যোগ্য অভিভাবকহীন আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প : আলেকজান্ডার বো

চলচ্চিত্র অভিনেতা আলেকজান্ডার বো। ‌‘ম্যাডাম ফুলি’ খ্যাত এই নায়ক একটা সময় চলচ্চিত্রে দাপিয়ে অভিনয় করেছেন। এখন অভিনয়ের চেয়ে ব্যবসায় মনোযোগী বেশি। চার বছর ধরে তিনি মালয়েশিয়ায় এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। ঢাকা টু মালয়েশিয়া আসা যাওয়ার মধ্যে থাকেন। তবে চলচ্চিত্র থেকে দূরে সরে যাননি।

বর্তমানে তিনটি ছবিতে কাজ করছেন। এছাড়া আসন্ন শিল্পী সমিতির নির্বাচনে ওমর সানি- অমিত হাসান প্যানেল থেকে আন্তর্জাতিক সম্পাদক পদে নির্বাচন করছেন।

জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত এ অভিনেতা জানান তার ব্যবসায়িক হাল হকীকত। বলেন, মালয়েশিয়ার আমার নিজস্ব কোম্পানি আছে, নাম ‘সিলভার মুন’। গেল বছর আমেরিকার নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর ব্যবসায় কিছুটা মন্দার হাওয়া লেগেছে।

এর কারণ হচ্ছে, মালয়েশিয়ার ইকোনমির অবস্থা ভালো যাচ্ছে না। সেখানে রিঙ্গিতের (মালয়েশিয়ার মুদ্রার নাম) মূল্য কমেছে। তাই আমিও ব্যবসায় অনেক টাকা লোকসান দিয়েছি। আশা করছি, অবস্থার পরিবর্তন হবে শিগগিরই।’

১৯৯৫ সালে শহীদুল ইসলাম খোকন পরিচালিত ‘ম্যাডাম ফুলি’ ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন আলেকজান্ডার বো। এটি ছিল তার প্রথম ছবি। এরপর অসংখ্য অ্যাকশন ছবিতে পাওয়া গেছে এ অভিনেতাকে। এছাড়া নিজেই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান খুলেছিলেন। নাম ‘মা মুভিজ’। এই ব্যানারে গ্যাংস্টার, অর্ডার এবং ক্ষমতা নামে তিনটি ছবি নির্মাণ করেছিলেন।

এছাড়া ‘বিয়ের সানাই’ নামে আরও একটি ছবি বানানোর কথা থাকলেও সেটা হয়নি। বর্তমানে ‘হারজিৎ’, ‘মারছক্কা’ ছাড়া আরও একটি ছবিতে অভিনয় করছেন আলেকজান্ডার। তার অভিনীত সর্বশেষ ছবি ‘লাভ স্টেশন’।

আলেকজান্ডার বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমার অভিনীত ১৩৫টির বেশি মুক্তি পেয়েছে। যার বেশিরভাগই ব্যবসাসফল। তাই আমি নিজে ব্যবসা করলেও মন পড়ে থাকে চলচ্চিত্রে। শুধু চলচ্চিত্রের স্বার্থেই কিন্তু এবার নির্বাচন করছি। তাছাড়া আমাকে নির্বাচনে আনতে অনেক মানুষ রিকোয়েস্ট করেছেন। ভাবলাম এখানে অনেক সমস্যা আছে। সেগুলো দূর করতে হলে আমাদেরই এগিয়ে আসতে হবে। তাই নির্বাচন করছি।’

বর্তমান চলচ্চিত্রের অবস্থা নিয়ে আলেকজান্ডার বলেন, ‘চলচ্চিত্রে এখন নেতৃত্বের অভাব। যার যেখানে প্রয়োজন সে সেখানে নেই। যেমন- আমার প্রয়োজন অ্যাকশন হিরো, কিন্তু সেখানে মামা-খালুর জোরে অন্য একজন আনাড়ি কাউকে নেয়া হচ্ছে। এতে ভালো কাজ আসছে না, অভিনয় পারছে না তারা। ছবিও চলছে না।’

আরও বলেন, ‘আগে একজন লগ্নিকারক ২০ লাখ টাকা নিয়ে আসলে বাকি টাকা নিজেরা ম্যানেজ করে ছবি করে দিতাম। পারিশ্রমিক ছবি মুক্তির পর নিয়েছি। আর এখন আগে টাকার হিসাব করে, ছবির কথা পরে ভাবছে। এভাবে তো ফিল্ম চলে না। যে কারণে ১২০০ সিনেমা হল থেকে নেমে ৩০০-তে এসে ঠেকেছে। ধীরে ধীরে এফডিসি হয়ে যাচ্ছে শ্মশান।’

তিনি যোগ করে আরও বলেন, ‘এ অবস্থার জন্য শাকিবেরও অনেক দোষ রয়েছে। সেগুলো ধীরে ধীরে সবাই এখন বুঝতে পারছেন। তাছাড়া ফিল্মে যারা সিনিয়র ছিলেন জসীম ভাই, মান্না ভাই তারা চলে যাওয়ায় আরও খারাপ হয়ে গেছে জায়গাটা। চলচ্চিত্রের একটা বড় সংগঠন প্রযোজক সমিতিও অকার্যকর। এখন আমাদের অভিভাবক দরকার। সেই অভাবের স্থানটা চলচ্চিত্রে সিনিয়র যারা আছেন তারা অনেকটাই পূরণ করতে পারবেন বলে আমি মনে করি।’

নিজের নির্বাচনী ভাবনা নিয়ে আলেকজান্ডার বো বলেন, ‘কয়েক বছর আগে রুবেল ভাই যখন সেক্রেটারি ছিলেন তখন আমি কার্যকরী সদস্য ছিলাম। তখন অনেক কাজ করেছিলাম। যারা ওই সময়টা ছিলেন তারা সব জানেন। ওই সময় প্রচুর শুটিংয়ে ব্যস্ত থাকতাম। এর ফাঁকেই কাজ করেছি।’

তিনি বলেন, ‘এবার নতুন-পুরনো সবাই নির্বাচন করছেন। তবে নতুনদের কাছে সিনিয়রদের গ্রহণযোগ্যতা অনেক কম। আমাদের সময়ে আমরা সিনিয়রদের অনেক সম্মান দিতাম। দেখলে সালাম দিতাম, চেয়ার ছেড়ে সরে যেতাম। কিন্তু এখন সিনিয়দের কোনো সম্মানই দিতে চায় না নবীনরা। এটা একদমই ঠিক না। তবে কেউ কেউ আছে যারা সত্যি দারুণ স্বভাবের। পরিশ্রমও করছে ইন্ডাস্ট্রি সচল রাখতে। তাদের শুভকামনা।’

চলচ্চিত্রে অভিনয়ের বাইরেও চিত্রনায়ক আলেকজান্ডার বো একজন সফল মার্শাল আর্ট শিল্পী। শুধু দেশে নাম কামাননি, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাংলাদেশকে এর মাধ্যমে তুলে ধরেছেন একাধিকবার। তার ভাষায়, ‘জাতীয় কারাতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছি টানা ছয়বার, ১৯৯২ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত। প্রতিবারই গোল্ড মেডেল পেয়েছি। এছাড়া সাউথ এশিয়ান কারাতে চ্যাম্পিয়ন ১৯৯৭ সালে নির্বাচিত হয়েছি। যেটা দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এছাড়া ১৯৯৮ সালে রাশিয়াতে ইউরোপিয়ান কারাতে প্রযোগিতায় অংশ নিয়ে রানারআপ হয়েছিলাম।’

একজন সফল নায়ক ছাড়াও ব্যক্তিগত জীবনে আলেকজান্ডার বো ভীষণ সাদাসিধে একজন মানুষ। তার গ্রামের বাড়ি মুন্সিগঞ্জ জেলায়। ব্যক্তিগত জীবনে স্ত্রী, এক পুত্র ও এক কন্যার জনক আলেকজজান্ডার।

জাগো নিউজ

Comments are closed.