শ্রীনগরে স্বামী হন্তারক মাজেদার মুখে রোমহর্ষক বর্ণনা

আরিফ হোসেন: শ্রীনগরে পুনরায় বিদেশ যাওয়ার আগের রাতে স্বামীকে হত্যা করে থানায় এসে স্ত্রীর আত্মসমর্পনের নেপথ্যে বেরিয়ে আসছে নানা রকম তথ্য। স্বামী অলিউল্লাহ (৩৮) বিদেশে দ্বিতীয় বিয়ে করেছে এমন আশংকা থেকে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে স্ত্রী মাজেদা বেগম (৩২) পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে। অপরদিকে অলিউল্লাহর পরিবারের দাবী দীর্ঘ ১৮ বছরের প্রবাস জীবনের অর্জিত অর্থে স্ত্রী মাজেদা বেগমের নামে অর্ধ কোটি টাকার জমি কেনা হয়েছিল। এসম্পত্তি আতœসাৎ করার জন্যই মাজেদার পরিবারের পরামর্শে তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।

মঙ্গলবার সকালে ঘাতক স্ত্রী মাজেদা বেগম (৩২) শ্রীনগর থানায় এসে দায়িত্বরত পুলিশ অফিসারকে জানায় সে তার স্বামী অলিউল্লাহ (৩৮) কে হত্যা করে ঘরে তালা দিয়ে রেখে এসেছে। মাজেদা বেগমের দেওয়া তথ্য অনুসারে শ্রীনগর থানার অফিসার ইনচার্জ সাহিদুর রহমান ওই দিন দুপুর বারটার দিকে উপজেলার পুটিমারা গ্রামের অলিউল্লাহর বসত ঘরের বারান্দা থেকে লাশটি উদ্ধার করে। পুত্রকে হত্যা করা হয়েছে এই খবর শুনে অলিউল্লাহর বৃদ্ধ পিতা ইদ্রিস মোল্লা (৯৫) একই দিন রাত ৯টার দিকে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করে। এঘটনায় উপজেলার পুটিমারা এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

স্ত্রী মাজেদা বেগম পুলিশের কাছে হত্যাকান্ডের বর্ণণা দিতে গিয়ে জানায়, স্বামী সৌদি আরব থাকা কালীন ফোন করলে এক মহিলা তা রিসিভ করত। ওই মহিলাকে তার স্বামী বিয়ে করেছে এমন ধারণা থেকে স্বামীর প্রতি ক্ষোভ জন্মে। তিন মাস পূর্বে স্বামী ছুটিতে দেশে আসে। এনিয়ে স্বামী-স্ত্রীর সাথে দাম্পত্য কলহ লেগেই থকতো। একমাস আগে ছুটি শেষ হয়ে গেলে অলিউল্লাহর সৌদি আরব যাওয়ার কথা ছিল। ওই সময় ফ্লাইটের ছয় ঘন্টা আগে ভিসা সহ পাসপোর্ট ছিড়ে ফেলে মাজেদা তার স্বামীর বিদেশ যাওয়া ঠেকিয়ে দেয়। পরে এক মাসের মধ্যে অলিউল্লাহ নতুন পাসপোর্ট করে কোম্পানীর কাছ থেকে ভিসা সংগ্রহ করে। এনিয়ে স্ত্রীর সাথে প্রায়ই ঝগড়া হতো। মঙ্গলবার রাতে সৌদি এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে অলিউল্লাহর সৌদি আরব যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা স্ত্রী মাজেদা বেগম কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেননা। রবিবার দিন মাজেদা বেগম তার স্বামী, দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে উপজেলার হাসাড়া গ্রামে বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসে। বাবার বাড়িতে এসে মাজেদা বেগম তার স্বামীকে হত্যা করার পরিকল্পনা করে । সোমবার বিকালে স্বামী-স্ত্রী ও দুই ছেলে ষোলঘর ইউনিয়নের পুটিমারা গ্রামের নিজেদের বাড়িতে চলে যায়। বাড়িতে গিয়ে সন্ধ্যার পর মাজেদা বেগম ভাত রান্না করতে যায়। এর ফাকে স্বামী-সন্তানের চোখ ফাঁকি দিয়ে দুটি ছুড়ি এনে তোষকের নিচে রেখে দেয়। ভাত রান্না হলে ছেলে ওমর (৭) ও মারুফ (৫) কে তা খাওয়ায়। পরে সাতটার দিকে স্বামী-স্ত্রী এক সঙ্গে ভাত খায়। সাড়ে সাতটার দিকে গরম দুধের সাথে ৭ টি ঘুমের ঔষধ মিশিয়ে ওলিউল্লাহকে খাওয়ানোর বিশ মিনিটের মধ্যে সে ঘুমিয়ে পরে। অন্য রুমে ছেলে ছেলেদেরকে ঘুম পাড়ায়। সাড়ে আটটার দিকে স্বামীকে জবাই করার পরিকল্পনা থেকে সরে আসে এবং সুতি ওড়না দিয়ে অলিউল্লাহর হাত- বেধেঁ ফেলে। পরে আরেকটি ওড়না গলায় পেচিয়ে শ্বাষরোধ করে হত্যা করে। ছেলেরা জেগে লাশ দেখে ফেলতে পারে এ আশংকায় তাদের রুমের লাইট নষ্ট করে দেয়। পরে রাত দশটার দিকে একাই লাশ খাট থেকে নামিয়ে তিন রুম পার করে পাকা বারান্দার একটি ষ্টোর রুমে হেলান দিয়ে বসিয়ে রাখে। সকালে উঠোন ঝাড় দিয়ে দুই ছেলেকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয় মাজেদা। অন্যরা জিজ্ঞেস করলে জানায় স্বামীর বিমান টিকেটের জন্য টাকা জোগাড় করতে যাচ্ছে। পরে সন্তানদেরকে বাবার বাড়ি রেখে থানায় এসে পুলিশের কাছে আতœসমর্পন করে।

পুলিশ অলিউল্লাহর বসতঘর ঘরের তোষকের নিচ থেকে দুটি ধারালো ছুড়ি ও যৌন উত্তেজক ভায়াগ্রা ট্যাবলেটের পাতা উদ্ধার করেছে। এঘটনায় উলিউল্লাহর বড় ভাই মো: আহসান উল্লাহ বাদী হয়ে মাজেদা বেগম, তার বাবা নুরু খলিফা ও দুই ভাই হাবিব এবং মাসুমকে আসামী করে হত্যা মামলা দায়ের করেছে।

অলিউল্লাহর বড় ভাই আহসান উল্লাহ জানান, পাসপোর্ট ছিড়ে ফেলার পর হাসাড়া ইউপি চেয়ারম্যান সোলায়মানের বাড়িতে সালিশ বসে। সেখানে অলিউল্লাহ জানায়, সৌদি আরবের কোম্পানীতে তার প্রায় চল্লিশ লক্ষ টাকা জমা রয়েছে। এটাকা তোলার জন্যই তার সৌদি আরব যাওয়ার প্রয়োজন। সবকিছু শুনে অলিউল্লাহকে তিন মাসের জন্য বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দেয় সালিশদাররা। অলিউল্লাহর বিদেশে বিয়ে করার প্রশ্নই আসেনা। যদি সে বিদেশে বিয়ে করত তাহলে মাজেদার নামে সম্পত্তি রাখত না। এবার দেশে আসার পর দেড় মাস আগেও অলিউল্লাহ তার স্ত্রী মাজেদার নামে নতুন করে জমি রেখেছে। ১৮ বছরের প্রবাস জীবনের কষ্টার্জিত সকল অর্থ ও সম্পত্তি আতœসাৎ করার জন্যই মাজেদা তার বাপ-ভাইয়ের সহায়তায় পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করেছে।

অনুসন্ধ্যানে জানা যায়, চৌদ্দ বছর আগে হাসাড়া গ্রামের নুরু খলিফার মেয়ে মাজেদা বেগমের সাথে অলিউল্লাহর বিয়ে হয়। দাম্পত্য জীবনে অসুখী মাজেদা বেগমের কাছে স্বামীর সঙ্গ পাওয়া ছিল অপরিহার্য। একারনে অলিউল্লাহর সাথে ফোনে ঝগড়া করত মাজেদা। অপরদিকে অলিউল্লাহর কাছে স্ত্রী-সন্তানের সুখের জন্য প্রবাসে পড়ে থাকাটা নেশায় পরিনত হয়েছিল। বাবাকে হত্যা করে মায়ের আতœসমর্পনে ছেলে-মেয়েগুলো অসহায় হয়ে পড়েছে। তারেকে মানুষ করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ বলে অলিউল্লাহর আতœীয়-স্বজনরা জানান।

শ্রীনগর থানার অফিসার ইনচার্জ সাহিদুর রহমান জানান, ময়নাতদন্তের পর অলিউল্লাহর লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।মাজেদা বেগমকে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে । এই হত্যাকান্ডের সাথে আরো কেউ জড়িত কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

Comments are closed.