হুমায়ুন আজাদ হত্যার বিচার: ১৩ বছরেও শেষ হয়নি !

আলমগীর হোসেন: দীর্ঘ ১৩ বছরেও শেষ হয়নি প্রথাবিরোধী লেখক ড. হুমায়ুন আজাদ হত্যা মামলার বিচার। জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পরও সাক্ষীরা আদালতে হাজিরা হচ্ছে না। এ কারণে মামলার বিচার কার্যক্রম শেষ করতে পারছে না রাষ্ট্রপক্ষ। নানা অজুহাতে এক যুগ পরেও দেশের এই আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার ঝুলে আছে।

২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমির পাশে হুমায়ুন আজাদকে কুপিয়ে জখম করে সন্ত্রাসীরা। এর ১শ’ ৬৩ দিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

হুমায়ুন আজাদ হত্যা মামলা ধীর গতির মূল কারণ দুই ডাক্তারের সাক্ষীর অভাব। মামলার ৫৮ সাক্ষীর মধ্যে ৩৮ জনের সাক্ষ্যগ্রহন এরইমধ্যে শেষ হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী দুই ডাক্তারসহ ২০ জনের সাক্ষ্যগ্রহন বাকী আছে। তারা সাক্ষ্য দিলেই মামলার কার্যক্রম শেষ করবে রাষ্ট্রপক্ষ। বারবার আদেশের পরও দুই ডাক্তার আদালতে হাজির না হওয়ায় বিচার কাজ থেমে আছে। মামলাটি বর্তমানে ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন।

মামলার গুরুত্বপূর্ণ যে দুই ডাক্তারের কারণে বিচার শেষ হচ্ছে না তারা হলেন, ডা. শহিদুল ইসলাম ও ডা. শওকত হাসান। ডা. শহিদুল ইসলাম ওই সময়ে সহকারি রেজিস্ট্রার হিসেবে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কর্মরত ছিলেন। আর ডা. শওকত হাসান সার্জিক্যাল বিশেষজ্ঞ হিসেবে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) কর্মরত ছিলেন। তারা দু’জনই ড. হুমায়ুন আজাদের শরীরের জখমের পরীক্ষা করেন।

মামলা সম্পর্কে ওই আদালতের অ্যাডিশনাল পাবলিক প্রসিকিউটর সাইফুল ইসলাম বলেন, মামলার কার্যক্রম প্রায় শেষের দিকে। দুই চিকিৎসকের সাক্ষ্য গ্রহণ করে সাক্ষী ক্লোজ করা হবে। কিন্তু পুলিশ ওই দুই সাক্ষীকে আদালতে হাজির করতে পারছে না।তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, সাক্ষীদের আদালতে হাজির করতে পুলিশের যথেষ্ট গাফিলতি রয়েছে।’

মামলার বিচার কবে শেষ হতে পারে এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা তো আশা করেছিলাম মামলাটির বিচার ২০১৫ সালেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু পুলিশ সাক্ষী হাজির করতে না পারায় সেটা সম্ভব হয়নি। তবে আশা করছি শিগগিরই আলোচিত মামলাটির বিচার শেষ হয়ে যাবে।’

প্রসঙ্গত, ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অমর একুশে বইমেলা থেকে বাসায় ফেরার পথে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সামনে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন ড. হুমায়ুন আজাদ। তাকে চাপাতি ও কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। ঘটনার পরদিন ২৮ ফেব্রুয়ারি তার ভাই মঞ্জুর কবির রমনা থানায় একটি হত্যা চেষ্টা মামলা করেন।

হামলার পর হুমায়ুন আজাদ ২২ দিন সিএমএইচে এবং ৪৮ দিন ব্যাংককে চিকিৎসারত ছিলেন। পরে জার্মানির মিউনিখে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একই বছরের ১২ আগস্ট তিনি মারা যান। তার মৃত্যুর পর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তর হয়।

২০০৭ সালেরর ১৪ নভম্বের সিআইডির পরিদর্শক কাজী আবদুল মালেক জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহেদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) প্রধান শায়খ আবদুর রহমান, আতাউর রহমান সানি, নূর মোহাম্মাদ সাবু ওরফে শামীম, মিনহাজ ওরফে শফিক, আনোয়ার আলম ওরফে ভাগিনা শহিদকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দেন।

২০০৭ সালের ৩০ মার্চ ঝালকাঠির দুই বিচারক হত্যা মামলায় শায়খ আবদুর রহমান ও আতাউর রহমানের ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় অভিযোগপত্র থেকে তাঁদের নাম বাদ দেওয়া হয়।

সিআইডির পরিদর্শক লুৎফর রহমান মামলাটির মূল তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন। তিনিই মামলাটি তদন্তের পর ২০১২ সালের ৩০ এপ্রিল পাঁচ আসামিকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা হলেন, জেএমবির সুরা সদস্য মিজানুর রহমান ওরফে মিনহাজ ওরফে শফিক, আনোয়ার আলম ওরফে ভাগ্নে শহিদ, সালেহীন ওরফে সালাহউদ্দিন, হাফিজ মাহমুদ ও নূর মোহাম্মদ ওরফে সাবু। এদের মধ্যে আসামি নুর মোহাম্মদ ওরফে সাবু পলাতক।

এ মামলায় জেএমবির শূরা সদস্য মিজানুর রহমান ওরফে মিনহাজ ওরফে শফিক ও আনোয়ার আলম ওরফে ভাগিনা শহিদ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পুলিশের প্রিজনভ্যান থেকে এ মামলার দুই আসামি সালাহউদ্দিন ওরফে সালেহীন এবং রাকিবুল হাসান ওরফে হাফিজ মাহমুদকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পরে এদের মধ্যে রাকিব ওইদিন রাতেই ধরা পড়েন এবং পরে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যান।

আদালতে মামলাটির সাক্ষী তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক লুৎফর রহমানের জবানবন্দি শেষে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাকে আংশিক জেরা করেন।

এ মামলার উল্লেখ্যযোগ্য সাক্ষ্য দাতারা হলেন হুমায়ুন আজাদের ভাই মঞ্জুর কবির, আগামী প্রকাশনীর প্রকাশক ওসমান গনি ও ঘটনাকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এলএলবি অনার্সের ছাত্র আইনজীবী এস এম শফিকুর রহমান আশিক, হুমায়ুন আজাদের স্ত্রী লতিফা, কবি মোহন রায়হান এবং কবি ও সাংবাদিক নাসির আহমেদ।

হুমায়ুন আজাদের বড় মেয়ে মৌলি আজাদ বলেন, ‘আমরা দীর্ঘ দিন ধরে খুনিদের শাস্তির অপেক্ষায় আছি। এখন দ্রুত মামলার বিচার শেষ হোক- তাই চাই।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহম্মদ সামাদ বলেন, ‘যেভাবে শিশু হত্যার বিচার দ্রুত হচ্ছে সেভাবে প্রথাবিরোধী লেখক আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক আমাদের সহকর্মী-সহযোদ্ধার এ হত্যার বিচার অতি দ্রুত শেষ করার দাবি জানাই।’ লেখক ও প্রকাশক ছাড়াও জাতির মঙ্গলের জন্যই এই বিচার দ্রুত হওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেন, ‘মৌলবাদী-উগ্রবাদী শক্তি বারবার আমাদের স্বাধীনতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় আঘাত করে চলেছে। তারা আমাদের হুমায়ুন আজাদ, লেখক অভিজিৎ ও প্রকাশক দীপনকে হত্যা করেছে। আমি চাই যুদ্ধাপরাধের বিচারের মতো এই ধরনের হত্যাকাণ্ডের বিচার যেন দ্রুত নিষ্পত্তি করা হয়।’

পূর্ব পশ্চিম

Comments are closed.