বাউশিয়ায় গার্মেন্টস শিল্পপল্লী প্রতিষ্ঠার ভবিষ্যত অনিশ্চিত!

প্রকল্প বাস্তবায়নকারী চীনা সংস্থাও নিজেদের গুটিয়ে নেয়ার কথা জানিয়ে দিয়েছে
এম শাহজাহান: ঢাকার বাইরে কারখানা সরাতে ইচ্ছুক নন রফতানিমুখী তৈরি পোশাক খাতের শিল্পোদ্যোক্তারা। এ কারণে বহুল আলোচিত গার্মেন্টস শিল্প পল্লী প্রতিষ্ঠার ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ঢাকার পার্শ্ববর্তী মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার বাউশিয়ায় এ পল্লী হওয়ার কথা ছিল। বাস্তবায়নকারী সংস্থা চীনের ওরিয়েন্ট ইন্টারন্যাশনাল হোল্ডিংস (ওআইএইচ) ইতোমধ্যে প্রকল্প থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়ার কথা জানিয়ে দিয়েছে। মূল্য ও ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রায় ৭৭৮ কোটি টাকা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধ না হওয়ায় জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়েছে। সদস্যদের কাছ থেকে জমি অধিগ্রহণ বাবদ যে অর্থ সংগ্রহ করেছিল তা আবার ফেরত প্রদান করেছে গার্মেন্টস মালিকদের বড় সংগঠন বিজিএমইএ। আর এসব কারণে পুরো প্রকল্পের ভবিষ্যত যে অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে এসব বিষয় জানিয়ে শীঘ্রই এ সংক্রান্ত একটি সারসংক্ষেপ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রেরণ করবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে এ তথ্য।

সূত্রমতে, ঢাকা ও ঢাকার আশপাশ বিশেষ করে গাজীপুর এবং নারায়ণগঞ্জ অঞ্চল থেকে গার্মেন্টস কারখানা সরাতে রাজি নন এ শিল্পের উদ্যোক্তারা। এ কারণে জমির দাম বৃদ্ধি, প্রকল্প লাভজনক নয় এবং ক্ষতিপূরণ বাবদ অর্থ দাবিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে গার্মেন্টস পল্লী থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন এ শিল্পের মালিকরা। পোশাক পল্লী প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের ওরিয়েন্ট ইন্টারন্যাশনাল হোল্ডিংসের (ওআইএইচ) শর্তও মানা হয়নি। ফলে বাস্তবায়নকারী এই সংস্থাও এ প্রকল্পের ব্যাপারে এখন আর আগ্রহী নয়। উচ্চপর্যায়ের কয়েকটি বৈঠকে ইতোমধ্যে তারা এ প্রকল্পে আর না থাকার কথা জানিয়ে দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে বলেন, গার্মেন্টস পল্লী স্থাপনের স্বপ্নটি এখন অনিশ্চিত। কারণ বিজিএমইএ এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থা চায়না প্রতিষ্ঠান এ প্রকল্পের ব্যাপারে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। চায়না প্রতিষ্ঠান বলছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে যে অর্থ ব্যয় হবে তা এখান থেকে উঠানো সম্ভব নয়।

সংস্থাটি ‘ফিজিবিলিটি’ স্টাডি করে দেখেছে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে তারা বড় অঙ্কের লোকসান করবে। গার্মেন্টস মালিকরা সঠিক দাম দিয়ে কেউ এখানে আসবে না। তিনি বলেন, শুধু চায়না প্রতিষ্ঠান কেন পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের চরম অনীহার কারণে প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখছে না। তাই ঘনঘন মিটিং না করে চলতি মাসেই এ সংক্রান্ত একটি সারসংক্ষেপ আমরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ওখানেই এ বিষয়ে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।

গার্মেন্টস শিল্পপার্ক স্থাপনের বিষয়ে বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনাপূর্বক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য গত ৩ নবেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বস্ত্র সেল একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার আয়োজন করে। ওই সভায় বেজা, বিনিয়োগ বোর্ড, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়, এফবিসিসিআই এবং বিজিএমইএ’র প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। প্রকল্প থেকে চায়না প্রতিষ্ঠানের চলে যাওয়ার বিষয়টি আলোচনায় তোলা হয়। একই সঙ্গে এ প্রকল্পের মূল স্টেকহোল্ডার বিজিএমইএ থেকেও জানিয়ে দেয়া হয়Ñ গার্মেন্টস পল্লীর ব্যাপারে তাদের আর কোন আগ্রহ নেই। ইতোমধ্যে এ প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য সদস্যদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ তাদের ফেরত প্রদান করা হয়েছে।

জানা গেছে, ঢাকার ওপর চাপ কমানো এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি এবং পরিবেশবান্ধব গ্রীন গার্মেন্টস করার লক্ষ্যে গত ২০০৬ সালে গার্মেন্টস পল্লী প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয় সরকার। কিন্তু এক দশক আগে এ প্রকল্পটি নেয়া হলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইচ্ছায় ২০১৩ সালে এসে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে ৫৩০ দশমিক ৭৮ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য প্রশাসনিক অনুমোদন দেয় সরকার। এর মধ্যে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় বাউশিয়া, মধ্যম বাউশিয়া, পোড়ারচক, কাইচখালী ও চৌদ্দকাহনিয়া মৌজায় ৪৯২ একর জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করে। ২০১৩ সালের ১৩ নবেম্বর প্রথমবার, ২৫ নবেম্বর দ্বিতীয়বার, ১৯ ডিসেম্বর তৃতীয়বার এবং সর্বশেষ ২০১৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি চতুর্থবার জমির দাম ও ক্ষতিপূরণ বাবদ ৭৭৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকা নির্ধারণ করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জমা দিতে বিজিএমইএকে নোটিস দেয়া হয়। কিন্তু বিজিএমইএ টাকা না দেয়ায় অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া বাতিল করে দেয় মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিজিএমইএ’র সহসভাপতি (অর্থ) মোহাম্মদ নাসির জনকণ্ঠকে বলেন, বাস্তবায়নকারী সংস্থা চায়নার ওআইএইচ এ প্রকল্পটি নিয়ে গভীর স্টাডি করেছে। তারা হিসাব করে দেখেছে প্রকল্প বাস্তবায়নে যে পরিমাণ অর্থ খরচ হবে তা গার্মেন্টস মালিকদের জন্য লাভজনক হবে না। এ কারণে তারা এখন ওই প্রকল্পের ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। তিনি বলেন, যেসব উদ্যোক্তারা এখানে কারখানা সরাতে টাকা জমা দিয়েছিলেন তারাও অর্থ ফেরত নিয়ে গেছেন। তাই গার্মেন্টস পল্লীর ব্যাপারে এখন আর কেউ উৎসাহ দেখাচ্ছে না। চীনা কোম্পানির দাম ও শর্ত অনুযায়ী উদ্যোক্তাদের জন্য এটি সুবিধাজনক হবে না। অন্যদিকে বিদ্যুত উৎপাদন ও তা জাতীয় গ্রিডে দেয়া সংক্রান্ত তাদের এক শর্তেও সরকারের আপত্তি রয়েছে। এ কারণে তারাও পিছিয়ে গেছে। বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরতের গ্যারান্টিও চায় তারা।

জানা গেছে, জমির বর্তমান দামে বাউশিয়ায় গার্মেন্টস পল্লী না হওয়ার বিষয়ে বিজিএমইএ ও সরকার অনেকটাই নিশ্চিত। কিন্তু কোনপক্ষই এ নিয়ে সরাসরি মুখ খুলতে চাইছে না। কয়েকটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্তের কথা জানাবে সরকার। অথচ রাজধানীর ভাড়া ভবনের ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা নিরাপদ পরিবেশে নেয়ার জন্য বাংলাদেশের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ রয়েছে। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর এ চাপ আরও জোরালো হয়। ইউরোপ-আমেরিকার ক্রেতাগোষ্ঠীর সংগঠন এ্যাকোর্ড এবং এ্যালায়েন্স নিরাপদ কর্মপরিবেশ ইস্যুতে তাদের চাপ অব্যাহত রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহার করেছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, নিরাপদ পরিবেশে গার্মেন্টস কারখানা যত দ্রুত সরানো যায় ততই ভাল। তবে বাউশিয়ার এ প্রকল্পটি নানান কারণে উদ্যোক্তাদের কাছে বিনিয়োগযোগ্য কিংবা আকর্ষণীয় মনে হয়নি।

জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরের সময় তার উপস্থিতিতে বিজিএমইএ এবং চীনের ওরিয়েন্ট ইন্টারন্যাশনাল হোল্ডিং কোম্পানির মধ্যে বাংলাদেশে আরএমজি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক নির্মাণের বিষয়ে স্বাক্ষরিত হয় একটি এমওইউ। এরই ধারাবাহিকতায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনক্রমে বিজিএমইএ এবং চীনা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরিত হয়। এরপরই এ প্রকল্প নিয়ে কথাবার্তা চলতে থাকে।

জানা গেছে, চামড়া খাতের উদ্যোক্তাদের মতো পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারাও ঢাকা থেকে কারখানা সরাতে রাজি নন। তারা বিভিন্ন অজুহাতে ঢাকায় থাকার পরিকল্পনা করছেন। আর বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় সরকারকেও সতর্কতার সঙ্গে চলতে হচ্ছে বলে জানান বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক উর্ধতন কর্মকর্তা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই কর্মকর্তা বলেন, আমরা জোরেশোরে চাপও দিতে পারছি না। দেশের প্রধান রফতানি খাত এটি। তাই এ শিল্প নিয়ে নেতিবাচক কিছু তৈরি হোক তা আমরা চাই না। তবে উদ্যোক্তারা গেলে ভাল করতেন। কারণ এ ব্যবসায় টিকে থাকতে হলে ধীরে ধীরে ঢাকার বাইরে কারখানা সরাতেই হবে। এদিকে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে নিবন্ধন হওয়া চালু গার্মেন্টস কারখানার সংখ্যা ৫ হাজার ১৯০টি। এর মধ্যে ঢাকায় ২ হাজার ৫০০টি, গাজীপুরে ৮৭২টি, চট্টগ্রামে ৫২৮টি, নারায়ণগঞ্জে ১ হাজার ২১৮টি কারখানা রয়েছে। অন্য জেলাগুলোর মধ্যে ময়মনসিংহে ২৭টি, যশোরে চারটি, মৌলভীবাজারে তিনটি, টাঙ্গাইলে ১১টি, মুন্সীগঞ্জে তিনটি, সিরাজগঞ্জ ও রংপুরে একটি করে, কুমিল্লায় ছয়টি, বগুড়ায় ১২টি ও খুলনায় তিনটি তৈরি পোশাক শিল্প-কারখানা রয়েছে। আর এ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শিল্পপার্কে আড়াই শ’ থেকে তিন শ’ পোশাক কারখানা নির্মাণ করা হবে। কাজ করার সুযোগ পাবেন আড়াই লাখ শ্রমিক। আর বর্তমানের চেয়ে কয়েকগুণ রফতানি বাড়ার সুযোগ তৈরি হতো বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

জনকন্ঠ