৭ খুন মামলায় কামব্যাক সাখাওয়াতের

নাসিক নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন খান
অনেক নাটকীয়তার পর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক পেয়েছেন আইনজীবী নেতা সাখাওয়াত হোসেন খান। ২০১৪ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জে বিদ্রোহী গ্রুপের নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। জেলা বিএনপির সম্মেলন বানচালসহ নানা কারণে বিতর্কিতও ছিলেন। তবে সাত খুনের ঘটনার পর বিচার দাবিতে আন্দোলন করে এবং ক্ষমতাসীনদের হুমকির শিকার হয়ে নিজ দলে অবস্থান শক্ত করে নেন তিনি।

মঙ্গলবার (২২ নভেম্বর) সকালে দলের যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ সংবাদ সম্মেলনে সাখাওয়াতের নাম ঘোষণা করেন। তবে গত দুদিন ধরেই তার নাম সম্ভাবনায় ছিল। কারণ, মেয়র পদের জন্য খোদ চেয়ারপারসন থেকে শুরু করে দলের হাই কমান্ড জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকারকেই প্রথম পছন্দ হিসেবে রাখলেও তিনি অনীহা প্রকাশ করেন।

সাখাওয়াতের বাড়ি মুন্সীগঞ্জ জেলায়। ১৯৮৪ সালে তিনি মুন্সীগঞ্জ জেলা যুবদলের সহসভাপতি ছিলেন। ‘৯০ এর দশকে নারায়ণগঞ্জ আসার পর আইন কলেজে ভর্তি হন এবং আইন পেশায় জড়ান। তখন থেকেই বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত তিনি।

সাখাওয়াত হোসেন খান বর্তমানে বিএনপির কোনও পদে নেই। তবে তিনি ২০০৯ সালের অক্টোবরে নারায়ণগঞ্জ শহর বিএনপির বিদ্রোহী কমিটির সেক্রেটারি ছিলেন। ওই বছরের ২৫ নভেম্বর জেলা বিএনপির সম্মেলন স্থগিত করতে, আদালতে রিট থেকে শুরু করে পাল্টা প্রতিরোধ ঘোষণার নেতৃত্বেও ছিলেন সাখাওয়াত।

বিএনপিতে এক সময় বিতর্কে ঘুরপাক খেলেও সাত খুনের ঘটনার পর তার ভাবমূর্তি অনেকটাই পাল্টে যায়। এ সময় নিজের কৌশলও পরিবর্তন করেন তিনি। বিএনপির অনেক নেতাকর্মী যারা বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার হয়েছিলেন, তাদের বিনা পয়সায় আইনি সহায়তা দিয়েও আলোচনায় আসেন। এর মধ্যে ২০১৩-২০১৪ ও ২০১৪-২০১৫ বছরে নারায়ণগঞ্জ আইনজীবী সমিতিতে সভাপতি নির্বাচিত হন সাখাওয়াত হোসেন।

জেলা বিএনপির সভাপতি তৈমূর আলম খন্দকারের ‘জুনিয়র’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন সাখাওয়াত। তবে ২০১৩ সালের পর থেকে তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।

স্থানীয় বিএনপির রাজনীতিতে এখন দুটি মেরুকরণ রয়েছে। একটি গ্রুপের নেতৃত্বে তৈমূর আলম খন্দকার ও অপর গ্রুপের নেতাদের একজন সাখাওয়াত হোসেন।

জনপ্রতিনিধি হওয়ার বাসনাও তার মধ্যে ছিল আগে থেকেই। ২০০৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে তিনি নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের জন্য মনোনয়ন চেয়ে ব্যর্থ হন।

পুরনো সেই বিদ্রোহ
২০০৯ সালের ২৮ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ শহর বিএনপির সম্মেলন হয়। সেদিন শহরের ৯টি ওয়ার্ডের প্রতি ওয়ার্ড থেকে ৫১ জন করে ৪৫৯ জন কাউন্সিলরের ভোটে জাহাঙ্গীর আলম সভাপতি, এটিএম কামাল সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। তবে ওই কমিটি গঠনের আগেই নারায়ণগঞ্জে বিএনপির একটি গ্রুপ বিদ্রোহ করে পাল্টা কমিটি গঠন করে। ওই কমিটিতে সভাপতি করা হয় নুরুল ইসলাম সরদারকে, যিনি ২০০৩ সালে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে সেলিনা হায়াৎ আইভীর সঙ্গে নির্বাচন করে পরাজিত হন। আর সেক্রেটারি হন সাখাওয়াত হোসেন খান।

২০০৯ সালের ২৫ নভেম্বর শহরের আলী আহাম্মদ চুনকা পাঠাগার মিলনায়তনে জেলা বিএনপির দ্বিবার্ষিক সম্মেলন হয়। তবে ওই সম্মেলনের আগের দিন নারায়ণগঞ্জ পৌর বিএনপির প্যাডে বিদ্রোহী গ্রুপের সভাপতি দাবিদার নুরুল ইসলাম সরদার এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জেলা বিএনপির সম্মেলন প্রতিহত ও প্রতিবাদ সভার ডাক দেন।

জেলা বিএনপির সম্মেলনের আগে এর স্থগিতাদেশ চেয়ে আদালতে একটি রিট করা হয়। বিএনপি নেতা আবু আল ইউসুফ খান টিপুর স্থগিতাদেশ চেয়ে নারায়ণগঞ্জ চতুর্থ সিনিয়র সহকারী জজ বেগম মেহেরুন্নেছার’র আদালতে ২৪ নভেম্বর একটি দেওয়ানী মামলার আবেদন করেন। একই আবেদনে মামলাটি নিস্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সম্মেলনের ওপর স্থগিতাদেশ তথা নিষেধাজ্ঞা প্রদানের আর্জি করা হয়। তবে আদালত সেটা আমলে নেয়নি। ওই আবেদনের আইনজীবী ছিলেন সাখাওয়াত হোসেন খান। শুনানি চলাকালে উভয় পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে ব্যাপক বাদানুবাদ হয়।

২৫ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জের সম্মেলনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। তবে ওই সভা বন্ধের সব চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে বিএনপির বিদ্রোহী গ্রুপের নেতারা হামলা চালান এবং ব্যাপক সংঘর্ষ হয়।

ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা
সাখাওয়াত হোসেন খানের বিরুদ্ধে যখন বিদ্রোহের তকমা তখন, ২০১৩-২০১৪ বছরে নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতি নির্বাচনে তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন। চলে আসেন আলোচনায়। পরে ২০১৪-২০১৫ বছরেও তিনি সভাপতি হন।

সাত খুনে কামব্যাক
২০১৪ সালের ৩০ এপ্রিল আরও ছয় জনের সঙ্গে খুন হন নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য সিনিয়র আইনজীবী চন্দন সরকার। ৭ জনের খুনের বিচার দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন সাখাওয়াত হোসেন খান। বাদী দুইজনের পক্ষে দাঁড়ান তিনি। প্রায় এক মাস প্রতিদিন নারায়ণগঞ্জ আদালতপাড়ায় আন্দোলন করেন বিচারের দাবিতে। আসামিদের গ্রেফতার দাবি, নূর হোসেনকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনার দাবিতে নিয়মিত আন্দোলন করতে গিয়ে অনেক হুমকির শিকার হতে হয় তাকে। ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের চক্ষুশূল ছিলেন তিনি। তারপরও পিছপা হননি। আর এভাবেই তিনি ফের আলোচনায় চলে আসেন।

এ বিষয়ে সাখাওয়াত হোসেন খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সাত খুনের আন্দোলন থেকে সরে যেতে আমাকে অনেক চাপ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমি আদর্শ ও নীতি ত্যাগ করি নাই। নীতি ধরে রাখতে গিয়ে অনেক জুলুমের শিকার হয়েছি। একজন আইনজীবী হিসেবে আমি আরেকজন আইনজীবীর হত্যার বিচার চাওয়া থেকে পিছপা হতে পারি নাই। আমি মনে করি, এখনও পর্যন্ত আমি সবাইকে সঙ্গে নিয়েই সফল। কারণ, সবার ঐকান্তিক আন্দোলনের কারণেই সাত খুনের আসামিদের গ্রেফতার ও বিচার শুরু হয়েছে। অথচ নারায়ণগঞ্জের অনেক আইনজীবী শুরু থেকে আমাদের সঙ্গে আন্দোলন করলেও পরে চুপ হয়ে গেছেন, যা রহস্যাবৃত।’

সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, ‘আমি কখনও বিএনপি ছাড়ি নাই। যাই করি বিএনপির ভেতরেই ছিলাম। আমি দলের একজন ত্যাগী নেতা। দল আমাকে মূল্যায়িত করেছে, এটা আমার জন্য বড় পাওনা। আমি সব সময়ে বিএনপির রাজনীতিতে একত্রিকরণ ও সবাইকে এক করার চেষ্টা করেছি। আশা করি, এবার নির্বাচনেও সবাই এক থাকবে।’

বাংলা ট্রিবিউন

Comments are closed.