বেদে সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রায় নানামুখী পরির্বতন

মোঃ রুবেল ইসলাম: মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের তিনটি ইউনিয়নে চার হাজার বেদে পরিবার বসবাস করছে। বেদে নামটির অবজ্ঞাসূচক ডাক বাইদ্যা (হাতুড়ে ডাক্তার) পরিমার্জিত বৈদ্য (চিকিৎসক) থেকে উৎপত্তি।

আরকান রাজ্যের মনতাং থেকে এসেছে বিধায় প্রথমদিকে এদেরকে মনতাং বলা হলেও কালের পরিবর্ত্বে এরা চিকিৎসক অর্থাৎ কবিরাজিতে সম্পৃক্ত হওয়ায় বৈদ্য বাইদ্যা থেকে তারা বেদে উপাধি পায়। এরা নৌকায় ঘুরে বেড়ায় গ্রাম থেকে গ্রাম, বন্দর থেকে বন্দরে। মাঝে মধ্যে স্থলে নোঙর ফেলে টোড়ী বা তাঁবুতেও বাস করে। বাংলাদেশে বেদে জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কত এর পরিসংখ্যান জানা নেই কারো।

লৌহজং ইউনিয়ন বেদে সম্প্রদায়ের সরদার মোঃ নজরুল ইসলাম, সাহেব আলী ও এবাদুল মেম্বার এর মতে, বেদে শব্দটি ‘বাদিয়া’ থেকে এসেছে। জেম্স ওয়াইজের মতে, সাংস্কৃত ‘ব্যাধ’ থেকে বেদে শব্দটি এসেছে। তবে কথিত আছে, ১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে শরণার্থী আরাকান রাজ বল্লাল রাজার সঙ্গে এরা ঢাকায় আসে বেদেরা। বাঙালির অতি পরিচিত নৃত-গোষ্ঠী। সাধারণত বাদিয়া বা বাইদ্যা নামে পরিচিত। এরা এক ধরনের পেশাজীবী গোষ্ঠী। পরে এরা ইসলাম ধর্ম দীক্ষা নেয়। সেই ততকালিন সময়ে ঢাকা থেকে প্রথমে বিক্রমপুর অঞ্চল পরে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে এরা ছড়িয়ে পড়ে। আবার ভিন্ন মতও আছে। বেদেদের জীবন বড়ই বিচিত্র। তাদের ধর্মমত, বিশ্বাস, আচার-অনুষ্ঠান, চলাফেরা, কথাবার্তা- সবকিছুতে এক ধরনের রহস্যময়তা দেখা যায়। যাচাই করে দেখা বেদেদের ভাষায় অন্য সাধারণরা কথা বলতে ওপারে না। কারণ তাদের ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষার মিল নেই অনেকটা।

কেউ সঠিক করে বলতে পারে না- এরা কারা! কোথায় তাদের আদি নিবাস। এটি একটি স্বতন্ত্র ভাষা যা জটিল ও দুর্বোধ্য। বেদেরা নিজেদের ‘মাঙতা’ বা ‘মানতা’ নামে ডাকে। মাঙতা অর্থ মেগে বা ভিক্ষা করে খাওয়া। তারা সাপ, বাঁদর, ভাল্লুক ইত্যাদি নাচিয়ে, শারীরিক কসরত জাদুর খেলা দেখিয়ে, পোক-জোঁক ফেলে, শিঙ্গা বসিয়ে, শেকড়-বাকড় ও তাবিজ-কবজ বিক্রি করে, তন্ত্র-মন্ত্র পড়ে- লোকজনদের থেকে যা পায় তাই দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে বলে তারা নিজেদের ‘মানতা’ নামে পরিচয় দিতে পছন্দ করে।

বাংলা মিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ১৭ শতকে মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদিখানে বেদেরা প্রথম বসতি গড়ে তুলেন। পাষেই শ্রীনগর ও লৌহজংয়ের খড়িয়া, গোয়ালীমান্দ্রা তেও এদের বসবাস চোখে পড়ে। জমির মলিকানা, স্থায়ী নাগরিকত্ব ও ভোটার হওয়ার জন্য এদের আন্দোলনও করতে হয়েছিল দুই যোগ আগে। বর্তমানে গোয়ালীমান্দ্রা এলাকায় এদের সাবেক পেশা যেমন ঝাড়ফুক, সাপের খেলা, যাদু, কবিরাজী, তাবিজ বিক্রি, চুড়ির ব্যবসা ইত্যাদি। এ এলাকায় তাদের সরকারী নিতিমালায় নির্বাচিত মেম্বার ও আছে। সাথে পাচ বছরের মত বর্তমান রাজনৈতিক দলের কমিটিও রয়েছে। আওঃ যুবলীগ সভাপতি মান্নান, সেক্রেটরী আঃ রউফ। আয় রোজগার কমে গেলে তাদের জীবনযাত্রায় নানামুখী পরির্বতন ঘটতে থাকলে কৃষি আবাদ, দিন মজুরির কাজ করে এদেরকে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়।

তাদের কেউ কেউ মাদক ব্যবসায় জড়িত কথাটাও শোনা গেছে। লৌহজংয়ের খরিয়াগ্রামে বেদে সম্প্রদায়ের মহল যোগ্য এনামুল, মাসুম মাদবর, সৈয়দ মাদবর, সম্বু মাতুব্বর, পান্না মাতুব্বর, নুরুল হক মাতুব্বর ও মজনু মাতুব্বরসহ সংশ্লিষ্ট আনেকের সংগে আলাপ কালে বেরিয়ে আসে তাদের দুঃখ কষ্ট দুর্দশার দিন। তারা বলেন, আমার এলাকায় ৪৫ বছরের বসবাস। নেই কোন সরকারী উন্নয়ের লক্ষ্যে পরিবারের জীবনমান, উন্নয়ের লক্ষ্যে, নেই বাচ্চাদের শিক্ষা প্রতিস্থান ও ৬০ ভাগ লোকের মাথা ঠোকার বাসস্থান নেই একটি করব স্থান নেই ঈদের নামাজের জন্য। মুশুল্লিদের ঈদগাহ মাঠ, কোন রকম এক বেলা খেতে পাইলে অন্য বেলায় নাখাওয়ার মতোই চিন্তা রেখে দিনযাপন করতে হয়। আমাদের এ করুন ইতিহাস খোঁজ নেয়ার এ ৪৫ বছরেও নেয়নি কেউ।

শুনেছি বেদে পরিবারের জীবনমান উন্নয়ের লক্ষ্যে পাইলট প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার। এরই ধারাবাহিকতায়, গত শুক্রবার বিকেলে এ উপজেলায় গোয়ালী মান্দ্রা বেদে সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে আয়োজিত এক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী ”আ হ ম মোস্তফা কামাল বলেন, ‘লৌহজংয়ের তিনটি ইউনিয়নের চার হাজার বেদে পরিবারের জীবনমান উন্নয়ের লক্ষ্যে এখানে নেয়া হবে পাইলট প্রকল্প। এখান থেকে শুরু করে সারাদেশে এ ধরনের প্রকল্প নেয়া হবে।’ বেদে সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়নের কাজ করছে সরকার।

তিনি আরো বলেছেন, বঙ্গবন্ধু এই দেশেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন আর সেই স্বপ্ন এক বাস্তবে রুপ দিচ্ছেন তারই কন্যা দেশের সফল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ থেকে আগামী ১৫ বছরের মধ্যে আমরা একটি সফল উন্নত জাতীতে পরিনিত হবো। আমি এখনো মন্ত্রী হতে পারিনি যেদিন এই বেদে সম্প্রদায়ের লোকদের উন্নত জাতীতে পরিনিত করতে পারবো সে দিনই আমি মন্ত্রী হবো। আমার প্রথম কাজ হবে লৌহজংয়ের বেদে সম্প্রদায়ের উন্নত জাতি হিসাবে তৈরি করা। ওই দিন উপজেলার কয়েকটি গ্রামের প্রায় ২০ হাজার বেদে সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে হলোদিয়া ইউনিয়নের গোয়ালীমান্দ্রা মাঠে আয়োযিত সভায় এসব কথা বলেন। সেই সাথে উপজেলার ৩ টি ইউনিয়নের চার হাজার বেদে সম্প্রদায়ের ছেলে-মেয়েদের চাকুরীতে প্রথম সুযোগ সুবিধা দেয়া হবে ও স্থায়ী ভাবে তাদের বসবাসের ব্যবস্থা করে দেয়ার আশ্বাসদেন তিনি।

সময়ের কন্ঠস্বর

Comments are closed.