শর্তযুক্ত স্বাধীনতা পরাধীনতারই নামান্তর

আহমাদ মোস্তফা কামাল: প্রশ্নটা লেখকের স্বাধীনতা নিয়ে। লেখকের স্বাধীনতা কি অসীম? হ্যাঁ, অসীম। বিনা তর্কে এটা মেনে নিতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। শর্তযুক্ত যে স্বাধীনতা, সেটাকে মেনে নিলে ক্রমাগত পরাধীনতার দিকেই এগিয়ে যেতে হয়। কারণ যারা শর্ত যোগ করছেন তারা আরো শর্ত যুক্ত করার মানসিকতা ধারণ করেন, কিংবা যুক্ত করার সুযোগ খোঁজেন। ফলে লেখকরা যখন কোনো শর্ত মেনে নেন তখন ওই খবরদারি করা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান লাই পেয়ে যায়, এবং নতুন নতুন শর্ত আরোপ করতে থাকে। আর এভাবে শৃঙ্খলিত হতে হতে একসময় স্বাধীনতা বলতে আর কিছু থাকে না।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, লেখকরা কি তাহলে যা-ইচ্ছে তাই বলতে পারেন? সমাজ-রাষ্ট্র-ধর্ম-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য-মূল্যবোধ-নৈতিকতা-ঔচিত্যবোধ কোনো কিছুর তোয়াক্কা করার প্রয়োজন তার নেই? না, নেই। পরিষ্কারভাবে বলি, নেই। এবং যা-ইচ্ছে তাই বলার স্বাধীনতা তাঁদের রয়েছে। আপনি যতই ক্ষমতাবান হন না কেন, যতই হিংস্র দানব হন না কেন, যতই ভয় দেখান না কেন, লেখকরা তাঁদের নিজেদের কথা বলবেনই। নইলে আর লেখক কিসের? এই যে এত শক্তভাবে বলছি, কঠিনভাবে বলছি লেখকদের স্বাধীনতার কথা, যা-ইচ্ছে-তাই লেখার স্বাধীনতার কথা, তার কারণ এই যে, এই স্বাধীনতা থাকার পরও তাঁরা স্বেচ্ছাচারিতা করেন না। তাঁরা নিজেরাই ঠিক করে নেন যে, কোনটা বলবেন আর কোনটা বলবেন না এবং এই সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার একান্তভাবে তাঁদেরই। আপনি বাইরে থেকে আঙুল তুলে নির্দেশনা দেবার কেউ নন। একজন লেখক স্বাভাবিকভাবেই চিন্তাশীল মানুষ, ভাবুক মানুষ। সবসময়ই ভাবেন তিনি এবং তার চিন্তাজগতের তল পাওয়া কঠিন।

দেশ-সমাজ-রাষ্ট্র থেকে শুরু করে মহাবিশ্বের এমন কিছু নেই যা নিয়ে তারা ভাবেন না। কিন্তু সব ভাবনা কি তারা প্রকাশ করেন? না, করেন না। তার মানে তাদের নিজেদের ভেতরেই একটা সম্পাদক সত্তা আছে, নিজের ভেতর থেকেই তারা সম্পাদনা করে নেন, সিদ্ধান্ত নেন কোনটা বলবেন, কতটুকু বলবেন। যেটুকু বলেন সেটুকু তাঁর বা তাঁদের নির্বাচিত চিন্তার প্রকাশ। সেই প্রকাশ কেউ তীব্রভাবে করেন, যেমন করতেন হুমায়ুন আজাদ, কেউ মৃদুভাবে করেন। কেউ শ্লেষ মাখিয়ে করেন, কেউ হাস্যরস-কৌতুক সহযোগে করেন, কেউ-বা কোনো আড়াল না নিয়ে সরাসরি করেন। এটা যার যার স্টাইল, যার যার প্রকাশের ধরন। কারো কারো প্রকাশে আপনি আহত হতে পারেন, সেক্ষেত্রে বুঝতে হবে, সমস্যাটা আপনার, লেখকের নয়। আপনি নিজেকে ওই লেখা পড়বার জন্য প্রস্তুত করেননি। হ্যাঁ, পাঠ করার জন্য প্রস্তুতির প্রয়োজন আছে। আপনারা নানা দায় লেখকের কাঁধে চাপিয়ে দিতে চান আর নিজেরা ন্যূনতম কোনো প্রস্তুতি নেবেন না, তা কী করে হয়?

দুই.

একজন লেখকের লেখার সঙ্গে অনেক সময়ই সমাজের নৈতিকতা ও মূল্যবোধের সংঘাত দেখা দেয় এবং এই সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে সমাজের নানা প্রান্তের ক্ষমতাসীন মানুষের মধ্যে। এর কারণ কী? কারণ হলো, লেখকরা সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রচলিত সব নৈতিকতা ও মূল্যবোধ মানেন না, এবং প্রচলের মধ্যে বিদ্যমান খুঁত ও বিভ্রান্তিগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন। লেখকদের চোখ সুদূরে নিবদ্ধ, তাঁরা অনেক কথাই বলেন ভবিষ্যৎ কালের জন্য, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। ইতিহাসে এমন ঘটনা প্রচুর দেখা গেছে যে, এই ধরনের লেখকরা তাঁদের সমকালে গৃহীত হননি, অথচ ভবিষ্যৎকালে সংবর্ধিত হয়েছেন।

ভবিষ্যৎ দেখার এই ক্ষমতা আছে বলেই তাঁরা প্রচলিত নিয়ম-কানুন, নৈতিকতা-মূল্যবোধ ভাঙার সাহস রাখেন। কারণ এই ভাঙার ভেতর দিয়ে তারা আসলে গড়ার কাজটি করেন- নতুন ধরনের উন্নত মূল্যবোধ ও নৈতিকতা গড়ার কাজ। সমাজের ক্ষমতাবান গোষ্ঠীটির এসব কাজ পছন্দ হয় না, কারণ তারা সবকিছু অনড়-অচল হিসেবে রেখে দিতে চান। রেখে দিতে পারলে তাদের ক্ষমতার সুরক্ষা হয়, জনগণের ওপর তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি নিরঙ্কুশ হয়। লেখকরা চান মানুষকে মুক্ত করতে, আর ক্ষমতাবানরা চান বন্দি রাখতে। বিরোধ তো অনিবার্য। ব্যাপারটা ওই বিরোধ পর্যন্ত থাকলে অসুবিধা হতো না, কিন্তু সেটা পরিণত হয় সংঘাতে।

এবং সেটা হলে লেখকের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে, কারণ তার হাতে কলম ছাড়া আর কিছুই নেই, আর ক্ষমতাবানদের হাতে আছে অস্ত্রশস্ত্র, আইনকানুন ইত্যাদি। এই ধরনের সংঘাত শেষ পর্যন্ত হয়ে পড়ে প্রাণঘাতী এবং একতরফাভাবে প্রাণ হারান লেখকরা। লেখার জন্য শারীরিক আঘাত! একটা অসুস্থ সমাজে, একটা উদ্ভট রাষ্ট্রেই কেবল এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। বাংলাদেশে সেটাই ঘটে চলেছে। হুমায়ুন আজাদের ওপর আক্রমণের ভেতর দিয়ে যে জঘন্য ধারার সূচনা হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশে, তারই ধারাবাহিকতা চলছে এখন পর্যন্ত।

তিন.

হুমায়ুন আজাদ যেদিন আক্রান্ত হলেন সেদিন আমি অনেকের চোখে-মুখেই দেখেছি আক্রান্ত হবার বেদনা ও যন্ত্রণা; এমন অনুভূতি হয়েছিলো আমারও, মনে হচ্ছিল- আমি নিজেই আক্রান্ত। খবরটা পেয়ে হতবিহ্বল হয়ে গিয়েছিলেন যেন সবাই, তিনি ঠিক কতটা আহত হয়েছেন, আদৌ আর আমাদের মধ্যে ফিরে আসবেন কি না, এরকম নানা আশঙ্কায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন সবাই। এক কবিবন্ধুকে সেদিন বলতে শুনেছি- মনে হচ্ছে মাথার ওপর থেকে একটা বিরাট ছায়া সরে যাচ্ছে; আরেক কবিবন্ধু বলছিলেন- আমার কান্না পাচ্ছে; আরেকজন- এ কোন দেশে আছি- বলতে বলতে চোখ মুছছিলেন।

সেদিন এবং তারপরের কয়েকদিন এই জঘন্য হামলার প্রতিবাদে যে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ হয়েছে, তাতে প্রকাশিত হয়েছিল এই লেখকের প্রতি সবার ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। বিষয়টি ভাববার মতো। হুমায়ুন আজাদ কোনো লোকপ্রিয় লেখক ছিলেন না, বরং তাঁর স্পষ্টবাদিতা এবং নানা বিষয়ে তাঁর ভিন্নধর্মী মতামত অনেক সময়ই নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতো- তাঁর কোনো বন্ধু নেই, শুভাকাঙ্ক্ষী নেই, তবু তাঁর ওপর আক্রমণটাকে কেন সবাই নিজেদের ওপর আক্রমণ বলে অনুভব করলেন? এর কারণ হয়তো এই যে, তিনি ছিলেন সাহসী ও স্পষ্টবাদী, প্রগতিশীলতার পক্ষে এবং মৌলবাদ ও প্রতিক্রিয়াশীলতার বিপক্ষে তাঁর অবস্থান ছিলো আপোসহীনভাবে দৃঢ় ও স্পষ্ট।

যে কথাগুলো আমরা অনেকেই বলতে চেয়েও সাহসের অভাবে অথবা নানা সুবিধা পাবার আশায় বলে উঠতে পারি না, তিনি কোনোকিছুর তোয়াক্কা না করেই ক্রমাগত সেগুলো বলে গেছেন; বলে বলে পরিণত হয়েছিলেন প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের প্রতীকে, আপোসহীনতা ও প্রগতিশীলতার প্রতীকে। তাঁকে আঘাত করা মানে যে এসবকিছুকেই আঘাত করা, এ কথাটি বুঝে উঠতে কারোরই অসুবিধা হবার কথা নয়। হয়ও নি।

চার.

আমরা একটি ভয়ংকর ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি। একদল পশ্চাৎপদ ধর্মান্ধ লোক রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতায় দেশটিকে গভীর অন্ধকার সুড়ঙ্গে ঠেলে দিচ্ছে। প্রতিটি জাতির ইতিহাসেই এমন ক্রান্তিকালের দেখা মেলে। এরকম একটি সময়ে দাঁড়িয়ে লেখক, সংস্কৃতিকর্মী এবং রাজনৈতিক কর্মীদের অনেক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করতে হয়। সময়ই তাদের কাঁধে এই দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়। কিন্তু একজন মৌসুমী বা ছদ্মবেশী প্রগতিশীলের পক্ষে এই দায়িত্ব পালন করা কিছুতেই সম্ভব নয়।

সময়টি এমনই যে, আমাদেরকে এই এক্ষুণি সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা আমৃত্যু প্রগতিশীলতার পক্ষে থাকবো কি না। বলা বাহুল্য, প্রগতিশীলতার পক্ষে থাকা মানে ধর্মান্ধ-প্রতিক্রিয়াশীলদের বিরুদ্ধে থাকা। ব্যাপারটা আপনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দিক থেকে বিপদজনক, যে-কোনো সময় আপনি ওদের টার্গেটে পরিণত হতে পারেন, আপনাকে স্তব্ধ করে দেবার জন্য প্রণীত হতে পারে একটি নীল নকশা, সেক্ষেত্রে রাষ্ট্র আপনাকে আশ্রয় ও নিরাপত্তা দেবে না, কারণ রাষ্ট্র আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে ওদেরকেই- সেই অর্থে ওদের বিপক্ষে থাকা মানেই রাষ্ট্রেরও বিপক্ষে থাকা।

প্রতিজ্ঞাটা তাই নিজের কাছেই, নিজেকেই প্রশ্ন করতে হবে- আপনি কোন পক্ষে থাকতে চান, ওদের পক্ষে থাকলে আপনি আজীবন ‘নিরাপদ’, আর বিপক্ষে থাকলে একটি বিপদসংকুল দীর্ঘ পথ আপনাকে পাড়ি দিতে হবে, সেক্ষেত্রে আমৃত্যু প্রগতিশীলতার পক্ষে থাকার সাহস কি আপনার আছে! যদি থাকে, তাহলে আর কিছু না হোক, আপনি ভালোবাসা পাবেন-তার প্রমাণ পাওয়া গেলো হুমায়ুন আজাদকে দিয়েই- তার জন্য সবার ভেতরে এমন গভীর শ্রদ্ধা-মমতা আছে, সেটাও কি তিনি নিজেও জানতেন!

বাংলা ট্রিবিউন

Comments are closed.