সফল জননী রেখা রানী পাল

ভব‌তোষ চৌধুরী নুপুর: মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার বেজগাঁও ইউনিয়নের মালিরঅংক গ্রামের রেখা রানী পাল। বয়স ৭০ এর কোঠায়। বাংলা মায়ের এ গর্বিত জননী ‘জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ’ এর কর্মসূচির আওতায় জেলার সফল জননী হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। মুন্সিগঞ্জ জেলার সংগ্রামী এ নারীর প্রতীকী নাম ‘জয়িতা’।

‘জয়িতা’ এ নারী মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার রামপাল ইউনিয়নের সুখবাসপুর গ্রামে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৪ বছর বয়সে লৌহজং উপজেলার দিঘলী গ্রামের বীরেন্দ্র চন্দ্র পালের সঙ্গে বিয়ে হয় তার। বিয়ের ৬ বছরের মাথায় প্রথম সন্তান ও ৯ বছরে মধ্যে আরও ৩ সন্তান জন্মগ্রহণ করে। লেখাপড়ার অদম্য ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অল্প বয়সে বিয়ে হওয়াতে তার ইচ্ছা পূরণ হয়নি। তাই তি‌নি স্বপ্ন বাঁধেন সন্তানদের লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করার। সন্তানদের সাফল্যতেই নিজের স্বপ্ন পূরণ করবেন।

৫০ বছর আগে সংসার জীবনটা প্রায় টানাপোড়নের মধ্যদিয়ে শুরু হয়। শ্বশুরের দেয়া মাটির কাজই ছিল স্বামীর উপার্জনের একমাত্র উৎস। তবে বিয়ের কিছুদিন পর স্বামী বীরেন্দ্র চন্দ্র পাল স্বর্ণের কারিগর হিসেবে ময়মনসিংহ জেলার এক দোকানে চাকরিতে চলে যান। ভালোভাবেই কাটছিল নতুন সংসার। শুরু হয়ে যায় স্বাধীনতার যুদ্ধ। স্বামী চলে আসেন ময়মনসিংহ থেকে গ্রামের বাড়িতে। যুদ্ধের পর আবার দিঘলী বাজারে মাটির হাড়ি-পাতিলের দোকান দিয়ে ব্যবসা শুরু ক‌রেন।

আস্তে আস্তে ছেলে-মেয়েরা বড় হতে থাকে, বড় হতে থাকে সংসার। শুরু হয় অভাব-অনটন। উপার্জনের আর কোনো উৎস না থাকায় ছোট ছেলের পড়ালেখা বন্ধ করে স্বর্ণের দোকানে কাজে দেয়া হয়। এরইমধ্যে বড় মেয়েকে বিয়ে দিতে হয়। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও যে মন মানছিল না ছেলের আগ্রহ আর নিজের বিবেকের তাড়নায় আবার ছেলেকে লৌহজং মডেল পাইলট স্কুলে (বর্তমান) ভর্তি করে দেন। বড় ছেলে তখন ঢাকার নটরডেম কলেজে পড়াশোনা করে মেঝো ভাইয়ের (নারায়ণ পাল) বাসায় থেকে।

স্বামীর স্বর্ণের কাজের প্রতি আগ্রহ থাকায় মাটির ব্যবসার পাশাপাশি স্বর্ণের কাজ করতে থাকেন তিনি। স্বচ্ছলতা মুখ দেখতে দেখতেই রাক্ষসী পদ্মার ভাঙনের ভিটেমাটি-ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ সর্বস্ব বিলীন হয়ে যায়। আবারও সর্বসান্ত্ব হয়ে সাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায়। এমনি করেই বারবার স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার পরও অদম্য রেখা রানী পাল ঘুরে দাঁড়াবার সংগ্রাম চালিয়ে যান। জীবনযুদ্ধকে জয় করে আজ হয়ে উঠেছেন জয়িতা।

‘জয়িতা’ রেখা রানী পাল জানান, নদী ভাঙনপরবর্তী সময় আর্থিক সমস্যা দেখা দিলে সার্বিকভাবে আমার মেঝো ভাইয়ের সহযোগিতা পেয়েছি। তখন সে আমাকে বলতো যত কষ্টই হোক সন্তানদের পড়াশুনা যেন বন্ধ না করি। তখন বড় ছেলে (বীরেন্দ্র পাল) ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে এবং ছোট ছেলে (রামপ্রসাদ পাল) ঢাকায় তিতুমীর কলেজে পড়াশুনা করে। ছোট মেয়ে (সুপ্রিতা পাল) এসএসসি পরিক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য লৌহজং উপজেলায় স্বর্ণপদক পায়। তবে আমার একটাই কষ্ট আর্থিক সংকটের কারণে আমার বড় মেয়েকে (কল্যাণী পাল) লেখাপড়া না শিখিয়ে বিয়ে দিতে হয়েছে।

তিনি জানান, বর্তমানে বড় ছেলে এমবিবিএস (বিসিএস) পাস করে মিটফোর্ড হাসপাতালে কনসালটেন্ট হিসেবে কর্মরত। বড় ছেলের স্ত্রীও ডাক্তার। ছোট ছেলে এমএসসি পাস করে পয়সা উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক হি‌সে‌বে কর্মরত। ছোট ছেলের বৌ শিক্ষকতা করে। ছোট মেয়ে এমএসএস পাস করে ঢাকা সাউথ পয়েন্ট অ্যান্ড স্কুল কলেজে শিক্ষকতায় নিয়োজিত। ওর স্বামী প্রাণ-আরএফএল কোম্পানির এমডি।

তিনি আরও জানান, দীর্ঘ সময় অভাব-অনটনের পর এখন সামাজিকভাবে সম্মান নিয়ে জীবনযাপন করছি। আমি এখন আনন্দিত ও গর্বিত যে, আজ আমার সন্তানরা স্ব-স্ব অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত।

জাগো নিউজ

Comments are closed.