‘সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে আমাদের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠাতে’

টোকিওতে ড. মুহাম্মদ ইউনূস
রাহমান মনি: সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে আমাদের সকলের সম্মিলিত উদ্যোগই পারে বিশ্ব থেকে দারিদ্র্যকে চিরতরের জন্য জাদুঘরে পাঠাতে। এই জন্য প্রয়োজন সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। আর এই উদ্যোগের নেতৃত্ব দিতে পারেন আপনারা। অর্থাৎ জাপানি সমাজ। টোকিওতে সামাজিক ব্যবসা ফোরাম ২০১৭ নামক এক সেমিনারে জাপানি ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের প্রতি এ উদাত্ত আহ্বান জানান শান্তিতে নোবেল বিজয়ী একমাত্র বাংলাদেশি, সামাজিক ব্যবসার প্রবর্তক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

ড. ইউনূস বলেন, জাপানি ব্যবসায়ীদের সুনাম রয়েছে বিশ্বজুড়ে। সততা, দায়িত্ববোধ এবং কর্তব্যপরায়ণতা আপনাদেরকে এ সুনাম এনে দিয়েছে। আপনাদের এ সুনামকে কাজে লাগাতে হবে। আমি যখন জাপান আসি অনেক ব্যবসায়ী, সিইওরা আমার কাছে আসেন, সামাজিক ব্যবসা সম্পর্কে জানতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। পরামর্শ চান। অনেকেই আবার ইতোমধ্যে সামাজিক ব্যবসায় জড়িত হয়ে পড়েছেন। ভালোও করছেন। কেউবা হওয়ার পথে। কেউবা আবার ইতস্তত করছেন। যদি, আপনারা সামাজিক ব্যবসার প্রসার ঘটাতে চান তবে সম্মিলিতভাবে হয়ে নয় কেন? সম্মিলিত উদ্যোগই পারে সামাজিক ব্যবসাকে বিশ্বব্যাপী প্রসারিত করতে। এবং তা করতে পারলে একদিন সত্যিকারভাবেই বিশ্ব থেকে দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠানো সম্ভব হবে। অনাহারে কেউ আর মারা যাবেন না। সবাই দু’বেলা দু’মুঠো খাবারের ব্যবস্থা করতে পারবেন। সম্মানের সাথে জীবনযাপন করতে পারবেন। বিশ্ব হবে ক্ষুধামুক্ত এবং দারিদ্র্যমুক্ত এটাই আমাদের চাওয়া।

ড. ইউনূস আরও বলেন, মাত্র ১% লোকের হাতে বাকি ৯৯% লোকের সমপরিমাণ সম্পত্তি রয়েছে। এই ১% লোক বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। যা, আমাদের কাম্য হতে পারে না। এ হার কমাতে হবে। সবাই সমান না হলেও কোনোমতেই তা ১% আর ৯৯% হতে পারে না। এর থেকে আমাদেরকে উত্তরণ ঘটাতে হবে। নইলে বিশ্ব অর্থনীতি ভারসাম্য হারিয়ে একদিন মুখ থুবরে পড়বে। গরিবরা আরও গরিব হতে থাকবে।

তিনি বলেন, যদি আমরা একটি কাক্সিক্ষত সমাজ কিংবা বিশ্বের কল্পনা করতে না পারি, তাহলে তা কখনো সত্যি হবে না, বাস্তবে রূপ পাবে না। এই জন্য আমাদের গন্তব্যের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা দরকার। ডেসটিনেশন ঠিক থাকলে তবেই না গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে। কর্মপন্থা নির্ধারণ করে সেইমতে এগুলো গন্তব্যে পৌঁছানো সহজ হবে। অন্য কথায় কর্মই গন্তব্যে নিয়ে যাবে।

টোকিওতে ড. ইউনূস বলেন, গরিব হয়ে কেউ জন্মগ্রহণ করে না এবং প্রতিটি মানুুষই জন্মগতভাবে একজন উদ্যোক্তা। উদ্যোক্তা হয়েই তিনি জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু সমাজব্যবস্থাই তার জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা। সমাজই এমন পথ বাতলে দেয় যাতে তিনি চাকরির পিছনে ছুটেন। চাকরির ক্ষেত্র তৈরি করার জন্য করেন না। নিজের ভাগ্য নিজে গড়ছেন না। নিজেকে আরেকজনের হাতে অর্থাৎ নিয়োগদাতার হাতে তুলে দিয়েছেন।

আমাদের শিক্ষিত যুবকদের দেখাতে হবে যে, শিক্ষাজীবন শেষ করে চাকরির পিছনে না ছুটে নিজেই উদ্যোক্তা হলে কর্মক্ষেত্র তৈরি করা সম্ভব। আর এজন্য সামাজিক ব্যবসার প্রসার অন্যরকম হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে।

সোশ্যাল বিজনেস ফোরাম জাপান ২০১৭, আয়োজনে মূল বক্তব্য রাখেন শান্তিতে নোবেল বিজয়ী একমাত্র বাংলাদেশি প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ টোকিওর প্রসিদ্ধ এলাকা রোপ্পনগি হিলসে ড. ইউনূস ছাড়াও আরও বক্তব্য রাখেন গ্রামীণ ইউগ্লেনার সিইও সাতাকে ইউকো, সোশ্যাল বিজনেস ড্রিম পার্টনার্স বিশেষজ্ঞ নাকাগাওয়া নাওহিরো, প্রিমিয়া পিনগুইন (সোশ্যাল বিজনেস, সোশ্যাল ম্যানেজমেন্ট কলেজ) কোম্পানি লিমিটেডের অধ্যক্ষ ফুজিওকা শিন্জি, ইউনিক্লো সোশ্যাল বিজনেস বাংলাদেশ (গ্রামীণ ইউনিক্লো) সিইও নিত্তা ইউকিহিরো, ক্রেডি সুইস ব্যাংক জাপান প্রধান হিরাও সুনেআকি, গ্রামীণ কমিউনিকেশন ডাইরেক্টর, কিউশু বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. আশির আহমেদ, ড. ইউনেকুরা সেইচিরো, ইজুমো মিৎসুরু, ইয়ামাজাকি আৎসুইয়োশি, ইয়োশিওকা হিরেতো এবং ওয়াতামি কর্পোরেশনের কর্নধার ওয়াতানাবে মিকি।

১১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ড. ইউনূস জাপান সফর করেন। এর মধ্যে তিনি সামাজিক ব্যবসা সংক্রান্ত ১০টি আন্তর্জাতিক ফোরামে ভাষণ দানসহ বিভিন্ন কর্মকা-ে অংশ নেন। এছাড়াও অনেক কর্পোরেট ব্যবসায়ী ড. ইউনূসের সাথে ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ করেন এবং সামাজিক ব্যবসা সম্পর্কে আগ্রহ প্রকাশ করেন।

এর মধ্যে ২১ ফেব্রুয়ারি টোকিওতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সামাজিক ব্যবসা ফোরামে স্বাস্থ্যসেবা ও বয়স্কদের সমস্যা বিষয়ে ভাষণ দান করেন। অনুষ্ঠানে টোকিওর গভর্নর কোইকে ইউরিকো উপস্থিত ছিলেন। গভর্নর ২০২০ সালে টোকিওতে গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক, প্যারা অলিম্পিক ও নারী উদ্যোক্তাদের বিষয়ে ড. ইউনূসের পরামর্শ চান। প্রাক্তন পরিবেশমন্ত্রী, টোকিও গভর্নর কোইকে ২০২০ সালে অনুষ্ঠিতব্য টোকিও অলিম্পিক ও প্যারা অলিম্পিকের আয়োজক কর্মকর্তাদের একটি বিশেষ পরামর্শক সেশনে বক্তব্য রাখার জন্য অচিরেই আবার টোকিওতে আসার অনুরোধ জানিয়ে ড. ইউনূসকে আমন্ত্রণ জানান।

১৯ ফেব্রুয়ারি ড. ইউনূস জাপান পৌঁছেন। এই দিনই তিনি কিয়োতোতে দোশিশা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের উদ্দেশ্য বক্তব্য রাখেন। ড. ইউনূস কিয়োতো পৌঁছলে সেখানকার গভর্নর ইয়ামাদা কেইজি তাকে স্বাগত জানান। এই সময় গভর্নর ইয়ামাদা বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে ড. ইউনূসের সাথে আলোচনা করেন এবং এসব এর উত্তরণের সমাধান চেয়ে ড. ইউনূসের পরামর্শ চান।

২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ড. ইউনূস টোকিওর মেইহামাতে ইউমে অ্যাওয়ার্ড বিজনেস কনটেস্টে যোগ দেন। ৪ হাজার আসন বিশিষ্ট অডিটরিয়ামটি ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। নির্ধারিত সময়ের আগেই সব টিকিট বিক্রয় হয়ে যাওয়াতে অনেকেই যোগ দিতে পারেননি। টিকিটের নির্ধারিত মূল্য ছিল ৩ হাজার ইয়েন।

ড. ইউনূসই একমাত্র বাংলাদেশি যার সফরকালীন জাপান মিডিয়া ব্যস্ত থাকে এবং ড. ইউনূস মাইক্রো-ক্রেডিট, সামাজিক ব্যবসা জাপান মিডিয়ায় স্থান পায়। সেই সাথে বাংলাদেশের নামটাও। আর এখানেই জাপান প্রবাসীদের গর্ব।

ড. ইউনূসের জাপান সফরের খবর জাপান মিডিয়ার কল্যাণেই জাপান প্রবাসীরা পেয়ে থাকে। জাপান সরকারি সংবাদ সংস্থা এনএইচকে, ইলেকট্রনিক মিডিয়া, প্রিন্ট মিডিয়া ড. ইউনূসের সফরের একাধিক সংবাদ প্রচার করে থাকে।

rahmanmoni@gmail.com

সাপ্তাহিক

Comments are closed.