সম্ভাবনার আরেক নাম ‘ট্যাপিস্ট্রি’ শিল্প

ট্যাপিস্ট্রি বা তাপিশ্রী হলো নানান রঙের উল এবং টিসি সুতা দিয়ে তৈরি কারুকার্যময় এক প্রকার বস্ত্র যা কিনা ফ্লোর ম্যাট, ওয়াল ম্যাট, কলেজ ব্যাগ, মোবাইল ব্যাগ, কুশণ কভার, ডাইনিং নেট এবং পাপোশ হিসেবে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের বাড়িতে শোভা পায়। এছাড়াও উল ব্যবহার করে বিখ্যাত গুণীজনদের তৈরি করা চিত্রকর্মগুলোও ওয়াল ম্যাট হিসেবে শোভা বর্ধন করে থাকে দেশে-বিদেশে। চাহিদার কথা চিন্তা করে সঠিক সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই শিল্পের কর্মীরা অর্থনৈতিক অবদান রাখতে পারবে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।

বাহারি রঙের সুতা আর নিখুঁত কারুশিল্পের মাধ্যমে অনেকটা লোকচক্ষুর অন্তরালেই এই তাপিশ্রী বা বুনন শিল্পকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন সাভারের আবু মোহাম্মদ মূসা করিম। ১৯৯০ সালে মুন্সিগঞ্জ সদরের বেহারকান্দি গ্রামের রিয়াজ উদ্দিন খানের ছেলে মূসা জীবিকা নির্বাহের তাগিদে পাড়ি জমান রাজধানীর মিরপুর। সেখানে একটি তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন তিনি। পরে চলে আসেন সাভারের গেন্ডা এলাকায়। চাকরি নেন একটি প্রিন্টিং কারখানায়।

ঐ সময় আলি আকবর নামে এক ব্যক্তি সাভারের গেন্ডা এলাকায় সতরঞ্জির কাজ করতেন। এলাকাবাসী এটি তাঁত নামে চিনত। কারখানা থেকে ফিরে মূসা করিম দাঁড়িয়ে ওই সতরঞ্জি বুননের কাজ দেখতেন। দেখতে দেখতে কাজটি তার এক সময় ভালো লেগে যায়। পরে বিনা পারিশ্রমিকে সেখানে বুননের কাজ শিখতে থাকেন তিনি। ছয় মাস কাজ করার পর শতরঞ্জি কাজে ভালো দক্ষতা এলো তার। খুশি হয়ে মালিক তাকে ২ হাজার টাকা বেতন ধার্য করে দিলেন। এরপর প্রায় ১২ বছর একই বেতনে কাজ করতে থাকলেন মূসা। এক পর্যায়ে আলি আকবর তার কারখানাটি রাজধানীর মীরপুরে স্থানান্তর করলে তিনি বেকার হয়ে পড়েন। অন্য কোনো কাজ ভালো না লাগায় নিজেই কারখানা খোলার সিদ্ধান্ত নিলেন।

ওই সময় অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও অন্যতম দিশারী শিল্পী রশিদ চৌধুরীর ট্যাপিস্ট্রি শিল্পের কাজের কিছু ক্যাটালগ আকস্মিকতায় পান তিনি। মূসা তখনই সিদ্ধান্ত নেন ট্যাপিস্ট্রি শিল্পের কাজ করবেন।

সে জন্য স্ত্রী রেখা আক্তারের সঞ্চিত ২ হাজার ৮০০ টাকা এবং অন্যদের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ২০০৩ সালে সাভার পৌরসভার গেন্ডা এলাকায় নিজ ভাইয়ের দুই শতাংশ জমি ভাড়া নিয়ে টিন শেডের কারখানা গড়ে তোলেন। কারখানায় প্রথম একটি তাঁত মেশিন ও একজন কারিগরের সমন্বয়ে ‘অপরূপা’ নামে ট্যাপিস্ট্রি তৈরির কাজ শুরু করেন। এরপর তার কাজের চাহিদা ধীরে ধীরে রাজধানীর অঞ্জনস, বাংলার মেলা, যাত্রা, নগর দোলা, ঈ, ইনফিনিটি, এবি ফ্যাশন, সনি র‌্যাংকস, ত্রয়ী, দুর্লভসহ নামিদামী শো-রুমগুলোতেও সমাদৃত হতে থাকে।

বর্তমানে ১৬টি তাঁত মেশিন ও বিশ জন কর্মীকে নিয়ে মূসা করিমের ট্যাপিস্ট্রি পণ্য তৈরির প্রতষ্ঠান ‘তের রঙ’ বেশ পরিচিত।

মূসা করিম ঢাকাটাইমসকে বলেন, দেশে এ শিল্পের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতা পেলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব। তিনি নিজেই পণ্যসামগ্রীর ডিজাইন করে থাকেন। কারিগরদের বেতন দেন উৎপাদনেরভিত্তিতে। উৎপাদন বেশি দিতে পারলে কারিগররা বেতনও বেশি পায়।

সাদ্দাম হোসেন, রুবেল, রাশেদ ও শাহিন নামে ট্যাপিস্ট্রি কারখানার কারিগররা জানান, কিশোর বয়স থেকে তারা এ প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। মূসা করিমের সঙ্গে কাজ করতে পেরে তারাও খুশি। তবে মূলধনের অভাবে ও অর্ডার না পাওয়ায় মাঝেমধ্যেই তাদের সমস্যায় দিন পার করতে হয়।

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান ঢাকাটাইমসকে বলেন, সমাজসেবা কার্যক্রমের আওতায় সুদমুক্ত ক্ষুদ্র ঋণ মূলত গ্রুপভিত্তিক (১০-২০ জনকে) প্রদান করা হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে মূসা করিম যেহেতু ব্যক্তি শিল্পউদ্যোগক্তা হিসেবে কাজ করছেন, সেক্ষেত্রে ভবিষ্যতে কিভাবে তাকে ক্ষুদ্র ঋণের আওতায় এনে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা যায়- সেই ব্যাপারটি বিবেচনা করা হবে।

এদিকে ট্যাপিস্ট্রি শিল্পের সম্ভাবনা নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের সভাপতি এম.এম ময়েজ উদ্দিন জানান, ফরিপুরের অজপাড়াগায়ে জন্মগ্রহণ করা এশিয়ার বিখ্যাত চিত্রকর রশিদ চৌধুরী উদ্ভাবিত ট্যাপিস্ট্রি শিল্প সারাবিশ্বে দারুণ সমাদৃত। তার সৃষ্ট এই তাপিশ্রী শিল্প পৃষ্ঠপোষকতা পেলে পোশাক শিল্পের মত দেশ ও বিদেশে সমাদৃত হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

ঢাকাটাইমস