খালেদা ৮ বারের ওয়াদা না রাখায় অবসরে মোয়াজ্জেম

প্রবীণ রাজনীতিবীদ শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন। আওয়ামী লীগের রাজনীতি থেকে শুরু করে জাতীয় পার্টি এবং সর্বশেষ বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। ২০০৮ সালে বিএনপিতে যোগদানের পর থেকেই তিনি দলের ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু ২০১৬ সালে বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে দলের নীতিনির্ধারনী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে প্রত্যাশিত পদ পাননি বলে ক্ষুব্ধ হয়ে রাজনীতি থেকেই অবসরের ঘোষণা দেন।

শাহ্ মোয়াজ্জেমের ঘনিষ্ঠজনরা জানান, তার নির্বাচনী এলাকায় বিএনপির সাবেক মহাসচিব এবং বর্তমানে বিকল্পধারার প্রেসিডেন্ট ডা: একউিএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী রয়েছেন। বি চৌধুরী বিএনপিতে থাকাকালীন সময়ে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে শাহ মোয়াজ্জেমকে একাধিকবার গ্রেফতার এবং হয়রানিমূলক রাজনৈতিক মামলায় কারাগারে পাঠিয়েছিলেন। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের আগ মুহুর্তেই এ ধরনের ঘটনা ঘটতো।

যে কারণে তিনি নব্বই দশকের পর এলাকায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে পারেন নি। কিন্তু বি চৌধুরী বিএনপি থেকে আলাদা হয়ে বিকল্পধারা রাজনৈতিক দল গঠন করায় শাহ মোয়াজ্জেমের রাজনৈতিক সুবিধা নেয়ার বদলা হিসেবেই তিনি ২০০৮ সালে খালেদা জিয়ার সাথে দেখা করেন। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার আগ্রহে তিনি বিএনপিতে যোগদানও করেন। ওই সময়ে খালেদা জিয়া তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন, যোগ্য মর্যাদা দেয়া হবে এবং দলের স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভূক্ত করা হবে। কিন্তু ২০০৯ সালের পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে সম্ভব হয়ে ওঠেনি বলে খালেদা জিয়া তাকে আবারো আশ্বস্ত করেন- পরবর্তী কাউন্সিলে মর্যাদার আসনে বসানো হবে। সর্বশেষ কাউন্সিলের আগেও এমন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া।

খালেদার ওই আশ্বাসের কথা শাহ্ মোয়াজ্জেমের নির্বাচনী এলাকার সাধারণ মানুষসহ সারাদেশের নেতাকর্মীরাও জানতে পেরেছিলেন। যে কারণে ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের আগে নেতাকর্মীদের ঢল নামে তার বাসভবনে। কিন্তু কাউন্সিল শেষে প্রায় তিন মাস পর ঘোষিত ঢাউস আকৃতির কমিটিতে শাহ্ মোয়াজ্জেমের ভাগ্যে কোনো পরিবর্তন হয়নি। আগের ভাইস চেয়ারম্যান পদেই তাকে রাখা হয়েছে।

শাহ্ মোয়াজ্জেমের অনুসারী নেতাকর্মীরা জানান, সবসময় যোগ্যতাই শাহ্ মোয়াজ্জেমের কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিএনপিতে খালেদা জিয়া তাকে স্থায়ী কমিটিতে সম্মানীত করবেন বলে প্রায় ৮ বার ওয়াদা দিয়েছিলেন। কিন্তু তা আর বাস্তবায়ন করেননি।

তারা জানান, অনাড়ম্বর জীবন যাপনে অভ্যস্ত প্রথিতযশা রাজনৈতিক নেতা শাহ্ মোয়াজ্জেম হোসেন এখন নিজ বাসভবনেই সময় কাটান। রাগে-অভিমানে ইতোমধ্যে তিনি রাজনীতি থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছেন। এ কারণে তিনি এখন আর বিএনপি চেয়ারপার্সনের কার্যালয়েও যাচ্ছেন না। এমনকি কারো ডাকে সাড়াও দেন না ক্ষুব্ধ এই নেতা।

নেতাকর্মীরা জানান, শাহ্ মোয়াজ্জেম হোসেন বিএনপিতে যোগদানের পর নবম জাতীয় নির্বাচনের আগে দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে কিছু বিষয়ে তথ্য দিয়ে পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু চেয়ারপার্সনের চারপার্শে অবস্থানকারীরা ম্যাডামকে ভুল বুঝিয়ে ওই সকল পরামর্শ গ্রহণে বাধা দেন। কিন্তু মোয়াজ্জেম হোসেনের আশঙ্কা আর তথ্যই বাস্তবে রুপ লাভ করে। এর প্রেক্ষিতে খালেদা জিয়াও তার ভুল স্বীকার করেন। এরকমভাবে অন্যান্য সময়েও শাহ মোয়াজ্জেম দলের প্রয়োজনে কাজ করেছেন, পরামর্শ দিয়েছেন। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের ভারপ্রাপ্ত পদ দূর করার জন্যও সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করেছিলেন।

‘শিমুল-রিজভী মার্কা’ সিন্ডিকেট ভেঙ্গে বিএনপিকে রাজনৈতিক প্লাটফর্মে নিয়ে আসার নিরলস চেষ্টা করেছেন। এমনকি বহির্বিশ্বে দলের ভাবমুর্তি বাড়ানোর জন্য যোগ্যদের নিয়ে কূটনৈতিক সেল গঠনেরও তাগাদা দিয়েছিলেন তিনি। যোগ্যদের যথাস্থানে বসানেরও পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু এবারও অবমূল্যায়িত হয়েছেন। এসব বিষয়ে আগে থেকেই ক্ষুব্ধ ছিলেন শাহ্ মোয়াজ্জেম। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে- প্রত্যাশিত পদে পদ না পাওয়া। নেতাকর্মীরা জানান, তার কর্মীর থেকেও জুনিয়রদের দিয়ে দল পরিচালনার ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা দিতেই তিনি রাজনীতিতে ইস্তফা দিয়েছেন।

এ বিষয়ে শাহ্ মোয়াজ্জেম হোসেন পূর্বপশ্চিমকে বলেন, বয়সতো আর কম হলো না। ইতিমধ্যে ৮০ পার করেছি। আমি রাজনীতি থেকে অবসর নিয়েছি এটা সত্য। কিন্ত মহান সৃষ্টিকর্তা আমাকে অবসর দিয়েছেন কি না তা বলতে পারবো না। কারণ তিনিই আমাদের সকল কিছু নির্ধারণ করে দেন।

শাহ্ মোয়াজ্জেম হোসেন ১৯৩৯ সালের ১০ জানুয়ারী মুন্সীগঞ্জ জেলার দোগাছি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫২ সালে শাহ মোয়াজ্জম হোসেন নবম শ্রেণিতে থাকা অবস্থায় ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে গুরুতর আহত অবস্থায় গ্রেফতার হন। এরপর থেকেই তার রাজনৈতিক পথচলা শুরু। এরপর পূর্ব পাকিস্থান ছাত্রলীগের সাধারন সম্পাদকসহ তিনবার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালে ৬দফা, ১৯৬৯ সালের এগারো দফা এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে অন্যতম সংগঠক ছিলেন। ১৯৭০ ও ১৯৭৩ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আশির দশকে জাতীয় পার্টিও মহাসচিব, মন্ত্রী, সংসদ উপনেতা ও উপ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিক জীবনে তিনি ২০ বছরেরও বেশি কারাগারে থেকেছেন বলে অনেকে তাকে ‘কারাগারের পাখি’ বলেও চেনেন।