পদ্মাপাড়ে ভোরের আলোয় দেশি মাছের বাজার

সূর্যের আলো তখনো ফোটেনি। চারদিকে কুয়াশার আবরণ ঘিরে আছে। এরই মধ্যে সেখানে জড়ো হয়েছেন শ খানেক জেলে। এঁরা রাত জেগে পদ্মা নদী থেকে মাছ ধরেছেন। সবার হাতে আছে মাছের ঝুড়ি। ঝুড়িভর্তি কই, শিং, বোয়াল, শোল, বাইনসহ হরেক প্রজাতির দেশি মাছ।

যেখানে এসব জেলে জড়ো হয়েছেন, সেই জায়গাটির নাম হাসাইল বাজার। একেবারই পদ্মার তীরঘেঁষা বাজার। মুন্সিগঞ্জ জেলার টঙ্গিবাড়ীতে এর অবস্থান। শুধু দেশি প্রজাতির মাছ কেনাবেচা হয় এই বাজারে। এ মাছগুলো পদ্মার মূল স্রোতের বাইরে বয়ে যাওয়া খাল থেকে ধরা হয়।

বাজারে মাছ বিক্রি করতে আসা প্রবীণ জেলে আবদুর রহিম প্রথম আলোকে বললেন, ৪০ বছর ধরে তিনি পদ্মায় মাছ ধরছেন। সেই মাছ বিক্রি করেন হাসাইল বাজারে। দেশি মাছ পাওয়া যায় বলে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ বহু দূরের লোকজন এই বাজারে আসেন মাছ কিনতে। দেশি মাছের জন্য বেশ নাম আছে হাসাইল বাজারের।

পদ্মার কই।

সকাল প্রায় ছয়টায় বাজার বসে। শেষ হয় সকাল আটটায়। প্রতিদিনই বাজার বসে। ঢাকা থেকে মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার দূরত্ব ৪০ থেকে ৪৫ কিলোমিটার। উপজেলা থেকে সাত কিলোমিটার দূরে হাসাইল বাজার।

আলো ফুটতে ফুটতেই হাসাইল বাজারে সরগরম হয়ে উঠল। মাছ তোলার পর ডাক শুরু হলো বাজারে। যিনি বেশি দাম হাঁকছেন, তিনিই পাচ্ছেন মাছ। বাজারের মাছ ক্রেতাদের অধিকাংশ মাছ ব্যবসায়ী। সাধারণ ক্রেতা কম।

পদ্মাপাড়ের হাসাইল বাজার। শুধু দেশি মাছ পাওয়া যায় এই বাজারে।

বাজার থেকে মাছ কেনা ব্যবসায়ী ইসমাইল বললেন, এই বাজারে একদম টাটকা দেশি মাছ পাওয়া যায়। জেলেরা মাছ ধরে এখানে বিক্রি করেন। এখান থেকে মাছ কিনে নিয়ে বিক্রি করেন মুন্সিগঞ্জের বাজারে। ক্রেতা যখন জানতে পারেন, এই মাছ হাসাইলের, তখন দামও ভালো পাওয়া যায়।

মিজান নামের এক লোক হাসাইল বাজার থেকে দেশি কই ও বোয়াল কিনেছেন। তিনি বললেন, ‘আমার বাড়ি মানরাও। প্রায় সময় এই বাজারে আসি। পদ্মার মাছ পাওয়া যায়। বাজারে সব ধরনের মাছই পাওয়া যায়।

পদ্মার বাইন মাছ বাজারে তুলেছেন জেলেরা।

নদীপাড়েই সার ধরে বাঁধা জেলেদের নৌকা। সেখানেই তাঁদের বসবাস-রান্না-খাওয়াদাওয়া। নৌকায় দেখা মিলল জেলে নূর মোহাম্মদের সঙ্গে। তাঁর নৌকায় আছে মাছ ধরার জাল। আছে রান্না করার চুলা। নূর মোহাম্মদ বললেন, তাঁর মতো অন্তত ৫০ জন জেলে নৌকায় বসবাস করেন। সারা রাত মাছ ধরে হাসাইল বাজারে মাছ উঠান। মাছ বিক্রি করে বাজার-সদাই করে আবার নৌকায় ওঠেন।

হাসাইল বাজারে ওঠা বোয়াল ও বাইন মাছ।

বাজার চলছে, চলছে নিলামে মাছের কেনাবেচা। নদীপাড়ে দাঁড়িয়ে দেখা গেল, মাছ ধরা তখনো চলছে। পদ্মাপাড়ের এসব জেলে জীবনের তাগিদেই মাছ ধরেন, কেনাবেচা করেন। তবে নেহাত জীবন বাঁচানোর তাগিদে এখানে মুখ্য না। দিনমান মাছ ধরার এ কর্ম, তাঁদের আনন্দের উৎসও বটে। বাজারে আকবর নামের এক জেলে সে কথাই বললেন। তাঁর কথা, ‘জালে যখন মাছ ধরা পড়ে, তখন খুব ভালো লাগে। অপেক্ষায় থাকি, কখন বাজারে মাছ উঠাব।’

হাসাইলের ভোরের বাজারে একসময় কমে আসে হাঁকডাক। কমতে থাকে লোক সমাগম। সকাল আটটা বাজতে বাজতেই বাজার হয়ে পড়ল জনশূন্য। স্থানীয় গ্রামের এক জেলে চিৎকার দিয়ে নৌকায় থাকা আরেক জেলেকে বলছিলেন, ‘কাল আবার দেখা হবে এই বাজারে।’

আসাদুজ্জামান
প্রথম আলো

Comments are closed.