নারী ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের স্বপ্ন পূরণের ঠিকানা ‘জয়িতা’

সেলিনা শিউলী: ‘স্বামী ও সংসার ছেড়েছি। উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পরিবারের সদস্যসহ আত্মীয়-পরিজনদের লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সয়েছি। এই জয়িতাই আমার স্বপ্ন, ধ্যান-জ্ঞান। নিজেকে আত্মবিশ্বাসে ভরপুর আত্মনির্ভরশীল একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে দেখতে চাই’। কথাগুলো বলছিলেন মুন্সীগঞ্জের নাজনীন আক্তার মুক্তা।

নাজনীন বলেন, এই পথচলা অনেক কঠিন ছিল। পদে পদে বাঁধা। শ্বশুরবাড়িতে ঠাঁই হয়নি। স্বামীও বিশ্বাস রাখতে পারেনি। মুন্সীগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসে দিনের পর দিন সেলস গার্লের কাজ করতাম। স্বপ্ন ছিল একদিন সাবলম্বী হবো। পরিবারের আপনজন বলে যাদের মনে করতাম তারা বিষয়টিকে সহজভাবে নেয়নি। হয় ঘর-সংসার নইলে স্বপ্ন- কোনটা বেছে নেব- এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলাম। একদিন নিজের ইচ্ছার কাছে হার মানলাম। স্বামী তালাক দিলেন। সেই থেকে ‘জয়িতায়’ আছি। তবে, সেলস গার্ল হিসেবে নয়। একজন উদ্যোক্তা হিসেবে। এখানে নিজের ব্যবসা দেখছি। ‘উত্তরণ নারী উন্নয়ন নামে একটি সমিতি করেছি। প্রায় ৫০ জন নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এতে।’

শুধু নাজনীন নয়, সালমা ডেইজী, ফাতেমা, নিলুফার, তাহমিনা, ববিতা দাশ, নাছিমা, জোহরার মতো প্রায় ১৪০ জন নারী দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নিজেদের মেধা, প্রতিভা আর সৃজনশীলতার মাধ্যমে নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে ‘জয়িতা’তে যুক্ত হয়েছেন। তাদের এ পথচলা সহজ ছিল না। নিজ নিজ এলাকায় জীবন আর অস্তিত্ব রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু প্রেক্ষাপট বদলে যায় তাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে মহিলা বিষয়ক অধিদফতর ও বেসরকারি সংগঠন নারী উন্নয়ন সংস্থার কার্যক্রমে।

‘জয়িতা’ এখন একটি সুপরিচিত নাম। যে জয় করতে জানে সে বিজয়ী। সেই ‘জয়িতা’। দেশের বিভিন্ন এলাকার নারীদের আত্মনির্ভরশীল হতে উদ্বুদ্ধ করতে এর পদযাত্রা ২০১১ সালের ১৬ নভেম্বর । ১৮০ জনকে নিয়ে শুরু হয় এর পথচলা । বিভিন্ন অঞ্চলের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা তাদের সমিতিতে তৈরি পণ্য বাজারজাতকরণের লক্ষ্যে এ ‘জয়িতা’তে আসার সুযোগ পান।

ধানমন্ডির রাপা প্লাজার দুটি ফ্লোরের ২৪ হাজার বর্গফুট জায়গা এর অবস্থান হলেও একই এলাকায় ৩টি বেজমেন্ট, বিভিন্ন স্থান থেকে আগত উদ্যোক্তা ও কর্মচারীদের (নারী) জন্য হোস্টেল নির্মাণ,সুইমিংপুলসহ আরও নানা পরিকল্পনা নিয়ে ২ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৬ তলা ‘জয়িতা ফাউন্ডেশন’ ভবন নির্মাণ করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এখানে জয়িতাদের নিজস্ব ভুবন। ক্রেতা তার পুরোপুরি সুযোগ ও সুবিধা যাতে পেতে পারে সেজন্য কাঁচাবাজার, শিশুদের খেলার ব্যবস্থা রয়েছে। বর্তমানে ‘জয়িতা’র ব্যয়ের ৮০ শতাংশ বহন করছে সরকার, ২০ শতাংশ সমিতি। তবে লাভের পুরো অংশই পান দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা সমিতির সম্পৃক্ত নারী উদ্যোক্তারা।

অনেক উদ্যোক্তা যোগাযোগ ব্যবস্থা বা পরিবেশ প্রতিকূল না হওয়ায় এর বলয় থেকে যেমন বেরিয়ে গেছেন, তেমনি যুক্ত হয়েছেন অনেকেই। মাসিক পাঁচ হাজার টাকা ভাড়ায় তারা নিজেদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করছেন এখানে। বিলুপ্ত প্রায় বিন্নি চালের নানা খাদ্য, চিড়া, মুড়ি, ঢেঁকিছাটা চাল, ঘি, দই, আচার, কাসুন্দি, বাঁশ, পাট ও বেতের তৈরি নান্দনিক গৃহস্থালী পণ্য থেকে শুরু করে বেডকভার, কুশন, পর্দা, পিলো কাভার, কার্টেন কভার, রুটি রাখার ঝুড়ি, ফল রাখার ঝুড়িসহ বিভিন্ন ডিজাইন ও মাানের পোশাক। এখানেই শেষ নয়, ক্রেতাদের আকর্ষণ করতে রয়েছে ফুড কোর্ট। হাঁস-মুরগির মাংস ও মাছ রয়েছে। পাওয়া যাচ্ছে দেশীয় ঐতিহ্যবাহী পিঠাপুলি ও ফাস্টফুড। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জেলা-উপজেলা ও বিভাগীয় শহরে জয়িতার শাখা হবার কথা ঘোষণা করেছিলেন উদ্বোধনকালে। এরই ধারাবাহিকতায় ময়মনসিংহের ভালুকায় একটি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঠিকানা হয়েছে। রাজধানীর ইস্কাটনে এবং বেইলি রোডের মহিলা অধিদফতরের নিচে একটি খাবারের দোকান রয়েছে। নারী উদ্যোক্তাদের একটি অংশ সংসদ ভবন এলাকায়ও ফুড কোর্ট করেছে।

পাবনা জেলার বেড়া উপজেলার সংগ্রামী নারী সালমা ডেইজী। তিনি পোশাকসহ নানা সামগ্রী বিক্রি করেন। দেশীয় ঐতিহ্য ফুটিয়ে তোলেন তার পরিকল্পনায়। বাস্তব রূপ দেন নিজের গড়া রূপালী মহিলা উন্নয়ন সমিতিতে কর্মরত নারীদের মাধ্যমে। সালমা জানান, নিজের এলাকায় তৈরি পণ্য বিক্রি করতাম। এখন জয়িতার উদ্যোগের কারণে রাজধানীতে এসে এসব পণ্য বিক্রি করছি। তবে এখন সরকারের ‘জয়িতা ফাউন্ডেশনে’ নিজেকে সম্পৃক্ত রাখতে চাই।

মহিলাবিষয়ক অধিদফতর সূত্র জানায়, অধিদফতরের অধীনে থাকা দেশের বিভিন্ন জেলার নিবন্ধিত ১৮০টি সমিতির নারীদের উৎপাদিত পণ্য ‘জয়িতা’য় আনা হয়।
বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত নারীদের আবাসন সংকট দূর করতে রাজধানীর লালমাটিয়া এলাকায় ‘জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয় ভবনের উপর তলায় জয়িতা নারীদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া অনেকে ভিন্ন স্থানে মেস বা বাসা ভাড়া করে থাকেন। লালমাটিয়ায় অবস্থিত এ হোস্টেলে দৈনিক ২০ টাকা দিয়ে একজন সেলসগার্ল বা বিক্রয় সহকারি থাকতে পারেন। সমিতির সভানেত্রীরা দৈনিক ৫০ টাকা দিয়ে এ হোস্টেল থাকতে পারেন।

মহিলা অধিদপ্তর সুত্রে জানা যায়, জয়িতার কর্মপরিধি সারাদেশে বিস্তৃত করার লক্ষ্যে সরকার ইতিমধ্যেই ব্যাপক পরিকল্পনা নিয়েছে। ইতিমধ্যে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে জয়িতার একটি আউটলেট চালু করা হয়েছে। গাজীপুরের কালীগঞ্জে এবং বান্দরবানে শিঘ্রই নতুন আউটলেট খোলার প্রস্ততি চলছে। পর্যায়ক্রমে সারাদেশে এ ধরণের আউটলেট সম্প্রসারিত হবে।

এবছর বাণিজ্য মেলায় ‘জয়িতা’র ঊনত্রিশজন নারী উদ্যোক্তা অংশ নেন। প্রতি উদ্যোক্তা ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার পণ্য বিক্রয় করেছেন। জয়িতার তৈরি পণ্য বিক্রি করে তারা খুব খুশি। এছাড়া বছরব্যাপী বিভিন্ন মেলায় তারা নিজেদের উৎপাদিত পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রী করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, ‘জয়িতা’ শুরুর সময় ২৫ হাজার টাকা জমা দিতে হতো। এখন এটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ টাকায়। গত বছর বাণিজ্যমেলায় ৪০ জন নারী উদ্যোক্তা অংশগ্রহণ করেছিলো। এবার ২৯ জন। কিন্তু গত বছরের তুলনায় এবার বড় প্যাভিলিয়নে ‘জয়িতা’র ব্যানারে দোকান করে এসব উদ্যোক্তারা বেশি লাভবান হয়েছেন।

বাসস

Comments are closed.