ফের আড়িয়ল বিলে বিমানবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ!

আরিফ হোসেন: ফের আড়িয়ল বিলেই বিমানবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। এমন গুঞ্জন এখন আড়িয়ল বিল এলাকা সহ শ্রীনগরের সকল শ্রেনী পেশার মানুষের মধ্যে।

গত কয়েকদিনে বিল এলাকায় ঘন ঘন হেলিকপ্টারের চক্কর বিল বাসীর মধ্যে এরকম ধারণার জন্ম দিয়েছে। এর পর গত এক সপ্তাহের ব্যাবধানে আড়িয়ল বিলে বিমানবন্দর নির্মানের পক্ষে জনমত গঠনের জন্য সরকার দলীয় লোকজন উপজেলার বাড়ৈখালী ও দয়হাটা টেক্কা মার্কেট এলাকায় দুটি সমাবেশ করায় এবং বড় সমাবেশের প্রস্তুতি নেওয়ায় এ ধারনা বিল এলাকায় জোড়ালো হচ্ছে। বিল রক্ষা আন্দোলন কমিটির নেতাদের কথায়ও এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে আন্দোলনকারীদের অনেকেই মনে করছেন সরকারী দলের লোকজন আন্দোলনে সম্পৃক্ত থেকে সরকারের সিদ্ধান্ত প্রতিহত করেছিল। এতে দলীয় ভাবে স্থানীয় সাংসদ সদস্য সুকুমার রঞ্জন ঘোষের ইমেজের যে ক্ষতি হয়েছে তা ফিরিয়ে আনার জন্যই এখন আড়িয়ল বিলে বিমানবন্দর নির্মানের দাবী জানানো হচ্ছে।

শ্রীনগর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) দিলরুবা শারমিন জানান, সরকার ২০১১ সালে আড়িয়ল বিলে বিমানবন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার পর ফের আড়িয়ল বিলে বিমানবন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্তের বিষয়ে এখনো পর্যন্ত কোন রকম নির্দেশনা তাদের কাছে আসেনি।

গত কয়েকদিনে বিল এলাকায় সরজমিনে ঘুরে এবং বিল আন্দোলন রক্ষা কমিটির নেতাদের সাথে আলাপ করে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। অনেকেই তাদের পূর্বের অবস্থান থেকে সরে এসেছেন। আড়িয়ল বিল রক্ষা আন্দোলন কমিটির সদস্য সচিব জিয়াউর রহমান জিয়ন জানান, এর আগে সরকার বিমানবন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বিলবাসীর সাথে কোন রকম আলোচনা করেনি। বেশীর ভাগ মানুষ আন্দোলন করেছে তাদের ভিটেবাড়ী রক্ষার জন্য, জমি রক্ষার জন্য নয় । ওই আন্দোলনের পর ২২ হাজার লোককে আসামী করে মামলা করে সরকার। এখন যদি সরকার আমাদের মামলা উঠিয়ে নেয় এবং জমির ন্যায্য মূল্য দেয় তাহলে আমরা বিলবাসীরা আমাদের সিদ্ধান্ত পুনরায় বিবেচনা করে দেখতে পারি। তবে তা একক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়,সবাইকে নিয়ে বসেই সিদ্ধন্ত নিতে হবে।

সরকার ২০১১ সালে আড়িয়ল বিলে বিমান বন্দর নির্মানের সিদ্ধান্ত নিয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করলে খোদ সরকার দলীয় লোকজন এর বিরোধীতা শুরু করে এবং আড়িয়ল বিল রক্ষা কমিটি গঠন করে। এ কমিটির আহবায়ক হন বাড়ৈখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ওই সময়কার সহ-সভাপতি শাহজাহান বাদল। আন্দোলন কারীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক ইকবাল হোসেন মাষ্টার। তাদের নেতৃত্বে আন্দোলনের একপর্যায়ে ২০১১ সালের ৩১ জানুয়ারী ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের হাসাড়া এলাকায় বিলবাসী ও পুলিশের সংঘর্ষে এক পুলিশ সদস্য নিহত হন। পরে প্রধানমন্ত্রী ঘোষনা দেন জনগন না চাইলে আড়িয়ল বিলে বিমানবন্দর হবেনা। সরকারের উদ্যোগটি ভেস্তে যাওয়ার ৬ মাস পর স্থানীয় সাংসদ জানান, সরকার তার প্রকল্পটি বাতিল করেনি, স্থগিত করেছে। আন্দোলনের চার বছরের মাথায় ২০১৫ সালের ২৮ অক্টোবর এমপি সুকুমার রঞ্জন ঘোষ ভিডিও কনফারেন্সে নিজেদের ভুল স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রীকে ফের আড়িয়ল বিলে বিমানবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহনের আহবান জানান। উপজেলা আওয়ামী লীগের একটি সূত্র জানায়, এর পর থেকে এমপির নির্দেশনায় দলীয় নেতাকর্মীরাও ভেতরে ভেতরে জনমত গঠনের কাজ শুরু করে। ওই সূত্রটি আরো দাবী করে, তাড়াহুড়ো করে বিমানবন্দর নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয়া, সেখানে জমি অধিগ্রহণের লক্ষ্যে স্থানীয় প্রশাসনের বাড়াবাড়ির কারণে আওয়ামী লীগের জনপ্রতিনিধি ও নেতাদের সঙ্গে বিলবাসীর যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল তা ইতিমধ্যে কেটে গেছে।

সরজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, আন্দোলনের চার বছরের মধ্যে পাল্টে গেছে বিল এলাকার চিত্র। বিল এলাকার ছয় কিলোমিটারের মধ্যে শুরু হয়েছে পদ্মা সেতু নির্মানের মহাযজ্ঞ। ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীত করনের কাজও শুরু হয়েছে। রেল লাইন স্থাপনের কাজও অচিরেই শুরু হওয়ার কথা। এসব কাজকে সামনে রেখে আড়িয়ল বিলে শুরু হয়েছে ভূমি দস্যুদের থাবা। কয়েকটি হাউজিং কোম্পানী উমপাড়া,কেয়ট খালী, হাসাড়া ও পাকিরা পাড়া এলাকায় মহাসড়ক থেকে পশ্চিম দিকে প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকায় জমি কিনে সাইবোর্ড গেড়ে জানান দিচ্ছে নগরায়নের। দ্রুত দৃশ্যপট পাল্টানোর কারণে সাধারণ কৃষকদের ভাষায় বিল আর বিল থাকছেনা। একারণে বিমানবন্দর নির্মাণের বিরোধীতাকারীদের অনেকেই তাদের অবস্থান থেকে সরে এসে এখন আড়িয়ল বিলে বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য ন্যায্য মূল্যে সরকারকে জমি দিতে চাচ্ছেন। এর উল্টো চিত্রও রয়েছে। বিলটিতে অনেক খাস জমি রয়েছে। যারা এর ভোগদখলে আছেন তারা কোন ভাবেই চাননা আড়িয়ল বিলে বিমানবন্দর হোক।

অপরদিকে গত পাচ বছরেও সরকার বিমানবন্দর নির্মানের জন্য স্থান নির্বাচন করতে পারেনি। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য সরকার ইতিমধ্যে জাপান সরকারের সাথে চুক্তি করেছে । কয়েক দিনের হেলিকপ্টারের ঘুরাঘুরিতে বিলবাসীরা ধারণা করছে এটা সম্ভাব্যতা যাচাইয়েরই অংশ।

এব্যাপারে আড়িয়ল বিল রক্ষা কমিটির আহবায়ক শাহজাহান বাদল জানান, বিল আন্দোলন মামলায় ২২ হাজার লোককে আসামী করে যে মামলা হয়েছে। তাতে প্রায় ২০০ জনকে চার্জশীট ভূক্ত করেছে পুলিশ। আড়িয়ল বিলে হেলিকপ্টারের ঘুরাঘুরি ও সরকার দলীয় লোকদের সভা-সমাবেশ থেকে ধারণা করছি কিছু একটা হয়েছে। তাছাড়া ফের বিমান বন্দর নির্মাণ করার উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি আমরা লোক মুখে শুনেছি। বিষয়টি নিয়ে আমরা দু-একদিনে মধ্যে ঢাকায় মিটিংয়ে বসব।

Comments are closed.