পদ্মা সেতু প্রকল্পের জন্য লৌহজংয়ে জমি অধিগ্রহণ

রাতারাতি উঠছে ‘লোভের ঘর’
মো. মাসুদ খান: মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মাওয়া পুরনো ফেরিঘাটসংলগ্ন এলাকায় বিভিন্ন বাড়িতে রাত পোহালেই নতুন নতুন ঘর দেখা যাচ্ছে। তৈরি ঘর কিনে এনে এক রাতের মধ্যে সেসব বসানো হচ্ছে ভিটিতে। আবার টিন কিনে এনে অপ্রয়োজনে ঘর তৈরি বা পুরনো ঘরে টিন লাগিয়ে বারান্দা বানানো হচ্ছে। সূত্র মতে, পদ্মা সেতু কর্তৃপক্ষ ওই এলাকা অধিগ্রহণ করবে। তাই বেশি টাকা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশায় এলাকাবাসী তুলছে এই সব ঘর।

মাওয়া পুরনো ফেরিঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নতুন নতুন ঘর। অধিক টাকার আশায় অনেকে দূরদূরান্ত থেকে পুরনো ঘর এনেও বাড়িতে বসিয়েছে। লৌহজংয়ের কনকসারের কলাপাড়া থেকে তৈরি ঘর এনেও বসানো হয়েছে। নিজের নামের জায়গায় বোন, ভাই বা চাচার নাম বসিয়ে ঘরগুলো পদ্মা সেতুর সার্ভেয়ারের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণের তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট সার্ভেয়ারের সঙ্গে যোগসাজশে নতুন তোলা ঘরগুলোও তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, দেড়তলা ঘরকে দেখানো হচ্ছে দোতলা, যার ক্ষতিপূরণ ১২ লক্ষাধিক টাকা। অথচ একটি সাধারণ দেড়তলা ঘর উঠাতে এক-দেড় লাখ টাকা খরচ হয়। সাধারণ চৌচালা ঘরকেও দেড়-দুইতলা ঘরের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, মমিন আলী নামের পদ্মা সেতু প্রকল্পের একজন সার্ভেয়ার কয়েক দিন পর পর ওই এলাকায় গিয়ে ঘরের তালিকা তৈরি করছেন। নতুন ঘর দেখে তিনি প্রথমে তালিকাভুক্ত করতে চান না। পরে দেন-দরবারের মাধ্যমে নতুন ঘরকেও তালিকাভুক্ত করা হয়। এই সার্ভেয়ারকে অর্থের বিনিময়ে ম্যানেজ করে এলাকাবাসী এখন বাড়ির কোনো জায়গা খালি রাখছে না। কোনো কোনো বাড়িতে নতুন করে তিন-চারটি ঘরও উঠেছে। আবার অনেকে বারান্দা লাগিয়ে ঘরটিকে দৈর্ঘ্যে বড় দেখাচ্ছে বেশি ক্ষতিপূরণ পাওয়ার জন্য। কেউ কেউ আবার ছোট ছোট ছাপরা ঘর তুলছে। এসব ঘরকে নিজের ও আত্মীয়স্বজনের বলে অধিগ্রহণের তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। পদ্মা সেতুর ওই সার্ভেয়ার ছোট ছোট ঘরকে বড় দেখিয়ে বাড়ির মালিকদের সঙ্গে আঁতাত করে মোটা অঙ্কের টাকা কামাচ্ছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

অভিযোগের ব্যাপারে কথা বলতে সার্ভেয়ার মমিন আলীর সঙ্গে মোবাইল ফোনসেটে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সংযোগ পাওয়া সম্ভব হয়নি।

স্থানীয়দের অনেকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মাত্র কিছু দিনের মধ্যে মাওয়া পুরনো ফেরিঘাটসংলগ্ন এলাকার বাড়িগুলোতে ‘গায়েবি ঘর’ উঠে গেছে। তাঁরা দিনে যে বাড়ির ভিটি ফাঁকা দেখছেন পরদিন সকালে সেই বাড়িতে দেখছেন আস্ত ঘর। এক রাতে স্থানীয় মেদেনীমণ্ডল ইউনিয়ন পরিষদের একজন সদস্যের বাড়িসহ প্রায় ২০-২৫টি বাড়িতে ‘গায়েবি’ ঘর ওঠে। এভাবে এলাকার প্রায় সব বাড়িতে ঘর বসানো হয়েছে। এখনো অনেকে ঘর তুলছেন। সার্ভেয়ার মমিন আলীর সঙ্গে আঁতাত করে ছোট ঘরকে বড়, দেড়তলা ঘরকে দোতলা দেখিয়ে সর্বোচ্চ ক্ষতিপূরণ আদায়ের চেষ্টা চলছে। এভাবে সরকারের টাকা হাতিয়ে নিতে এখানে একটি সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। চক্রটি এর আগে লৌহজংয়ে পদ্মা সেতু প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা জমিতে এভাবে ঘরসহ গরুর খামার, বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দেখিয়ে সরকারের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।

লৌহজং উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস এম শাহীন বলেন, ‘আমার জানামতে মাওয়া পুরনো ফেরিঘাট এলাকায় কোনো জমি অধিগ্রহণ হচ্ছে না। তবে জেলা ভূমি অধিগ্রহণ শাখা (এলএ শাখা) সরাসরি জমি অধিগ্রহণ করলে করতেও পারে। ’

এলএ শাখার সার্ভেয়ার মো. ওবায়দুল বলেন, ‘পদ্মা সেতুর জন্য আমরা কোনো জমি অধিগ্রহণে কাজ করছি না। পদ্মা সেতুর জন্য আর কোনো জমি অধিগ্রহণ হবে না। ’ কিন্তু মমিন আলী নামের একজন সার্ভেয়ার এ ব্যাপারে কাজ করছেন—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা এ রকম কোনো দিকনির্দেশনা পাইনি। তবে মমিন নামের পদ্মা সেতু প্রকল্পে একজন সার্ভেয়ার আছেন। হয়তো তিনি জরিপ করছেন। পরে হয়তো তা আমাদের কাছে পাঠাবেন। ’

পদ্মা সেতু প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী (পুনর্বাসন) তোফাজ্জাল হোসেন পুরনো ফেরিঘাট এলাকায় নতুন করে ভূমি অধিগ্রহণের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘জরিপের কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। এখন কেউ ঘর উঠালেও লাভ হবে না। ’

সার্ভেয়ার মমিন আলীর যোগসাজশে তালিকায় ইতিমধ্যে অনেকের সাধারণ ঘরকে দোতলা দেখানো হয়েছে। এক রাতে তোলা ‘গায়েবি ঘর’কে ক্ষতিগ্রস্তের তালিকায় উঠানো হয়েছে—এমন প্রশ্নের উত্তরে নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট নাম দিয়ে বলুন, আমরা বাতিল করে দেব। ’

কালের কণ্ঠ

Comments are closed.