আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে জাপান প্রবাসীদের অনুষ্ঠান

প্রবাসী জীবনের সাতকাহন (প্রথম পর্ব)
রাহমান মনি: হঠাৎ করেই সংগঠন প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন জাপান প্রবাসীরা। এর পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকলেও সবচেয়ে বড় কারণ হলো বিশ্বে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অনেক দেশের প্রবাসীদের থেকে জাপান প্রবাসী জীবনের ধরনটা একটু আলাদা বা স্বতন্ত্র। এর কারণ হচ্ছে, বিশ্বের অনেক দেশেই বাংলাদেশিরা হয় সরকারি উদ্যোগে, কিংবা কোম্পানি ভিসা বা ডিভি লটারি কিংবা ওপি ওয়ান-এর সুযোগ নিয়ে দেশান্তরী হয়েছেন। আবার কোনো কোনো দেশে সিটিজেন হওয়ার সুযোগ কিংবা সিটিজেনপ্রাপ্তদের রক্তের সম্পর্কের সুবাদে নিজেও সেই দেশের সিটিজেন বেছে নেয়ার সুযোগ নিয়েছেন। কিন্তু জাপান প্রবাসীদের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে সে ধরনের কোনো সুযোগ নেই।

জাপানে সরকারি উদ্যোগে কিংবা আত্মীয়ের মাধ্যমে ভ্রমণের সুযোগ থাকলেও স্থায়ী হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তারপরও যারা জাপান প্রবাসী হয়েছেন তারা সম্পূর্ণ ব্যক্তি উদ্যোগ, মনবুশো কিংবা পরিচিতদের মাধ্যমে সুযোগ করে নিয়েছেন।

এশিয়ার একটি দেশ হলেও জাপান ইউরোপ কিংবা আমেরিকার চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়। বরং, সভ্যতা, ভব্যতা কিংবা সততার দিক থেকে অনেক দেশের জন্যই ঈর্ষণীয়। জাপানিজ ম্যানার সর্বজনবিদিত। মেড ইন জাপান এবং জাপানের প্রযুক্তির কথা না হয় বাদই দিলাম।

জাপানে গা-গতর খাটাতে পারলে প্রতিটি প্রবাসীই সচ্ছল জীবনযাপন করতে পারে। করেনও তাই। এখানে পরিশ্রমের মূল্যায়ন হয়। আয়ের বিভিন্ন পথ খোলা রয়েছে।
আর যেহেতু প্রতিটি জাপান প্রবাসী সচ্ছল জীবনযাপন করেন এবং স্বাবলম্বী তাই বাঙালি রীতিতে মানবজীবনের ষোলকলা পূর্ণ করতে বাকি থাকে একটু স্ট্যাটাস। সমাজে একটু পরিচিতি। আর পরিচিতি পাবার বা আনার পূর্বশর্ত হচ্ছে কোনো সংগঠনের শীর্ষ পদ। আর এই পদ যোগ্যতায় সভাপতিই হোক কিংবা অযোগ্যতায় সভার গতি (হাসির পাত্র)-ই হোক, পদাধিকার বলেই হোক কিংবা দখল করেই হোক বা পদ সৃষ্টি করে অর্থাৎ নতুন সংগঠন করেই হোক, সংগঠনের অস্তিত্ব থাকুক কিংবা না-ই থাকুক, ঘোষণা দিলেই হলো। আর এখন তো প্রচারের জন্য কোনো বিজ্ঞাপন সংস্থার দ্বারস্থ হতে হয় না। প্রয়োজন হয় না লোক ভাড়া করে মিছিল মিটিংয়ের। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, টুইটার কিংবা ভাইভার তো আছেই, সেখানে একটা স্ট্যাটাস দিলেই হলো। বুঝেই হোক কিংবা না বুঝেই হোক লাইক দেয়ার লোকেরও অভাব হয় না। তারা লাইক দিয়ে এসব কর্মের প্রতি সমর্থন জানান। অভিনন্দন জানান।

জাপান প্রবাসীদের সংখ্যা খুব একটা নয়। সব মিলিয়ে প্রায় ১২ হাজার ছুঁই ছুঁই করছে। সঠিক পরিসংখ্যান কোথাও নেই। না জাপানি অভিবাসন ডাটাবেজে, না বাংলাদেশ দূতাবাসের হিসাবমতে। সাম্প্রতিককালে আবার কিছু রোহিঙ্গাও নাকি বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করছে। আবার কোনো কোনো বাংলাদেশি ভারতীয় পাসপোর্ট কিংবা ভারতীয় নাগরিক হয়ে বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহারকারীদের সংখ্যা খুব একটা বেশি না হলেও অস্তিত্ব রয়েছে। তাই সঠিক পরিসংখ্যান কোনোমতেই সম্ভব নয়।

তার মধ্যে প্রায় সাড়ে ৩ হাজারের মতো টোকিওসহ আশপাশের জেলাগুলো মিলিয়ে প্রায় ৭ হাজারের মতো। আর সব মিলিয়ে কানতো অঞ্চল। আমার আলোচনা কেবল কানতো এলাকার প্রবাসীদের দ্বারা পরিচালিত সংগঠন নিয়ে।

প্রকৃতিগতভাবে রাজনৈতিক সচেতন বাংলাদেশিরা প্রবাসেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থকের অভাব নেই। তাই, বড় বড় দলগুলোর শাখা, প্রশাখা, শিরা, উপশিরা সবগুলোর অবস্থান রয়েছে। তার উপর রয়েছে প্রথমে দল, তারপর কোন্দল এবং কোন্দল থেকে উপদল। অর্থাৎ গ্রুপিং। প্রবাসে মূল দলগুলোর একাধিক গ্রুপের অস্তিত্ব বিদ্যমান। কেন্দ্র থেকে আবার গ্রুপিং জিইয়ে রাখা হয়। আর জিইয়ে রাখবেই না বা কেন! প্রবাসে দলগুলোর যত গ্রুপিং থাকবে, কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের ততই কদর বাড়বে। বিদেশ সফর করার সুযোগ আনুপাতিক হারে ততই বাড়বে। সেই সঙ্গে উপঢৌকন। তাই তারা প্রবাসে গ্রুপিং ইচ্ছে করেই জিইয়ে রাখেন। অথচ কেন্দ্র থেকে সামান্য একটু উদ্যোগ প্রবাসে গ্রুপিং সমূলে উৎপাটন করা সম্ভব।

সংগঠন প্রিয় বাঙালি জাতি রাজনৈতিক সংগঠনের বাইরেও বিভিন্ন সংগঠনের সাথে জড়িত থাকতে পছন্দ করেন। অনেকেই আবার একাধিক সংগঠনের সাথেও জড়িত হয়ে পড়েন। এমনকি একাধিক সংগঠনের প্রধান পদও। আর তা না হতে পারলে নিদেনপক্ষে উপদেষ্টার পদ। অনেকটা বাংলাদেশে সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পদ নেয়ার মতো।

তাই প্রবাসে রাজনৈতিক সংগঠন ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক, ব্যবসায়িক, ধর্মীয়, সাহিত্যিক, শিশু সংগঠন, বিভিন্ন পেশাজীবী এবং আঞ্চলিক সংগঠনের পাশাপাশি পারিবারিক এমনকি নিজ নামের আদ্যক্ষর মিলিয়ে সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। পারিবারিক সংগঠন বলতে নিজ পরিবারের সদস্য বা একান্ত অনুগত ছাড়া আর কোনো সদস্যের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। আর নামের আদ্যক্ষর দিয়ে বলতে নামের তিনটি (ফ্যামিলি, মিডল এবং নিজ) অংশের আদ্যক্ষর মিলিয়ে একটি নাম নিয়ে সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটানো। আর এসব সংগঠনের আগে বা পিছনে যদি বাংলাদেশ নামটা যুক্ত করে দেয়া যায় তাহলে তো আর কথা-ই নেই। একটা ভারিক্কি ভাব চলে আসে। সংগঠনের ওজনও বাড়ে। আর বাংলাদেশ ব্যবহার করলে তো কারোর আপত্তি ধোপে টিকবে না। কারণ বাংলাদেশটা তো আর কারোর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। যদিও আজকাল তা দাবি করা হচ্ছে। তবে আরও বেশি পোক্ত যদি বাংলাদেশ এবং জাপান উভয় দেশের নামটা জুড়ে দেয়া যায়। তাহলে আন্তর্জাতিক একটা ভাব অনুভূত করে পুলকিত হওয়া যায়।

কানতো অঞ্চলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের যে সমস্ত সংগঠনের অস্তিত্ব রয়েছে তার সংখ্যা অর্ধশত ছাড়িয়ে গেছে গত শতাব্দী শেষ ভাগে। বিংশ শতাব্দীর অসম্ভবের সম্ভাবনার কথা জানিয়ে গেছেন কবি নিজেই। একবিংশ শতাব্দীতে বিরামহীনভাবে জাপানের কানতো অঞ্চলে প্রবাসীদের সংগঠন বেড়ে চলেছে। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে বিভিন্ন আয়োজনও। অনেকটা আশঙ্কাজনকভাবে। এর শেষ কোথায় কেউ জানে না।

এসব আয়োজনে লোক সমাগম করতে বিভিন্ন অফার দেয়া হচ্ছে। অনেকটা বড় বড় কোম্পানির বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার মতো। আর এসব ঘোষণায় থাকছে ভোজনরসিক বাঙালি জাতিকে বিভিন্ন খাবারের প্রলোভন দেখিয়ে আকৃষ্ট করার চেষ্টা থাকছে। কোনো রকমের রাখঢাক ছাড়াই কত রকমের ভর্তা ছাড়াও খাবারের মেন্যুতে কী কী থাকছে তার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে সচিত্রসহ। আর এসব অফারের কথা শুনে অনেকেই ছুটে যান পরিবার পরিজন নিয়ে। সুস্বাদু খাবার কিংবা হরেক রকমের ভর্তা দিয়ে হয়তো দীর্ঘদিন খাওয়া হয়ে ওঠে না। তাই রথ দেখার নামে কলাটাও বিক্রি করে আসার মতো অনুষ্ঠান দেখার ছলে ডিনারটাও সেরে আসা যায়।

জাপান প্রবাসীদের দ্বারা পরিচালিত সংগঠনের সংখ্যা এই মুহূর্তে দেয়া সম্ভব নয়। কারণ, যেভাবে সংগঠন প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করেছে তাতে এই লিখা প্রেস হয়ে পাঠকদের হাতে পৌঁছানোর সময়ের মধ্যে হয়তো আরও সংগঠনের আবির্ভাব ঘটে যাবে। কারণ, ব্যাঙের ছাতার মতো গজানো সংগঠনের শুরুটা করতে কোনো প্রকার বিধিনিষেধ নেই।

প্রথম প্রথম এসব সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা পুরুষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন আর তা নেই। গৃহিণী, সংস্কৃতিকর্মী, সমাজকর্মী এমনকি পেশাজীবী মহিলাদের মধ্যেও অতিসম্প্রতি ভাইরাস আকারে তা ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকটা অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে তাদের মধ্যে। কেউ বসন্ত উৎসব শুরু করে তো কেউ পৌষ মেলা, কেউবা শারদীয়। কেউ পিঠা উৎসব শুরু করে তো কেউ ভর্তা, ভাজি উৎসব। আবার কেউবা হরেক রকম মিষ্টান্ন উৎসব। আর এভাবেই বেড়ে চলেছে এসব আয়োজন এবং আয়োজক সংগঠন।

প্রবাস জীবনে সাধারণত বন্ধের দিন অর্থাৎ রোববার ছাড়া লোক সমাগম সম্ভব হয়ে ওঠে না। আর এই কারণে এমন কোনো রোববার নেই যেখানে কোনো অনুষ্ঠান নেই। দেখা যাচ্ছে একই রোববার একাধিক অনুষ্ঠান থাকছে রীতিমতো ঘোষণা দিয়ে। এমনকি একই এলাকাতেও। এছাড়া ঘরোয়া কিংবা পারিবারিক (জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী, সংবর্ধনা) আয়োজন তো থাকছেই। তাই প্রবাসীরা ইচ্ছা থাকলেও অনেক আয়োজনেই যেতে পারছেন না। তাতে করে সৃষ্টি হচ্ছে ভুল বোঝাবুঝির। দৃশ্যমান ভাগ হয়ে যাচ্ছে প্রবাসী সমাজ।

আর পবিত্র রমজান মাস হলে তো কথাই নেই। এই মাসে চারটি রোববারই ইফতার মাহফিল আয়োজনের ভারে ভারাক্রান্ত। ইফতারের সময়টা তো একই। তাই একজন লোকের পক্ষে একটির বেশি আয়োজনে কোনো মতেই সম্ভব নয়। তারপরও এমন কিছু ব্যক্তি আছেন যাদের না গেলেই নয়। তাই তারা বেছে নেন কোম্পানিতে কেবলি মুখ দেখানো উপস্থিতি, কোনোটিতে ইফতার আবার কোনোটিতে বা ইফতার উত্তর নৈশভোজ। তাদের উপর চাপও কম থাকে না। কারণ প্রবাসে আয়োজনগুলোর দূরত্ব কম নয়। হয় গাড়ি ব্যবহার নয় তো পাবলিক যানবাহন।

বর্তমানে জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত একজন মহিলা। স্বাভাবিকভাবেই তার সান্নিধ্য পেতে হলে চাই নেক নজর। আর এই নেক নজর পেতে হলে কোনো সংগঠনের ছায়াতলে থাকার বিকল্প নেই। নারীবাদী সংগঠনের প্রধান হওয়া গেলে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করাও সহজ। তাই লেডিস ক্লাব কিংবা লেডিস অ্যাসোসিয়েশন গড়ার হিড়িক পড়ে গেছে। নামকাওয়াস্তে কোনো অনুষ্ঠান আয়োজন করে রাষ্ট্রদূতকে আমন্ত্রণের মাধ্যমে দূতাবাসের নেক নজরে থাকার চেষ্টাও কিন্তু কম নয়।

আর এসব কারণে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ছে ডোনারদের উপর। ডোনারদের সংখ্যা সীমিত কিন্তু আয়োজনের সীমাবদ্ধতা নেই। কয় জায়গায় একজন ডোনার অনুদান দিতে পারেন? তারপরও তারা দিয়ে যাচ্ছেন। এই জন্য তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। এইভাবে চলতে থাকলে ডোনাররা হয়তো একদিন মুখ ফিরিয়ে নিবেন।

প্রবাসে বাংলাদেশিদের আয়োজন যত বেশি হবে, বাংলাদেশকে ততই তুলে ধরা হবে। তবে তা যেন মানসম্পন্নতা বজায় থাকে। কোন দল করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যই নয়। আর দেশকে তুলে ধরতে খুব বেশি বেশি আয়োজনের দরকার হয় না, মানসম্মত কিছুসংখ্যক হলেই যথেষ্ট। প্রবাসীরা যত তাড়াতাড়ি তা উপলব্ধি করতে পারবেন ততই মঙ্গল। দেশের জন্য তো বটেই প্রবাসী সমাজের জন্যও।
rahmanmoni@gmail.com

সাপ্তাহিক

Comments are closed.