অভিমানে রাজনীতি ছাড়লেন শাহ মোয়াজ্জেম!

দলের নতুন কমিটিতে প্রত্যাশিত পদ না পেয়ে বেশ ক্ষেপেছিলেন। পরে শারীরিক অসুস্থতার কারণে দলীয় সভা-সমাবেশেও আসতেন না। অবশেষে বিএনপির প্রয়াত মহাসচিব কে এম ওবায়দুর রহমানের স্মরণসভায় এলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন। এসে ঘোষণা দিলেন রাজনীতিতে আর না থাকার। তার এই ঘোষণায় ঝরে পড়েছে অভিমান।

বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আয়োজিত স্মরণসভায় এভাবেই রাজনীতিকে বিদায় জানান শাহ মোয়াজ্জেম।

সাধারণত অনুষ্ঠানের প্রসঙ্গ ছেড়ে অন্য নানা কথা বলার একটা প্রবণতা আছে এই প্রবীণ রাজনীতিকের। আজও বললেন, তবে তা থমকে দিল উপস্থিত সবাইকে। বললেন, “আজকে এই মুহূর্ত থেকে আমি আর রাজনীতিতে থাকছি না। বয়সও হয়েছে, এখন ৮০ বছর চলছে। শরীরটাও ভালো যাচ্ছে না। আল্লাহ কখন ডাক দেয়। আমাকেও হয়তো ছোট ভাই মরহুম ওবায়দুর রহমানের কাছে চলে যেতে হবে।’

শাহ মোয়াজ্জেম বলেন, ‘এখানে অনেকেই উপস্থিত আছেন। আমি আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে যদি কাউকে কোনো কষ্ট দিয়ে থাকি, তাহলে আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।’

এ সময় মঞ্চে ও দর্শক সারির সামনে বসা বিএনপির নেতারা নিস্তব্ধ হয়ে যান।
বিএনপির প্রয়াত মহাসচিব কে এম ওবায়দুর রহমানের ১০ম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এ স্মরণসভার আয়োজন করে কে এম ওবায়দুর রহমান স্মৃতি সংসদ। প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

শাহ মোয়াজ্জেম বলেন, ‘বিএনপির কাউন্সিল হলো, কমিটি হলো, অনেকে অনেক পদ পেয়েছে। আমি সেসব নিয়ে কিছু বলতে চাই না। আজকে অনেকে এসেছেন, আমি কিছু বলব তা শুনবেন। কিন্তু আমি আজ রাজনীতি নিয়ে কিছু বলব না।

এ সময় মঞ্চে বসা নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, ‘আপনি বলেন।’ একথা শুনে তিনি বলেন, ‘তুমি বললে আমি বলব না।’

মোয়াজ্জেম এ সময় ৮৬ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি থেকে নিতাই রায় কীভাবে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন সেই কথা বলেন।

পরে বিএনপির মহাসচিবকে উদ্দেশ্ করে শাহ মোয়াজ্জেম বলেন, ‘এখানে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব আছে।’ তখন সবাই ‘পূর্ণ মহাসচিব’ বলে মনে করিয়ে দিলে তিনি বলেন, ‘ভারপ্রাপ্ত ছিল। ওর ভার কাটাতে অনেক কিছু করেছি। এখন আল্লাহর রহমতে পুরোপুরি মহাসচিব হয়েছে। যদিও আমি একটা কাজ দিয়েছিলাম, কিন্তু সে তা পারে নাই। ‘

তার বক্তব্য শেষে শাহ মোয়াজ্জেমকে মহাসচিব ফখরুলসহ সবাই ঘিরে ধরেন। কিন্তু ভিড়ের কারণে তাদের মধ্যে কী কথা হয় তা শোনা যায়নি। এরপর নেতাকর্মীরা বেষ্টনী তৈরি করে তাকে হল রুমের বাইরে এগিয়ে নিয়ে যান। মূল ফটকে শামা ওবায়েদসহ কয়েকজন তাকে বিদায় জানান।

দলীয় সূত্র বলছে, বিএনপির সর্বশেষ কাউন্সিলে শাহ মোয়াজ্জেমের অনুসারীরা প্রত্যাশা করেছিলেন দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে জায়গা পাবেন তিনি। কিন্তু তাকে ভাইস চেয়ারম্যান করায় তার অনুসারীরা হতাশ। ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে নাম ঘোষণার পর বেশির ভাগ সময় নিজেকে আড়াল করে রাখেন তিনি।

সভামঞ্চে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুস সালাম, জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধান, অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুব উল্লাহ, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

১৯৩৯ সালের ১০ জানুয়ারি মুন্সিগঞ্জ জেলার দোগাছি গ্রামে জন্ম শাহ মোয়াজ্জেম প্রায় অধিকাংশ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সামনের সারিতে ছিলেন। ১৯৫২ সালে নবম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় ভাষা আন্দোলন করতে গিয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথম কারাবরণ করেন।
১৯৫২ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর শাসনামলে কারাবরণ করেছেন তিনি। বন্ধুমহলে পরিচিত কারাগারের ‘পাখি’ শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন জীবনের প্রায় ২০ বছর জেলে কাটিয়েছেন।
১৯৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলনের সময় আইয়ুববিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলেন তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন।

১৯৬৬-এর ছয় দফা, ১৯৬৯ সালে ১১ দফা আন্দোলন ছাড়াও মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হিসেবে ভারতীয় পার্লামেন্টের যৌথ অধিবেশনে দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টা অগ্নিঝরা ভাষণ দেন তিনি।
হাতে অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীনের পর জাতীয় সংসদের প্রথম চিফ হুইপ হিসেবে শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন নানা স্থানে ছুটে যান।

১৯৭০ ও ’৭৩ সালের নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর আবার হুইপ হন। আশির দশকে এ নেতা জাতীয় পার্টির মহাসচিব, মন্ত্রী, সংসদ উপনেতা ও উপ-প্রধামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ঢাকাটাইমস

Comments are closed.