অনিশ্চিত গার্মেন্টস পল্লী

দেশের প্রধান রফতানি খাত পোশাক শিল্প। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ক্রমবর্ধমান চাহিদা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে এর সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল ও ব্যাপক হয়ে উঠেছে। দেশে বর্তমানে কয়েক হাজার পোশাক শিল্প-কারখানা রয়েছে। তবে এগুলোর অধিকাংশ রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক ঘনীভূত। ফলে একদিকে যেমন শহর-নগর-বন্দরের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান শ্রমিক শ্রেণী তথা জনসংখ্যার চাপে সৃষ্টি হচ্ছে নানাবিধ টানাপোড়েন।

রাজধানী ও সংলগ্ন এলাকায় বাড়ি ভাড়াসহ জিনিসপত্রের দাম অনেক বেশি। আবার পোশাক খাতের শ্রমিকদের বেতন-ভাতাও কম। এই সীমিত আয়ে জীবন নির্বাহ করা দুরূহ। রাজধানী ও আশপাশে চাপ কমাতে এবং নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০০৬ সালে গার্মেন্টস শিল্পপল্লী স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয় মুন্সীগঞ্জের বাউশিয়ায়। এর জন্য ৭৭৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪৯২ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয় চীনের ওরিয়েন্ট ইন্টারন্যাশনাল হোল্ডিংসকে। এ নিয়ে দফায় দফায় মিটিংও হয়েছে বিজিএমইএ, বিকেএমইএসহ সংশ্লিষ্টদের। ৩ নবেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ সভায় এ প্রকল্পের মূল স্টেক হোল্ডার বিজিএমইএ’র পক্ষ থেকে জানিয়ে দেয়া হয় যে, গার্মেন্টস পল্লীর ব্যাপারে তাদের আর আগ্রহ নেই। ইতোমধ্যে জমি ক্রয় ও বিনিয়োগের নিমিত্ত সদস্যদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থও ফেরত দেয়া হয়েছে। লাভজনক নয় বিধায় চীনা কোম্পানিও পাততাড়ি গুটিয়ে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। সব মিলিয়ে বাউশিয়ায় গার্মেন্টস পল্লী স্থানান্তরের বিষয়টি হয়ে পড়েছে অনিশ্চিত। মোটকথা, পোশাক খাতের উদ্যোক্তারাই যেতে চাচ্ছেন না সেখানে। যেমন হয়েছে হাজারীবাগ চামড়া শিল্প সাভারে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পোশাক শিল্প মালিকরা পর্যায়ক্রমে হলেও রাজধানীর বাইরে মুন্সীগঞ্জ অথবা দেশের অন্যত্র স্থানান্তরিত হলে ভাল করতেন। সত্য বটে, রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর দেশের পোশাক কারখানাগুলোকে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত করে গড়ে তোলার জন্য প্রবল আন্তর্জাতিক চাপ রয়েছে। ইউরোপ-আমেরিকার ক্রেতাগোষ্ঠী এ্যাকর্ড-এ্যালায়েন্স এই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। দেশকে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত করতে হলে বর্তমানের চেয়ে পোশাক শিল্পে আরও জোর দিতে হবে। চীন ও ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে শ্রমমজুরি বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের জন্য এই খাতে অমিত সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে। চীনের উৎপাদকরা ক্রমশ ঝুঁকে পড়ছেন বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও অন্যত্র। প্রধানমন্ত্রীও দেশের বিভিন্ন স্থানে কম-বেশি ২০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছেন। এসব স্থানে ন্যায্য দামে জমি, বিদ্যুত, গ্যাস, পরিবহন সুবিধাসহ অবকাঠামো নির্মাণে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাওয়া যাবে। চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে মংলা বন্দরের সমূহ সংস্কারসহ পায়রা বন্দর নির্মাণে সবিশেষ গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে কোন একটি দেশকে বেছে নেয়ার সুযোগ নেই। বন্ধুপ্রতিম দেশ হিসেবে ভারত অথবা চীনÑ দক্ষতার ভিত্তিতে যে আগে তৈরি করে দিতে পারবে, তাকেই অগ্রাধিকার দেয়া বাঞ্ছনীয়। ইতোমধ্যে পদ্মা সেতু নির্মিত হলে যোগাযোগ ব্যবস্থায় সৃষ্টি হবে নতুন দিগন্ত। সে অবস্থায় গার্মেন্টস শিল্প মালিকদের উচিত হবে নতুন নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চলে ঝুঁকিমুক্ত ও পরিবেশবান্ধব শিল্প-কারখানা গড়ে তোলা। এতে রাজধানী ও আশপাশের দুর্ভোগ এবং যানজট কমবে। শিল্পোৎপাদন বৃদ্ধিসহ রফতানি আয়ও বাড়বে নিঃসন্দেহে।

জনকন্ঠ

Comments are closed.