উৎসবমুখর পরিবেশে জাপানে জাতির জনকের জন্মদিন পালিত

রাহমান মনি: স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৮তম জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস ২০১৭ যথাযথ উৎসাহ-উদ্দীপনা ও উৎসবমুখর পরিবেশে মর্যাদার সঙ্গে জাপানের রাজধানী টোকিওতে বাংলাদেশ দূতাবাসে পালিত হয়েছে। এ উপলক্ষে ১৯ মার্চ ২০১৭, রোববার দূতাবাস ভবন মিলনায়তনে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

বৈকালিক এ আয়োজনে জাপানের বিভিন্ন স্থান থেকে অর্ধশতাধিক শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমা শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন।

শুভেচ্ছা বক্তব্যে রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমা বলেন, মহান স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৮তম জন্মদিন এবং জাতীয় শিশু দিবস ২০১৭ পালনের আজকের এই শুভক্ষণে আমি প্রথমেই জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান এবং শাহাদাত বরণকারী তার পরিবারের সকল সদস্যদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি এবং একইসঙ্গে তাদের সকলের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি এই মানুষটির জন্ম না হলে আজ আমরা আমাদের ভূখ- পেতাম না। বাংলাদেশ দূতাবাস নামেও কোনো দূতাবাসের অস্তিত্ব জাপানে থাকত না। বঙ্গবন্ধু দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য, স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার জন্য কাজ করে গেছেন। জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন, দেশের মানুষকে কতটা ভালোবাসতেন, বিশ্বাস করতেন। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ দুইটি সমার্থক। বাংলাদেশকে জানতে হলে আগে বঙ্গবন্ধুকে জানতে হবে। শিখতে হবে। এজন্য প্রয়োজন প্রচুর পড়াশুনা।

রাষ্ট্রদূত বঙ্গবন্ধুর শৈশবকালের চারিত্রিক গুণাবলির কথা উল্লেখ করে জাতীয় শিশু দিবসে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তার সাহসিকতা, সহমর্মিতা, আত্মমর্যাদাবোধ, দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ, বিচক্ষণতা, সরলতা ও সততা অনুসরণ করে আদর্শ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভিশন ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়ার লক্ষ্যে নিজেদের যথাযথভাবে প্রস্তুত করতে শিশুদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি অভিভাবকদের প্রতি শিশু-কিশোরদের বঙ্গবন্ধুর জীবনী, বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও কৃষ্টি শিক্ষা দেয়ার আহ্বান জানান। রাষ্ট্রদূত বলেন, আপনারা যদি নিজ নিজ সন্তানদের এসব বিষয়ে শিক্ষা না দেন তাহলে তারা আমাদের মহান ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশ সম্পর্কে কিছুই জানতে পারব না।

রাষ্ট্রদূতের শুভেচ্ছা বক্তব্যের পর শুরু হয় শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণে কুইজ প্রতিযোগিতা। কুইজ প্রতিযোগিতায় শিশু-কিশোরদের দুইটি ভাগে ভাগ করা হয়। ৬ বছর থেকে ৯ বছর পর্যন্ত এবং ১০ বছর থেকে ১৪ বছর পর্যন্ত। ক এবং খ গ্রুপ আখ্যায়িত করে উভয় গ্রুপে ১৬ জন করে মোট ৩২ জন শিশু-কিশোর রেজিস্ট্রেশন করে। প্রতিটি গ্রুপেই ২০টি করে সাধারণ জ্ঞান সম্পর্কিত প্রশ্ন করা হয়। প্রশ্নগুলো ছিল বঙ্গবন্ধু, তাঁর পরিবার এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে।

ক গ্রুপের শিশু-কিশোরদের মধ্য থেকে ২০টি প্রশ্নের মধ্যে ১১টির সঠিক জবাব দিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় নওশিন রহমান। যদিও নওশিন সবগুলো প্রশ্নের উত্তরের জন্য হাত তুলেছিল। কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী যে আগে হাত তুলবে তার কাছেই উত্তর চাওয়া হবে। এ গ্রুপে রানার আপ হয়েছে ওয়াসি রহমান। ওয়াসি ৫টি প্রশ্নের সঠিক জবাব দিতে পেরেছে। ৪টি প্রশ্নের সঠিক জবাব দিয়ে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে জেসিয়া বিনতে জাবেদ। বাকিরা কেউ-ই একটি প্রশ্নেরও উত্তর দিতে পারেনি।

খ গ্রুপ থেকে চ্যাম্পিয়ন হয় আদিবা তাহসিন ইসলাম। এই গ্রুপ থেকে রানার আপ হয় অংকিক নন্দী, রেজিস্ট্রেশন করার পর প্রতিযোগীকে দূতাবাস থেকে নমুনা প্রশ্নোত্তর প্রদান সত্ত্বেও প্রতিযোগিতার সময় বাংলাদেশের রাজধানীর নাম জানতে চাওয়া হলে মাত্র ২ জন হাত তোলে অথচ প্রতিযোগীদের সবাই উভয় অভিভাবকই বাংলাদেশি। রাজধানীর নাম বলতে না পারাটা অভিভাবকদের ব্যর্থতাই বলতে হবে। কারণ, এই বয়সের শিশু-কিশোররা নিজ দেশের রাজধানীর নাম জানাটা স্বাভাবিক হিসেবেই ধরে নেওয়া হয়।

কুইজ প্রতিযোগিতার পর শুরু হয় যেমন খুশি তেমন সাজো প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় শিশু-কিশোরদের নির্দিষ্ট কোনো বয়সের সীমাবদ্ধতা ছিল না। তাই ছোট শিশুরাই বিভিন্ন সাজে দর্শকদের সামনে হাজির হন। আর সাজের জন্য প্রায় শিশুই হয় মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিযোদ্ধা মা অর্থাৎ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জননী। তার মধ্য থেকে শহীদ বুদ্ধিজীবী এবং বীরঙ্গনা সাজটি (২টি) ছিল ব্যতিক্রম। এই ক্ষেত্রে উভয়ের অভিভাবকরা যথেষ্ট মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। শহীদ মুক্তিযোদ্ধার জননী সেজে ‘নাবা’ প্রথম পুরস্কার পায়।

এরপর শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে স্বরলিপি কালচারাল একাডেমির খুদে শিল্পীরা অংশ নিয়ে থাকে। এ ছাড়াও তনুতা ঘোষ সঙ্গীত পরিবেশন করে।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শেষে প্রতিযোগীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। পুরস্কার ছাড়াও অংশগ্রহণ সকল শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ সনদ এবং বই উপহার দিয়ে উৎসাহিত করা হয়। রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমা শিশু-কিশোরদের হাতে উপহার তুলে দেন।

পুরস্কার বিতরণী পর্ব শেষে র‌্যাফেল ড্র করা হয়। দূতাবাস আয়োজনে যেসব শিশু-কিশোর উপস্থিত ছিল প্রবেশকালে নাম্বার সম্বলিত একটি করে কুপন দেওয়া হয়। র‌্যাফেল ড্র’র আকর্ষণীয় পুরস্কার সেই নাম্বারের ভিত্তিতেই শিশুদের মধ্য থেকেই নাম্বার তুলে নেয়ার জন্য বেছে নেয়া হয়।

সবশেষে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ৯৮তম জন্মদিন উপলক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে কেক কাটা হয়। এবং আপ্যায়নের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়। একই সঙ্গে দিবসটি জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে পালিত হওয়ায় দূতাবাস আয়োজনে শিশু-কিশোরদের প্রাধান্য দেয়া হয়।

এ ছাড়াও ১৭ মার্চ ২০১৭ স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৮তম জন্ম দিবস ও জাতীয় শিশু দিবস-২০১৭ যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে উদযাপন উপলক্ষে দূতাবাস এক অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে দূতাবাসের নিজস্ব ভবনে।

অনুষ্ঠানমালার মধ্যে ছিল জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন। জাতিরজনক ও তার পরিবারের শাহাদাতবরণকারী সদস্যদের আত্মার মাগাফিরাত কামানা করে বিশেষ মোনাজাত।

দিবসটির স্মরণে বাংলাদেশ থেকে প্রাপ্ত মহামান্য প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী প্রদত্ত বাণীসমূহ পাঠ।

এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গৌরবময় জীবন ও কর্মের উপর আলোচনা, ১৭ মার্চ শুক্রবার জাপানে কর্মদিবস হওয়ায় প্রবাসীদের তেমন কোনো উপস্থিতি ছিল না। উভয় অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন দূতাবাস প্রধান এবং দ্বিতীয় সচিব মোহাম্মদ জুবায়েদ হোসেন।

rahmanmoni@gmial.com

সাপ্তাহিক