একটি বিরল ভালোবাসা

রাহমান মনি: পোষা প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা, দায়বদ্ধতা সেই প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে আর পোষা প্রাণীদের মধ্যে মানুষের পছন্দের তালিকায় প্রথম স্থানটি দখল করে আছে কুকুর নামের নিরীহ, বিশ্বস্ত এবং প্রভুভক্ত শ্রেণির প্রাণীটি।

যুগে যুগে বিভিন্ন মনীষী তাদের জীবনীতে পোষা প্রাণীর প্রতি সখ্যতার কথা জানান দিয়েছেন। ইতিহাস থেকে আমরা তা জানতে পাই। পোষা প্রাণীদের কল্যাণে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন উদ্যোগের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরেছেন। রাজ্যময় তা প্রচার করা হয়েছে।

বর্তমান বিজ্ঞানের আধুনিক প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় পশু চিকিৎসারও উন্নতি চোখে পড়ার মতো। তাদের চালচলন, খাদ্যাভ্যাস নিয়ে রীতিমতো গবেষণা চলছে আজও। উন্নত দেশগুলোর বড় বড় শপিং সেন্টার, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর কিংবা বিনোদনমূলক স্থানগুলোতে পোষা প্রাণীদের জন্য রয়েছে আলাদা কর্নার, যেখানে পোষা প্রাণীদেরও বিনোদনের ব্যবস্থা রাখা হয়। মানিব্যাগের ওজন কমাতে চাইলে পোষা প্রাণীটিকে প্রশিক্ষণ প্রাপ্তদের হাতে তুলে দিয়ে নিজে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নেয়া যায়। নিজের মতো করে সময় কাটানো বা শপিং সারা যায়।

অবশ্য পোষা প্রাণীরাও তার মনিবের জন্য কম যায় না। প্রয়োজনে পৈতৃক জানটা উজাড় করে দিতেও কার্পণ্য করে না নিজ মনিবকে রক্ষা করার কাজে। কিংবা অন্য কথায় বলতে গেলে মনিবের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।

এই জাপানেও তার ভুরি ভুরি উদাহরণ রয়েছে। হাচিকো নামক এক পোষা কুকুর তার মনিবের জন্য আত্মত্যাগের কথা জাপানি মাত্রই জানেন। মনিবের শোকে নিজের প্রাণটি পর্যন্ত বিসর্জন (মতান্তরে) দিয়েছে অকাতরে। বেশ কিছুদিন নির্দিষ্ট স্থানে অভুক্ত অবস্থায় অবস্থান করার পর তার এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করে হাচিকো। আর এই জন্য জাপানের টোকিওতে যুবক-যুবতীর মিলনমেলা খ্যাত শিবুইয়া ওয়ার্ডের শিবুইয়া রেলস্টেশনের একটি এক্সিটের নাম হাচিকোর নামে রাখা হয় এবং এলাকাটিকে হাচিকো মিলন স্থান নামে অভিহিত করা হয়। যেখানে হাচিকো তার মনিব (প্রফেসর)-কে প্রতিদিন বিদায় জানানোর জন্য এবং রিসিভ করার জন্য আসত। প্রফেসরের আকস্মিক মৃত্যুর পরও বেশ কিছুদিন একই স্থানে অপেক্ষা করার পর শোকে মুহ্যমান প্রিয় হাচিকো তার মনিবের দেখা না পেয়ে অবশেষে আত্মহননের পথ বেছে নেয় চলন্ত গাড়ির নিচে ঝাঁপ দিয়ে।

আমেরিকার প্রেসিডেন্টদের কুকুর প্রীতির কথা সবাই জানেন। যদিও বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই দিক থেকে ভিন্ন। এই ব্যতিক্রমের জন্য তিনি ইতোমধ্যে ইতিহাসে পোষা কুকুরবিহীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্থান করে নিয়েছেন এবং কুকুর লালনে অভ্যস্ত হোয়াইট হাউসও বেশ কিছুদিন কুকুর বিরহে কাটাতে হতে পারে।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের কুকুর প্রীতির কথা কে না জানেন? কেজিবির প্রাক্তন কর্মকর্তা প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেয়ার পর জাপান সফর করলে সেই সময় জাপান থেকে উন্নত জাতের একটি কুকুর তাকে রাষ্ট্রীয় উপহার হিসেবে দেয়া হয়। ২০১৬ সালের নভেম্বরে আবার জাপান সফরকালে আরেকটি কুকুর উপহার দেয়ায় অভিপ্রায় ব্যক্ত করে টোকিও। মস্কো তাতে নিরুৎসাহ ব্যক্ত করে। বরং আগের দেয়া কুকুরটি পুতিনের সফরসঙ্গী হয়ে এসে জাপানি সাংবাদিকদের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করে। পুতিন অবশ্য এটিকে প্রেসিডেন্টের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে কথা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন। পুতিন বলেন, আমি যেখানেই যাই সাংবাদিক সবসময় আমাকে প্রশ্ন করলে বিরক্তি প্রকাশ করে সাংবাদিকদের উপর ‘ও’ সবসময় ক্ষেপে যায়।

জাপানে পোষা কুকুরের সংখ্যা স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের সংখ্যার চেয়েও বেশি। আর জাপানের আইচিপ্রিফেকচারে পোষা কুকুরের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
কিন্তু আজ আমি যে কুকুর প্রীতির কথা জানাবো তা খোদ রাজধানীর প্রসিদ্ধ এলাকার খুবই স্বাভাবিক একটি পরিবারের। মিনাতো ওয়ার্ডে পরিবারটির বসবাস। আর পোষ্য কুকুরটিও উন্নত জাতের কিংবা বুনিয়াদি পরিবারের উত্তরাধিকারী নয়।

নাম তার তাকাহিরো কাতো। বয়স ৩১। আমার একজন সহকর্মী। আমার সাথে কাজ করছেন গত ৫ বছর ধরে। এই পাঁচ বছর ধরে তার মুখে তার পোষা কুকুরের কথা শুনতে শুনতে কর্মস্থলের প্রতিটি সহকর্মীরই যেন পোষা প্রাণীতে রূপ নিয়েছে নিজের অজান্তেই। প্রতিটি সহকর্মীরই কাতো সানের (জাপানে জনাব শব্দটিকে জাপানি ভাষায় সান নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। পোষা প্রাণীর বেলায়ও একই শব্দ প্রযোজ্য) পোষা কুকুর সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল।

শিশুকাল থেকেই কুকুরটিকে পালন করে আসছেকাতো সান। নাম রেখেছে রিন সান। ঝড়, বৃষ্টি, তুষারপাত, টাইফুন উপেক্ষা করে প্রতিদিন সকাল ৫টায় রিনকে নিয়ে এক ঘণ্টা বাইরে যাওয়া, অসুখ হলে হাসপাতাল নেয়া, খাবার দেয়া কিংবা নিয়মিতভাবে পার্লারে নিয়ে যাওয়ার কাজগুলো কাতো নিজেই করে থাকেন।

বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান হলেও নিজেকে তা স্বীকার করতে নারাজ কাতো তাকাহিরো। পরিবারের সদস্য সংখ্যা জিজ্ঞেস করলেই কাতো বলে, আমরা চার সদস্যবিশিষ্ট পরিবার। রিন আমাদের পরিবারের অন্যতম সদস্য। ছোটবোন হলেও রিন আর আমার গার্লফ্রেন্ডও বলতে পারো। রিনকে নিয়েই আমার সারাবেলা কেটে যায়।

৩১ বছরের টগবগে সুদর্শন এই যুবকের কোনো গার্লফ্রেন্ড নেই। পাছে রিনের প্রতি কোনো অবহেলা হয়, এই জন্য সে গার্লফ্রেন্ড করেননি কাউকে। কোনো সম্পর্কে জড়াতে চান না। তাই কর্মস্থলের সবাই আমরা রিনকেই কাতোর মেয়েবন্ধু বা সঙ্গিনী হিসেবেই অভিহিত করে থাকি। আর তাতেই সে বেজায় খুশি। কথায় কথায় বলবে রিন আমার ছোটবোনের মতো, আমার মেয়েবন্ধুর মতো, আমার খেলার সাথী, আমার পৃথিবী। রিনকে নিয়েই আমার স্বপ্ন। রিন অবলা। তাই ওর প্রতি আমার দায়িত্বটাও বেশি। আমার উপর রিন নির্ভরশীল।

কর্মস্থলে কাতো আমাকে পাপা বা বাবা বলেই সংবোধন করে। আমি তাকে বলি, তোমার মতো তৈরি পোলার বাপ হতে আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু তোমার ওই গার্লফ্রেন্ড রিনকে পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নিতে আমার ঘোর আপত্তি। আর তাতেই সে কষ্ট পায়।

কাজের শুরুতেই ড্রেসিংরুমে পোশাক পাল্টাতে হয় রিন গত রাতে কি কি করেছে, আজ সকালে প্রাতঃভ্রমণে গিয়ে কতটুকু উৎফুল্ল ছিল তা শুনতে শুনতে। আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। কাজের ফাঁকে ফাঁকে একটু সময় পেলেই ফোন করে রিনের খোঁজ নেবে। আধুনিক প্রযুক্তির সুবাদে ফোন করলেই বাসায় সেট করা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রটি (ক্যামেরা)’র কার্যক্ষমতা শুরু হয়। রিন তার কাছে এসে ঘেউ ঘেউ (ওদের ভাষায় ‘ওয়ান ওয়ান’, জাপানি ভাষায় কুকুরের ডাককে ‘ওয়ান ওয়ান’ বলা হয়ে থাকে এবং শিশুদের ভাষায় কুকুরকে ‘ওয়ান চান’/সান বলা হয়ে থাকে।) শুরু করে তার মনিবকে জানান দেয় যে, সে ভালো আছে। অর্থাৎ নো চিন্তা, ডো ওয়ার্ক। সবশেষে পরিস্থিতি ওয়াকিবহাল হয়ে কাতো আবার সবাইকে তা ব্রিফিং করে।

এমন কি মনিটরে দেখে রিনের শরীর খারাপ মনে হলে সাথে সাথে ছুটি করে বাসায় চলে যাবে সে। কোনো মতেই যেন সে একাকীত্ব বোধ না করে তার অসুস্থতার সময়। প্রয়োজনে হাসপাতাল চিকিৎসা নেয়ানো এবং পরের দিন তা যথারীতি সবাইকে অবহিতকরণ।

রিনের স্বাস্থ্য বীমার জন্য প্রতিমাসে কাতোকে গুনতে হয় ২৩৭০ ইয়েন। যার বদৌলতে ৫০% হারে চিকিৎসা ফি দিতে হয়। মাসে একবার পার্লারে নিয়ে বিভিন্ন সেবাগ্রহণ এবং প্রতিদিন আহার খরচ সব মিলিয়ে প্রতিমাসে রিন বাবদ কাতোকে গুনতে হয় প্রায় ৬০ হাজার ইয়েন।

কাতোর জানামতে কুকুর নাকি ১৫ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে। রিনের বর্তমান বয়স ৬ বছর। ভরা যৌবন। ১০ বছর পর তার স্বাভাবিক মৃত্যু হবার সম্ভাবনা। কিন্তু রিনকে হারিয়ে বেঁচে থাকাটা তার জন্য কষ্টকর হবে ভেবে এবং শখ করে রিনকে মাতৃত্বের স্বাদ দেয়ার ইচ্ছা হলো তার। তার প্রিয় রিন মা ডাক শুনতে পাবে না তা কি করে হয়। যেই ভাবা সেই কাজ। তাদের গ্রুপের (কুকুর সার্কেল অর্থাৎ যাদের পোষা কুকুর আছে তাদের আবার অ্যাসিয়েশনে আছে) কোনো এক পুরুষ কুকুরের মাধ্যমে রিনকে গর্ভবতী করাতে হবে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের সহায়তায় (প্রফেশনালদের দিয়ে) রিনকে গর্ভবতী করাতে পেয়ে কাতোর সে যে কি আনন্দ তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আমাদের অর্থাৎ কলিগদের সবাইকে মিষ্টি মুখ করালেন। আল্টাসনোগ্রামের মাধ্যমে জানা গেল রিনের গর্ভে ৬টি ছানা বড় হতে লাগছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিধি মোতাবেক ২টি ছানার মালিক হবেন কাতো এবং বাকি ৪টি ছানা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করবে। সংখ্যা নিয়ে কাতোর কোনো মাথা ব্যথা নেই। তার প্রিয় রিন সান ছানা নিচ্ছে এতেই সে বেজায় খুশি। মনে মনে কত হিসেব নিকেশ, কত পরিকল্পনার ছক আঁকছে সে। ছানা দুটির একটি তার প্রিয় দাদিমাকে এবং একটি তার অতীব নিকটাত্মীয়কে দেয়ার প্রতিশ্রুতি সে দিয়ে রেখেছে। নির্দিষ্ট সময়ের পর অর্থাৎ ছানাগুলো একটু বড় হয়ে যখন মাকে ছাড়াই বাঁচতে শিখবে তখনই তা হস্তান্তর করা হবে। তার আগে নিজেই দেখভাল করবে।

এরই মধ্যে নতুন বছরের শুরুতে রিন নাবা-খাবা ছেড়ে দিয়ে মনমরা হয়ে কেবল শুয়ে থাকে আর ক্যু ক্যু করে চোখের পানি ফেলে। কাতো অনেকের সাথেই বিষয়টি শেয়ার করেছে। অনেকেই তাকে পরামর্শ দিয়েছে রিন যেহেতু প্রথমবারের মতো গর্ভধারণ করেছে, তাও আবার ৬টি ছানা পেটে তাই হয়তো ধকল যাচ্ছে এই সময় মানুষেরও বিভিন্ন সিনড্রোম দেখা দেয় ভয়ের কিছুই নেই।

এভাবে ২ দিন অতিবাহিত হবার পর আবার যথারীতি হাসপাতাল। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং আল্ট্রাসনোগ্রাম করার পর ডাক্তার নিশ্চিত হয়ে যে রিপোর্ট দিলেন, তা শোনার জন্য কাতো মোটেই প্রস্তুত ছিল না।

ডাক্তার স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন যে, রিনের পেটে যে ৬টি ছানা রয়েছে তার মধ্যে থেকে ইতোমধ্যেই ২টি ছানা মারা গেছে যার কারণে ব্যথায় রিন ছটফট করেছে এবং বাকিগুলোর আশাও ক্ষীণ। এমতাবস্থায় রিনও মৃত্যু ঝুঁকিতে। রিনকে বাঁচাতে হলে অতিসত্বর এবোরশান করাতে হবে এবং পারলে তা আজই।

মা ডাক শোনার জন্য রিন সানের জীবন বিপন্ন হবে এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না কাতো। এদিকে অদেখা অনাগত ৬টি বাচ্চার প্রতিও এক ধরনের ভালোবাসা জন্ম নিয়েছে তার মনের গহীনে। তাই উভয় সংকটে পড়ে কাতো নিজেই অনেকটা মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। অনেক ভেবেচিন্তে অবশেষে রিন সানকে বাঁচানোর জন্য ছানাগুলো এবোরশন করার কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হলো তাকে। সব মিলিয়ে প্রায় দুই সপ্তাহ রিনকে হাসপাতালে থাকতে হয়। আর এই জন্য কাতোকে গুনতে হয় ২ লাখ ৭০ হাজার ইয়েন। যা এখানেই শেষ নয়।

অর্থ খরচে কাতোর কোনো আফসোস নেই। তার প্রিয় রিনের সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এবোরশন করানো গেছে, রিন প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পাবে এতে সে খুশি। বাড়ি ফেরার পর পরবর্তী দেখভাল করার জন্য কাতো ১০ দিনের ছুটি নিয়েছে। পোষা প্রাণীর প্রতি এমন ভালোবাসা সত্যিই বিরল।

rahmanmoni@gmail.com

সাপ্তাহিক

Comments are closed.