কুপির আলোয় আলোকিত জীবন!

তিনি বারবার হোঁচট খেয়েছেন, তবে ভেঙে পড়েননি। ঘুরে দাঁড়িয়েছেন নিজের চেষ্টায়। ব্যাংকার কাজী সজিব আহমেদের সঙ্গে কথা হচ্ছিল ২ নভেম্বর। প্রথম আলোর কার্যালয়ে বসে চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, ‘ব্যাংক থেকে এক মাসের ট্রেনিং করাচ্ছে। এখন ঢাকাতেই আছি।’ চার মাস আগে তিনি একটি বেসরকারি ব্যাংকে ‘ফার্স্ট অফিসার’ পদে যোগ দিয়েছেন।

কাজী সজিব আহমেদের দুর্গম পথ পেরোনোর গল্প জানতে চোখ ফেরাতে হবে ২০০৭ সালে। মুন্সিগঞ্জের টঙ্গীবাড়ি উপজেলার হাটকান গ্রামে তাঁদের বাড়ি। আনোয়ারা বেগম ও আবদুল হাই দম্পতির তিন সন্তানের মধ্যে সজিব দ্বিতীয়। পরিবারে তো বটেই, নিজেদের আত্মীয়–পরিজনের মধ্যেও তিনিই প্রথম এসএসসি পাস করেন। তাও যেনতেন ফল নয়, জিপিএ-৫! সে খবরে কাজী সজিব আহমেদের পরিবারে আনন্দের সঙ্গে উৎকণ্ঠাও ভর করেছিল। অভাবের সংসার। নিজেদের একখণ্ড জমি নেই। তাই বাবার সঙ্গে সজিব কখনো দিনমজুরি খেটেছেন অন্যের জমিতে, কখনো–বা কাজ করেছেন কোল্ড স্টোরেজে।

সজিবের উৎকণ্ঠার খবর ছাপা হয়েছিল প্রথম আলোর ২০০৭ সালের ২৯ জুন সংখ্যায়। ‘বিদ্যুৎ–সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর কুপির বাতিই হয় সজিবের ভরসা’ শিরোনামে প্রকাশিত সেই সংবাদে উঠে আসে এই অদম্য মেধাবীর গল্প। খবরের প্রথম অংশ ছিল এমন, ‘সামনে এসএসসি পরীক্ষা, তাই পাশের বাড়ি থেকে বিদ্যুতের সংযোগ এনেছিলেন দরিদ্র বাবা তাঁর মেধাবী ছেলে সজিব আহমেদের জন্য, যাতে সে রাতে একটু ভালোভাবে পড়তে পারে। কিন্তু পরের জমিতে কাজ করা বাবা আবদুল হাইয়ের পক্ষে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। তাই কেটে দেওয়া হয় সংযোগ। কুপির বাতিতেই পড়াশোনা করে মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার মাকহাটি জে সি উচ্চবিদ্যালয় থেকে জিপিএ–৫ পেয়েছে সজিব।’ সেই সঙ্গে খবরে বলা হয়েছিল, অর্থের অভাবে তাঁর হয়তো আর পড়াশোনা হবে না।

সে খবর পড়েই অনেকে এগিয়ে আসেন সহায়তা করতে। প্রথম আলো ট্রাস্ট থেকে কাজী সজিব আহমেদকে দেওয়া হয় অদম্য মেধাবী বৃত্তি। এই বৃত্তি পেয়ে তিনি কলেজে ভর্তি হন, এগিয়ে নিতে থাকেন পড়াশোনা। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় ছোট একটা হোঁচট খান সজিব। ফল প্রকাশ হওয়ার পর দেখেন, ফসকে গেছে জিপিএ-৫। ফলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া বৃত্তি–সুবিধা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু তত দিনে তাঁর মনে উঁকি দিচ্ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন। কাজী সজিব আহমেদ বলেন, ‘সত্যি বলতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য কী করতে হবে এসব নিয়ে আমার কোনো ধারণা ছিল না। ঢাকায় আমার কোনো আত্মীয়স্বজন নেই। কী করব বুঝে উঠতে পারিনি।’

নানা জায়গায় হোঁচট খেয়ে সজিব ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে। শুরু থেকেই সিজিপিএ ভালো ছিল বলে টিউশন ফির বড় একটি অংশ মওকুফ হয়ে যায়।

রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় মুন্সিগঞ্জ জেলার শিক্ষার্থীদের জন্য একটি হোস্টেল রয়েছে। বিনা খরচে সেখানেই থাকার সুযোগ হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের শুরু থেকেই টিউশনি করতেন। যে টাকা পেতেন তা দিয়ে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে নিয়েছেন। ভালো সিজিপিএ নিয়ে পাস করেছেন স্নাতক। এরপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিভাগে প্রাইভেট প্রোগ্রামে স্নাতকোত্তর করেছেন। কাজী সজিব আহমেদ বলেন, ‘গ্রামের নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে এসে আজ আমি সজিব হয়েছি। এর পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান প্রথম আলো ট্রাস্ট অদম্য মেধাবী কার্যক্রমের।’

শিক্ষাবৃত্তিপ্রাপ্ত অদম্যদের সংখ্যা
অদম্য মেধাবী কার্যক্রমের আওতায় প্রতিবছর উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতকপর্যায়ে শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয়। প্রথম আলোর সাংবাদিকেরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে তাঁদের নির্বাচন করেন। এখন পর্যন্ত মোট ৬৫৬ জন শিক্ষার্থী সহায়তা পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে বর্তমানে বৃত্তি পাচ্ছেন ৩০৯ জন। এ কার্যক্রমে সহায়তা করছে ব্র্যাক ব্যাংক, ট্রান্সকমসহ দেশি বহু প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি।

প্রথম আলো

Comments are closed.