হুমায়ুন আজাদের ভাষা

রহমান সিদ্দিক: জার্মানের এক কবির নাম হাইনরিখ হাইনে। তাকে নিয়ে গবেষণা করতে যান চাপাতির আঘাতে বিদ্ধস্ত চোয়াল নিয়ে হুমায়ুন আজাদ। সেখানেই ২০০৪ সালের ১১ আগস্ট ইহধাম ত্যাগ করেন। হাইনরিখ হাইনের একটা বচন দিয়েই শুরু করা যাক। ওই মহাত্মন বলেছেন, ‘রঙ্গমঞ্চ থেকে নায়ক বিদায় নেওয়ার পর আবির্ভাব ঘটে ভাঁড়ের।’ হুমায়ুন আজাদের বেলায়ও তেমনটা ঘটেছে। তার বিদায়ের পর চারপাশে দেখি কেবল ভাঁড় আর ভাঁড়। ভাঁড়দের ভিড়ে জাতি আজ ভারাক্রান্ত। হুমায়ুন আজাদ ছিলেন আমাদের কালের নায়ক। আমাদের সৌভাগ্য যে যৌবনে তার ভাষা আমাদের আক্রান্ত করেছে, ভাংচুর করেছে, গুড়িয়ে দিয়েছে মনের যত সংকীর্ণতা, যত গোড়ামী। আমরা উদ্দীপ্ত হয়েছি, উন্মত্ত হয়েছি, বুঝতে শিখেছি নিজেকে, নিজের জগৎকে। তার মতো করে আর কেউ পারেনি, এখনো পারছে না। এখানেই তিনি অনন্য। অথচ তাকেই বিদায় নিতে হলো নাটকের তৃতীয় অঙ্কে। কিন্তু এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না, তৃতীয় অঙ্কে নায়কের বিদায় নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই, তাহলে ট্রাজেডি ক্ষুণ্ন হয়। তবে এটা কেন হলো? কারণ খুব স্পষ্ট। রাষ্ট্র নামক নাট্যপরিচালক চায়নি তার উপস্থিতি। এ দায় রাষ্ট্রেরই! যদিও তার মৃত্যু ছিল স্বাভাবিক, কিন্তু নেপথ্যে ছিল রাষ্ট্রই। কারণ রাষ্ট্র যে সমাজ নির্মাণ করেছে বা করছে, সেই সমাজে হুমায়ুন আজাদদের পরিণতি তো তাই হবে।

হুমায়ুন আজাদের জন্মদিনের আলোচনায় তার মৃত্যুর প্রসঙ্গ কেন? প্রসঙ্গ তাকে সঠিকভাবে চিনতে। তাকে চিনতে হবে কেন? চিনকে হবে তার ভাষাকে জানার জন্য। এই ভাষার কারণেই তাকে চাপাতির কোপে ক্ষতবিক্ষত হতে হয়েছিল। ভাষা তাহলে কি? আমি বলি, ভাষাই মানুষ। আরও পরিষ্কার করে বললে- ব্যক্তি। ভাষাকে ব্যক্ত বা প্রকাশ করেই তো মানুষ ব্যক্তি হয়ে ওঠে। দেকার্তে যেমন বলেছেন, তিনি চিন্তা করেন বলেই তিনি আছেন। এই চিন্তা তো ভাষারই বিমূর্ত রূপ। ভাষা ছাড়া চিন্তা হয় না। চিন্তা ছাড়া হয় না ভাষাও। চিন্তা শব্দের মধ্যে আদার বা অপর আছে, সেটা ভাষা ছাড়া আর কি। তাই হুমায়ুন আজাদকে চিনতে হলে চিনতে হবে তার চিন্তা বা ভাষাকে।

হুমায়ুন আজাদ জন্মেছেন পদ্মার পাড়ে। শৈশব কেটেছে তার পদ্মার ভয়ঙ্কর রূপ দেখে। নদী কী করে ভেঙেচুড়ে দিচ্ছে একেকটি জনপদ। নদীর ওই রূপই যেন তার ভাষায় এসে ভর করেছে। তিনি হয়ে উঠেছেন একটি নদী; পদ্মার মতোই ভয়ঙ্কর, বিনাশী। তার এই বিনাশী ভাষা কাকে আঘাত করেনি- রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে আমলা, বুদ্ধিজীবী, জেনারেল, মৌলভী, পুরোহিত, সাংবাদিক- কে নয়। এই অর্থে হুমায়ুন আজাদের ভাষার আরেক নাম অস্ত্র। এই অস্ত্রেরই সার্থক রূপ দেখতে পাই তার ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ গ্রন্থে। তবে এই ভাষা কিন্তু তার নিজের নয়। নদী থেকে তিনি যেমন শব্দ নিয়েছেন, নিয়েছেন অন্ধকার থেকেও। এই উপন্যাসের ভাষা আসলে অন্ধকার জগতেরই ভাষা। তিনি কেবল ‘চাক্ষুষ রূপকার মাত্র’।

‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ নিয়ে আমরা দেখেছি ভদ্রলোকদের সে কি গোসসা। এরা আমাদের সুশীল নাগরিক। তারা একে অশ্লীল বলে রায় দিলেন। কিন্তু তারা যদি প্রতি বছর শীতকালে কোন ওয়াজে যেতেন, তাহলে দেখতেন ওই ভাষা হুমায়ুন আজাদ নিয়েছেন ওই মৌলভীদের কাছ থেকেই। যারা অনর্গল উগড়ে দিচ্ছেন সব অশ্লীল। হুমায়ুন আজাদের ভূমিকা কেবল একজন নিষ্ঠাবান রিপোর্টারের। তিনি শুধু এগুলো তুলে এনে পাঠককে শুনিয়েছেন। এখানে তিনি ছলনার আশ্রয় নেননি, ম্যাটাফর ব্যবহার করে পণ্ডিতি কপটতাও দেখাননি।

সম্প্রতি আজফার হোসেনের একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস নিয়ে খুব আলোচনা হচ্ছে। খুবই নিরীহ, কিন্তু লক্ষ্যভেদী সেই স্ট্যাটাস। আজফার হোসেন খুবই ছোট একটি বাক্যে বলেছেন- ‘ইংরেজি চোদাও আমার লগে।’ একজন সত্যি সত্যি বুদ্ধিজীবীর ভেতরের রক্তক্ষরণ যদি আমরা না বুঝি তাহলে আজফার হোসেনের ভাষাও বুঝতে পারবো না। তার ভাষার মর্মোদ্ধারের জন্য যেতে হবে তার ভেতরে। হুমায়ুন আজাদের বেলায়ও এই সত্যের হেরফের হবে না। তার ভাষা বুঝতে হলে যেতে হবে আরও গভীরে। মানুষ রেগে গেলে কোন ভাষায় কথা বলে, তা কারও অজানা নয়। কিন্তু আমাদের সমাজ তো রাগী মানুষ চায় না, চায় ভদ্রলোকের বাচ্চাদের। আর সবাই যদি ভদ্রলোকের বাচ্চা থাকতে চায়, সমাজের পচন ঠেকাবে কে?

হুমায়ুন আজাদও একসময় আজফার হোসেনকে বিস্তর গালিবাজি করেছেন। আজফার হোসেনকে অতোটা গালি না দিলেও পারতেন হুমায়ুন আজাদ। কারণ হুমায়ুন আজাদের মূল্যায়নে আজফার হোসেন সত্য থেকে খুব একটা দূরে ছিলেন না। কি বলেছিলেন আজফার হোসেন? অনেক কথার ফাঁকে হুমায়ুন আজাদের বিরুদ্ধে পশ্চিমা তোষণের অভিযোগ এনেছিলেন তিনি। পশ্চিমারা সভ্য, আর সব অসভ্য- হুমায়ুন আজাদের এই মনোভাবের মোকাবেলা করেছিলেন আজফার হোসেন।

এটা তো সত্য, হুমায়ুন আজাদ তথাকথিত মৌলবাদীদের ভাষার যেমন পাঠোদ্ধার করেছেন, কিন্তু ‘সভ্য’ পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের ভাষার পাঠোদ্ধারে ব্যর্থ হয়েছেন। তাদের মিডিয়ার ভাষাকেই অমোঘ সত্য বলে বিশ্বাস করেছেন তিনি। প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধে বড় বুশের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণে তাই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন তিনি। দ্বিতীয়বার ছোট বুশের ইরাক দখলেও তার উচ্ছ্বাসের ঘাটতি ছিল না। প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের প্রাক্কালে হুমায়ুন আজাদ লিখেছেন, ‘ইরাক বহু মহাপ্রলয়ঙ্কর ক্ষেপণাস্ত্রের অধিকারী; যুদ্ধ বাঁধলে ইরাক সেগুলো মজুদ করে রাখবে না; আর সেগুলো নিউইয়র্ক ধ্বংস না করে হয় তো নিশ্চিহ্ন করবে তাদের, যারা যুদ্ধের ‘য’-টুকুতেও থাকবে না। পৃথিবী ধ্বংসের সূচনা হবে হয়তো এই মধ্যপ্রাচ্যেই, মরুবালুকার উন্মত্ত বিস্ফোরণে।’ আজাদ, মাতাল তরণী, ১৯৯২।

দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধে আমরা কী দেখলাম? সাদ্দামের পতন হলো। হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুর দুই বছর পর সাদ্দামকে ফাঁসিতে ঝোলানো হলো। কিন্তু কোথায় গেল সেই ‘মহাপ্রলয়ঙ্করী ক্ষেপণাস্ত্র’! তবে আর যাই হয়েছে, সাদ্দামের মৃতদেহ থেকে বের হয়েছে, আরও ভয়ংকর অস্ত্র। যার নাম আইএস। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা তো এমনটাই চেয়েছিল। তা না হলে ক্রুসেডের নামে তারা ইসলামের বিরুদ্ধে লড়াই করবে কেমনে।

পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের ভাষা হুমায়ুন আজাদ বুঝতে না পারলেও, ঠিকই বুঝেছেন তার নমস্য নোয়াম চমস্কি। তিনি চমস্কির কাছ থেকে ভাষাতত্ত্বের দীক্ষা নিয়েছেন, কিন্তু শিক্ষা নিয়েছেন কি? চমস্কি তার ‘এমপেরর অ্যান্ড পাইরেটস’ নামক গ্রন্থে একটি গল্প বলেছেন। চমস্কি আবার গল্পটি নিয়েছেন, সেন্ট অগাস্টিনের ‘সিটি অব গড’ গ্রন্থ থেকে। গল্পে আছে- মহাবীর আলেকজান্দার একবার এক নৌ-ডাকাতকে পাকড়াও করেছেন। ডাকাতের কাছ থেকে জানতে চেয়েছেন, কোন জ্ঞানে সে ডাকাতি করে মানুষের শান্তি বিনষ্ট করছে? ওই ডাকাতের সহজ-সরল উত্তর- তুমি যেই জ্ঞানে মানুষের শান্তি বিনষ্ট করছো, সেই জ্ঞানে। তোমার নৌকার বহর বড় বলে তুমি জগতের সম্রাট। আর আমার নৌকার বহর ছোট বলে আমি ডাকাত। সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার যুদ্ধনীতি বোঝাতে চমস্কি এই গল্পের উল্লেখ করেছেন। অথচ হুমায়ুন আজাদ সাম্রাজ্যবাদের মিডিয়ার ভাষাটাই গ্রহণ করেছেন, চমস্কির নয়।

তারপরও হুমায়ুন আজাদকে আমাদের দরকার। বর্তমান এই সমাজে তো আরও বেশি করে দরকার। যেই জেনারেল, মৌলবাদ, রাজাকারের বিরুদ্ধে তিনি ভাষার অস্ত্র শাণিয়েছেন, আজকে তারাই নতুন করে জাতির ঘাড়ে সিন্দাবাদের ভূতের মতো বসে আছে। কিন্তু চেতনাবণিজ্যের কারণে আমাদের বুদ্ধিজীবীদের কণ্ঠ থেকে শুধু চিচি শব্দ বের হচ্ছে, জোরালো কোনো আওয়াজ নেই। হুমায়ুন আজাদকে আমাদের দরকার এই কারণে যে, তিনি ছিলেন গ্রামসির ভাষায় আমাদের অর্গানিক বা অঙ্গীকারাবদ্ধ বুদ্ধিজীবী। যদিও তিনি নিজেকে কখনো বুদ্ধিজীবী বলতেন না। কিন্তু আমরা যখন দেখি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হল আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রাজপথে নামতে, তার অঙ্গীকারকে আকার দিতে, তখন তিনি আমাদের কাছে একজন অর্গানিক বুদ্ধিজীবী হিসেবেই হাজির না হয়ে পারেন না।

বাংলা ট্রিবিউন

Comments are closed.