কাইল্যা পলাশের ‘গৃহভ্রমণে’ সহযোগী ২৯৪ পুলিশ

যাবজ্জীবন দ-প্রাপ্ত আসামি ও ১৪ বছর ধরে কারাবন্দি রাজধানীর শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান ওরফে কাইল্যা পলাশের ‘গৃহ ভ্রমণে’র জন্য দায়ী পুলিশ ও কারা বিভাগের ৩০৫ সদস্য। তাদের মধ্যে ১১ কারারক্ষীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করেছে কারা কর্তৃপক্ষ। তবে এখনো দায়ী ২৯৪ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি পুলিশ। তাদের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে। দায়ী পুলিশ ও কারা সদস্যরা খুনের দায়ে দ-প্রাপ্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী কাইল্যা পলাশকে আদালতে আনা-নেওয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

২০১৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর দৈনিক আমাদের সময়ে ‘কারাবন্দি শীর্ষ সন্ত্রাসী কাইল্যা পলাশের গৃহভ্রমণ’ শীর্ষক একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়Ñ ঢাকার রামপুরা এলাকার শীর্ষ কাইল্যা পলাশ কারাগার থেকে মাঝে মধ্যেই তার রামপুরার বাসায় চলে আসে। সেখানে কিছু সময় অবস্থানের পর ফের কারাগারে ফিরে যায়। গত কয়েক বছর ধরেই এ শীর্ষ সন্ত্রাসী এভাবে নিজ বাসা ভ্রমণ করছে। এখানেই শেষ নয়, গত ১৪ বছর ধরে কাইল্যা পলাশ কারাবন্দি। এ দীর্ঘ সময়ে সে একদিনও জামিন পাননি। অথচ ৩ বছর আগে এই শীর্ষ সন্ত্রাসী একটি সন্তানের জনক হন। কারাগার থেকে নিয়মিত মোবাইল ফোনে স্ত্রীসহ নিকট আত্মীয়দের সঙ্গেও কথাও বলেন। চাঁদাবাজিও করে দেদার। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ তার টেলিফোনে আড়িপেতে জানতে পারে কারাবন্দি থাকা অবস্থায় কাইল্যা পলাশ একটার পর একটা মোবাইল ফোনের সিম ব্যবহার করে গড়ে প্রতিদিন ৬০ মিনিট কথা বলত। এরপরই প্রকাশিত সংবাদ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ কারা প্রশাসনে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বিষয়টি জানার পর তদন্তের নির্দেশ দেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (পুলিশ) নুরুল ইসলামকে প্রধান করে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়। পরে তদন্ত কমিটি প্রায় এক বছর তদন্ত করে গত বছরের ৩১ আগস্ট প্রতিবেদন জমা দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। তদন্তকালে কমিটি শীর্ষ সন্ত্রাসী কাইল্যা পলাশের রামপুরার বাসায় আসা-যাওয়ার প্রমাণ পায়। এ জন্য তাকে প্রিজনভ্যানে আনা নেওয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পুলিশ ও কারারক্ষীরা দায়ী তারও প্রমাণ পায় তদন্ত কমিটি। কমিটি তাদের দীর্ঘ তদন্ত প্রতিবেদনে বিষয়টি উল্লেখও করে।

বিভিন্ন মামলায় হাজিরা দেওয়ার নামে শীর্ষ সন্ত্রাসী কাইল্যা পলাশ তার রামপুরার বাসায় অবস্থান করার সুযোগ করে সংশ্লিষ্ট পুলিশ ও কারারক্ষীরা ‘অবৈধ সুবিধা’ নিতেন। প্রতিবার তাকে বাসায় যাওয়ার সুযোগ করে দিতে পুলিশ সদস্যদের একেকজন ৫ হাজার টাকা করে নিতেন বলেও তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনার ব্যাপারে তদন্ত কমিটি শীর্ষ সন্ত্রাসী কাইল্যা পলাশের লিখিত জবানবন্দি নেন। লিখিত জবানবন্দিতে কাইল্যা পলাশ স্বীকার করেন ২০১২ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগার থেকে মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন। ওই হাসপাতালের কেবিনেই স্ত্রীর সঙ্গে রাতযাপন করতেন কাইল্যা পলাশ।

তদন্ত কমিটি তদন্তকালে জানতে পারে সে সময় মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারের জেলারের সরকারি গাড়িতে করেই জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন কাইল্যা পলাশ। এ জন্য আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। তবে কারা কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটিকে বলেছে, ওই অভিযোগের কোনো প্রমাণ তারা পায়নি।

তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনে ১৮ দফা সুপারিশ করেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে। যেখানে দায়ী ২৯৪ পুলিশ ও ১১ কারারক্ষীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা উল্লেখ করা হয়। দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে গত বছরের ৬ নভেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুলিশ সদর দপ্তর ও কারা অধিদপ্তরে চিঠি পাঠায়। ওই চিঠির সঙ্গে তদন্ত প্রতিবেদনও সংযুক্ত করা হয়।

জানতে চাইলে ঢাকা বিভাগের কারা মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী তারা ইতোমধ্যে ১১ কারারক্ষীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করেছেন।

অন্যদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা আমাদের সময়কে গতকাল বলেন, তদন্ত কমিটি যে ২৯৪ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর মধ্যে অভিযোগের বিষয়ে কার কতটুকু দায় রয়েছে তা নিরূপণ করা হচ্ছে।

২০০২ সালের ২৯ মে কাইল্যা পলাশ রামপুরায় যুবদলের নেতা মিজানুর রহমান মিজানকে গুলি করে হত্যা করে। বিচারিক আদালত এ হত্যাকা-ের বিচারে কাইল্যা পলাশকে মৃত্যুদ-ে দ-িত করেন। তবে উচ্চ আদালত তার সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন সাজা দেন। গত ১৪ বছরে ইয়াসিন খান বিভিন্ন কারাগারে ১৯ বার বদলি হয়েছেন। বাসায় ভ্রমণের জন্য কাইল্যা পলাশ প্রতিমাসেই টাকার বিনিময়ে হাজিরার তারিখ ফেলে কারাগার থেকে বের হতেন। এরপর কয়েক ঘণ্টা রামপুরায় নিজ বাসায় অবস্থান করতেন। এ সময় পুলিশ সদস্যরা পাহারায় থাকত।

তদন্ত কমিটির ১৮ দফা সুপারিশের মধ্যে রয়েছে, কারাগার থেকে আদালত কিংবা এক কারাগার থেকে আরেক কারাগারে আসামি পরিবহনে একটি কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম স্থাপন, স্পর্শকাতর ও দুর্ধর্ষ প্রকৃতির আসামিদের হাজিরার বিষয়টি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সম্পন্ন করা, আসামি পরিবহনের সময় একটি প্রিজনভ্যানের নিরাপত্তায় আরেকটি ব্যাকআপ পুলিশ টিম রাখা। যারা আসামি বহনকারী প্রিজনভ্যানকে অনুসরণ করবে। অন্যদিকে প্রিজনভ্যানের ওঠানামার দরজার চাবি ব্যাকআপ পুলিশ টিমের ইনচার্জের কাছে রাখা। প্রিজনভ্যান এবং ব্যাকআপ টিমের ইনচার্জ উভয়ে কারাগার ও আদালতে আসামি গ্রহণকারী কর্মকর্তাদের কাছে রিপোর্ট করবেন। ওই কর্মকর্তা রেজিস্ট্রারে লিপিবদ্ধ করে আসামি গ্রহণ করবেন। তিনি পুলিশ সদস্যদের নাম, বিপি নম্বরসহ আনুষঙ্গিক বিষয় লিখে রাখবেন রেজিস্টারে। চিরকুটের মাধ্যমে বন্দির সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধে কারা ফটক, আদালত এবং বিচারিক আদালতের কাঠগড়ায় উঠানো এবং ফেরত আনার সময় দুর্ধর্ষ বন্দির ধারেকাছে যেন কেউ ঘেঁষতে না পারে এ জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কারাগারে আসামির সংস্পর্শে থাকা কারা সদস্য এবং আসামি পরিবহনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কারা ও পুলিশ সদস্যদের প্রত্যেকের মোবাইল নম্বর লিখে রাখতে হবে। এ ছাড়া তাদের মোবাইল ফোনে আড়িপাততে হবে।

আমাদের সময়

Comments are closed.