জাপানে শারদীয় দুর্গাপূজা

রাহমান মনি: বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে টোকিওতে উদযাপিত হয়েছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম বৃহৎ ও প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। শঙ্খ, উলুধ্বনি, ঢাক-কাঁসরের বাদ্যবাজনা, পূজারি-ভক্তদের পূজার্চনা, অঞ্জলি প্রদান, প্রসাদ ও ভোগ বিতরণ, পূজা বিষয়ক আলোচনা, ভক্তিমূলক গান, সন্ধ্যা আরতি, সিঁদুর ছোঁয়া এবং সবশেষে নেচেগেয়ে দেবী দুর্গাকে বিদায়ের মধ্য দিয়ে বিষাদের ছায়ায় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা এ উৎসব পালন করেন।

৯ অক্টোবর টোকিওর কিতা সিটি আকাবানে কিতা কুমিন সেন্টারের অস্থায়ী মণ্ডপে দিনব্যাপী এ উৎসবে মেতে ওঠে আপামর প্রবাসীরা। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরাও দুর্গোৎসবে অংশগ্রহণ করে থাকেন। সার্বজনীন পূজা কমিটি জাপান প্রতিবছরের মতো এবারও এ মহতী উৎসবের আয়োজন করে।

আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমা। এ ছাড়াও জাপান সফররত বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ. ক. ম. মোজাম্মেল হক।

পূজা বিষয়ক ধর্মীয় আলোচনায় বক্তব্য রাখেন সার্বজনীন পূজা কমিটি জাপান’র সভাপতি সুনীল রায়, সাধারণ সম্পাদক রতন কুমার বর্মন, সাংগঠনিক সম্পাদক অঞ্জন দাস, উপদেষ্টা সুখেন ব্রহ্ম এবং উপদেষ্টা প্রকৌশলী কিশোর কান্তি বিশ্বাস।

আলোচনায় উপদেষ্টা কিশোর কান্তি বিশ্বাস বলেন, বর্তমানে জাপানে প্রায় ৫০০ জনের মতো হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বসবাস করছেন। ধর্মীয় অনুভূতি এবং বাংলাদেশি ঐতিহ্যগত ২০ বছর থেকে আমরা বিভিন্ন হল ভাড়া করে নিয়মিতভাবেই দুর্গাপূজা এবং বিদ্যাদেবী সরস্বতী পূজা পালন করে আসছি। বিভিন্ন কারণেই হল পেতে আমাদের বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। আবার পেলেও স্থান সংকুলান এবং আপ্যায়নে যথাযথ মনোযোগ দেয়া যাচ্ছে না। এমতাবস্থায় জাপানে বিশেষ করে টোকিও বা এর আশপাশে একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা অতীব জরুরি হয়ে দেখা দিয়েছে। জাপানের আইনকানুন মেনেই সার্বজনীন পূজা কমিটি জাপান একটি মন্দির প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে।

এমতাবস্থায় টোকিওর আশপাশে প্রায় ৩০০০ বর্গমিটারের সমপরিমাণ জায়গা কেনার জন্য যে অর্থের প্রয়োজন তা কমিটির হাতে নেই। তাই ভক্ত, পূজারি, শুভানুধ্যায়ী এবং পৃষ্ঠপোষকদের কাছে আর্থিক অনুদান চেয়ে তিনি বলেন, একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা হলে যে কেবলই পূজার আয়োজন করা হবে তা কিন্তু নয়। বিভিন্ন পূজা আয়োজনের পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থা এবং সামাজিক আয়োজনেরও ব্যবস্থা করা যাবে প্রতিষ্ঠিত মন্দিরে। তিনি সকলের সহযোগিতা একান্তভাবে কামনা করেন।
আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমা তার শুভেচ্ছা বক্তব্যে সকলকে শারদীয় শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, শারদীয় দুর্গোৎসবের মূলমন্ত্র হচ্ছে, অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ ও সত্যের বিকাশ। শুভ ও অশুভ শক্তির চিরকালের দ্বন্দ্বে শুভ শক্তি বিজয়ের গৌরব ঘোষণা করে এ উৎসব। তাই এই উৎসব সার্বজনীন। বাংলাদেশেও সকলে মিলেমিশেই এই উৎসব পালন করে থাকেন।

জাপানে একটি মন্দির প্রতিষ্ঠায় দূতাবাস আপনাদের পাশে থাকবে। সকলের অংশগ্রহণ ও সদিচ্ছা থাকলে একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে তেমন বেগ পেতে হবে না। আমি আমার ব্যক্তিগত এবং দূতাবাসের পক্ষ থেকে আপনাদের সার্বিক সাফল্য কামনা করি।

আলোচনায় অংশ নিয়ে জাপান সফররত মন্ত্রী আ. ক. ম. মোজাম্মেল হক প্রবাসীদের আয়োজনের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, প্রবাসের ব্যস্ততম জীবনেও নিজ দেশের ভাষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও ঐতিহ্য ধরে রেখে সেই সঙ্গে নিজের ধর্ম না ভুলে ব্যস্ততম টোকিও শহরে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মাধ্যমে শারদীয় দুর্গোৎসব আয়োজনের জন্য আমি প্রবাসী বাংলাদেশি হিন্দু সম্প্রদায়কে অভিনন্দন জানাই। মন্ত্রী বলেন, দুর্গাপূজার মাহাত্ম্য হচ্ছে পৃথিবীতে যখন অন্যায়-অবিচার, অত্যাচার চলছিল তখন ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য মা দুর্গার আবির্ভাব হয়েছিল এই ধরায়।

মন্ত্রী আরও বলেন, সম্প্রতি বাংলাদেশে যে অশুভ শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা তা কঠোর হাতে দমন করে দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে আইনের শাসন কায়েম করেছেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল ধর্ম নিরপেক্ষ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার। সে চেতনায় আঘাত এসেছিল। ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার চেতনাকেও হত্যা করা হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। জাতির জনককে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যার মধ্য দিয়ে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে হত্যা করা হয়েছিল। ১৯৯৬ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনার রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠ হওয়ার পর সে অবস্থা থেকে মুক্ত করে বাংলাদেশকে আবারও একটা অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করেছেন। আলোচনা সভা পরিচালনা করেন তনুশ্রী বিশ্বাস।

২১তম আয়োজনের প্রথমদিকে কিছুটা বৈরী আবহাওয়া থাকা সত্ত্বেও কিতা আকাবানের ফুরেসাইকান পূজারি এবং ভক্তদের আনাগোনা এবং সেইসঙ্গে আয়োজকদের কর্মতৎপরতা, ঠাকুরের মন্ত্রপাঠ, ঢাকের বোল, কাঁসর ঘণ্টা, শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনির মাধ্যমে দেবীর অর্চনায় মুখরিত হয়ে ওঠে। শিশু-কিশোরদের নব পোশাকে ছুটোছুটি এবং হৈ-হুল্লা ছিল পূজা উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ। অস্থায়ী পূজামণ্ডপটি হয়ে ওঠে বাংলাদেশের কোনো কালীবাড়ির পূজামণ্ডপ।

দুপুরের পর বৈরী আবহাওয়ার অবসান হয়ে মধ্য আকাশ সূর্যিমামার উঁকির সঙ্গে সঙ্গে পূজামণ্ডপে সর্বসাধারণের ঢল নামে। ধর্ম-বর্ণ, দল-মত নির্বিশেষে সর্বস্তরের প্রবাসীদের আগমন এবং অংশগ্রহণে পূজামণ্ডপ উপচে পড়ে। একসময় পরিস্থিতি সামাল দিতে আয়োজকদের হিমশিম খেতে হয়। অঞ্জলি প্রদান ও প্রসাদ বিতরণে একাধিকবার বৈঠক নিতে হয়।

আলোচনা সভা শেষে শিশু-কিশোর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে একঝাঁক শিশু-কিশোর অংশ নিয়ে থাকে। এ ছাড়াও স্বরলিপি কালচারাল একাডেমির শিক্ষার্থীরা শিশু-কিশোরদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন ববিতা পোদ্দার।

শিশু-কিশোরদের সাংস্কৃতিক পর্বের শেষে ভক্তিমূলক সংগীতানুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন স্থানীয় প্রবাসী সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘উত্তরণ’। যেরোম গোমেজ, তুলি গোমেজ, ববিতা পোদ্দার, নীলাঞ্জনা ছুটির গান ছাড়াও উত্তরণ দলনেতা মো. নাজিম উদ্দিন কবিতা আবৃত্তি করেন। যন্ত্রে ফজলুর রহমান রতন, বাচ্চু দত্ত, বিশ্বজিত দত্ত বাপ্পা সহযোগিতা করেন।

এরপর ভারত থেকে আগত বরেণ্য রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী, বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত সংগীতশিল্পী প্রমিতা মল্লিক বেশ কয়েকটি রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে উপস্থিত সকলের মন জয় করে নেন। পূজার মতো উৎসবমুখর আয়োজনেও যে রবীন্দ্রসংগীত কতটা শ্রুতিমধুর এবং উপভোগ্য হতে পারে তা প্রমিতা মল্লিকের কণ্ঠে না শুনলে বোঝার উপায় ছিল না। তার বিভিন্ন গানে সুভা চক্রবর্তী নৃত্য পরিবেশন করেন। সুভা চক্রবর্তীর নৃত্য পরিবেশনা অতিথিরা মনে রাখবেন অনেকটা সময় ধরে।
সবশেষে সন্ধ্যা আরতি, মিষ্টিমুখ, বধূদের সিঁদুর ছোঁয়া, আনন্দ আলিঙ্গন, প্রণাম এবং বিবাদের ছায়া প্রতিমার প্রতীকী বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় সার্বজনীন পূজা কমিটি, জাপান আয়োজিত ২০১৬ সালের শারদীয় উৎসবের। একদিনের মধ্যেই ৫ দিনব্যাপী পূজার সকল আচার, আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হয় সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই।

rahmanmoni@gmail.com

সাপ্তাহিক

Comments are closed.