ে পড়াশুনা করে আইনজীবী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তারপর লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিবি)’র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েন এবং জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে মোট ৭ বার সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন।

১৯৭০ সালে আইনজীবী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও তিনি আইন পেশায় নিজেকে প্রায় বেশি দিন ধরে রাখেননি। ১৯৭০ সালের এপ্রিল মাসে জাপান জাতীয় রেলওয়েতে যোগ দেন। ১৯৮৭ সালে তিনি কিয়ুসু রেলওয়ে কোম্পানির উচ্চ পদে আসীন হন।

১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে নিম্নকক্ষের সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে পর্যটন, সড়ক যোগাযোগ এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের পার্লামেন্টারি ভাইস মিনিস্টার হিসেবে মোরি সরকারের সময় দায়িত্ব পালন করেন।

এরপর ২০০২ সালে কোইজুমি ক্যাবিনেটে পার্লামেন্টারি ভাইস মিনিস্টার হিসেবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৭ সালে আবে সরকারের প্রথমবারের সময় তিনি বন, কৃষি ও মৎস্য সম্পদ মন্ত্রণালয়ের স্টেট মিনিস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০১১ মার্চে ভূমিকম্প এবং এর ফলে সুনামিতে বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ফুকুশিমা পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিশেষ দায়িত্ব পালন করেন।

ব্যক্তিজীবনে সৎ এবং একজন মেধাবী রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিতি অর্জন করলেও তিনি কিছুটা রগচটা টাইপের ছিলেন। সৎ মানুষের বেলায় যা হয়। মতের বিরুদ্ধে হলেই তিনি খুব সহজেই ক্ষেপে যান। একবার এক সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিককে অপ্রয়োজীয় প্রশ্ন করার জন্য কক্ষ থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। ওই সাংবাদিক বের হয়ে না গেলে তিনি নিজেই সংবাদ সম্মেলন শেষ না করেই বেরিয়ে যান।

গত মার্চ মাসে ভূমিকম্প এবং পরবর্তী পুনর্গঠন নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সাপ্তাহিক জাপান প্রতিনিধির এক প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে পরে বলতে বাধ্য হন এই বলে যে, বিদেশি সাংবাদিক বন্ধুরা এমন সব কঠিন প্রশ্ন করেন যা উত্তর দিতে আমাকে হিমশিম খেতে হয়। জাতীয় সংসদেও আমাকে এমন কঠিন পরিস্থিতির শিকার হতে হয় না।

পুনর্গঠন নিয়ে তিনি বলেন, ফুকুশিমা অঞ্চলে পুনর্গঠনে ৬৫% কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়ে গেছে। বাকি ৩৫% আগামী এক বছরের মধ্যে শেষ হবে বলে আমি আশাবাদী। এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নে সাপ্তাহিক প্রতিনিধি জানতে চান, বিগত ৬ বছরে মাত্র ৬৫% কাজ সম্পন্ন হয়েছে যার গড়রেট হচ্ছে মাত্র ১১%। বাকি ৩৫% কাজ এক বছরের মধ্যে সম্পন্ন হবে এমন কী জাদুর চেরাগ রয়েছে আপনার কাছে? যদি থেকেই থাকে তা হলে এতদিন তা কাজে লাগাননি কেন?

১১ মার্চের ভূমিকম্প এবং এর ফলে বিপর্যস্ত ঘটনায় দ্বিতীয়বারের মতো মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হলো। এর আগে ২০১১ সালে সেপ্টেম্বর মাসের ১০ তারিখ নোদা প্রশাসনের বাণিজ্যমন্ত্রী ইয়োশিও হাচিরো বেফাঁস কথার জন্য পদত্যাগে বাধ্য হন। মন্ত্রিসভায় নিযুক্তি পাওয়ার মাত্র ৯ দিনের মাথায় তিনি পদত্যাগ করেন। ২ সেপ্টেম্বর নিয়োগ পাওয়ার পর ৮ সেপ্টেম্বর ফুকুশিমা পরিদর্শন শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, চারপাশের শহর, নগর ও গ্রামগুলো যেন একটা মৃত্যু শহর। এখানে কোনো প্রাণ চোখে পড়ে না। যেন একটা বিরানভূমি। আর এই বক্তব্যে জনগণের অন্তরে আঘাত দেয়ার জন্য পদত্যাগে বাধ্য হন।
এর আগে ১৪ নভেম্বর ২০১০ সালে নাওতো কানের আইনমন্ত্রী বেফাঁস কথা বলে পদত্যাগ করেছিলেন।

আবে প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদে মোট ৫ জন (২০১৪ অক্টোবর থেকে ২০১৭ এপ্রিল) মন্ত্রী বিভিন্ন কারণে পদত্যাগে বাধ্য হন। মিডিয়ায় বিশেষ ভূমিকায় তারা পদত্যাগে বাধ্য হন। এখানকার মিডিয়া জনগণের জন্য কাজ করে। উনিশ থেকে বিশ হলেই তুলোধুনা করে ছাড়ে মিডিয়া। সরকারও শ্রদ্ধা জানায়। আর আমাদের দেশে মিডিয়ার ভূমিকাটা কী? সরকারই বা কতটা শ্রদ্ধাশীল।

সাপ্তাহিক

Comments are closed.