ঢাকাইয়াদের পছন্দের শীর্ষে মিরকাদিমের ধবল গাই

পুরান ঢাকাবাসীর কোরবানির পশু পছন্দের শীর্ষে “ মিরকাদিমের ধবল গাই”। আর শত বছর ধরে এই চাহিদার জোগান দিয়ে চলেছে মিরকাদিমের খামারিরা। মিরকাদিম মুন্সীগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার একটি পৌরসভা নাম। প্রাচীন নদী বন্দর মিকাদিমের খ্যাতি ছিল বাণিজ্য কেন্দ্র হিসাবে। আর এখন এই জায়গার নামটি বিখ্যাত হয়ে গেছে এই ধবল গাইয়ের সুবাদে। তাদের অতি যতেœ পালিত গরুগুলো তোলা হয় পুরান ঢাকার গনি মিয়ার হাটে। সেখান থেকেই বাছাই করে কিনে নেন বনেদি ঢাকাইয়ারা।

মিরকাদিমে সাদা রঙের বিশেষ জাতের গাভিগুলো লালনপালন করা হয় মূলত কোরবানির ঈদে চাহিদার বিষয়টি মাথায় রেখেই। ঈদের আগের রাতে বা দু’দিন আগে পুরান ঢাকার রহমতগঞ্জে গনি মিয়ার হাটে এসব গাভি তোলা হয়। আর বিশেষ শ্রেণির ক্রেতারাও যেন মুখিয়ে থাকে। আগেভাগে বাছাই করে পছন্দের গরুটি কিনতে তারা হুমড়ি খেয়ে পড়ে এই হাটে।

সাদা রঙের গরু লালনপালন শেষে বিক্রি করে মিরকাদিমের অনেক খামার মালিকের ভাগ্য ফিরেছে। টানাটানির সংসারে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের অনেক সাধই অপূর্ণ থেকে যায়। কিন্তু গরুর যতœ-আত্তিতে কোনো ঘাটতি পড়ার সুযোগ নেই। দেশের আর কোথাও গবাদি পশু লালনপালনে যা দেখা যাবে না। যে শ্যা¤পু নিজে ব্যবহারের ক্ষেত্রেও খরচের কথা ভেবে দশবার ভাবতে হয়, সেই শ্যা¤পু দিয়ে পরম আদরে পালিত গরুকে নিয়মিত গোসল করান খামারিরা। মশার কামড় থেকে বাঁচাতে রাতে গোয়ালঘরে নিয়মিত মশারি খাটান। শীতে গরুর গায়ে চাপানো হয় বিশেষ ধরনের লেপ।

আবার গরমে আরাম দিতে গোয়াল ঘরে ঘুরতে থাকে বৈদ্যুতিক পাখা। খাবারের ব্যাপারেও ব্যতিক্রমী ভাবনা। নির্ভেজাল খৈল, বাছাই করা ভুসি, খুদের জাউ, ভাতের মার আর তাজা ঘাস প্রতিদিন তুলে দেওয়া হয় গরুর মুখে। মাটিচাপা দিয়ে ধানের কুটা পচিয়ে এক ধরনের খাবার বানিয়ে খাওয়ানো হয় গরুকে। তবে ক্রমেই এই ঐতিহ্য বিলুপ্ত হতে চলছে।

মিরকাদিমের খামার মালিকরা জানান, মিরকাদিম আশপাশ থেকে এবার বেশ কিছু গরু রহমতগঞ্জের হাটে যাচ্ছে। এর আগের বছরও প্রায় দেড় শ’ গরু গেছে এই হাটে। তার আগের বছর ছিল এর প্রায় দ্বিগুন। বছর দশেক আগেও প্রায় ১ হাজার গরু যেত মিরকাদিম থেকে। গোয়াল ঘুন্নী গ্রামের তৈয়ব আলী আলী ১০০/১৫০ গরু পালন করতেন। কিন্তু তিনি কয়েক বছর আগে মারা যাওয়ার পর তার পরিবার থেকে এই গরু পালন বন্ধ হয়ে গেছে। একই গ্রামের সৈয়দ মেম্বারও ব্যাপকভাবে এই গরু পালন করতেন তিনিও মারাগেছেন ৫/৬ বছর আগে। তার উত্তরসুরীরা এই গরু পালন করছেন। নানা কারণেই এখন মিরকাদিমের ঐতিহ্যবাহী এই গরু পালন কমে গেছে।

খামারী কামাল উদ্দিন জানান, আগের অবস্থা আর এখন নাই। এখন এই গরু পেলে পোষায় না। রাখালের অভাব এবং উপকরণের মূল্য বেশী হওয়ায় এখন আগের মত এত গরু পালন করতে পারেন না। বাবা, দাদা এই গরু পালত। তাই তিনিও শখে ৩৫ বছর ধরে এই গরু পালন করছেন। তারমতে ২৫টি খামার আছে মিরকাদিমে। পারিবারিক ঐতিহ্য আর পূর্ব পুরুষের পেশা ধরে রাখার জন্যই এই পরিবারগুলো এই গরু লালন পালন করছে। তাদের বাড়িতেই বা বাড়ির পাশে এমন খামার তৈরি করে ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন তারা। পরিবারগুলো সারা বছর এমন নিবিড় যতœ নিয়েই সাদা রঙের বিশেষ জাতের গরু লালনপালন করে। এগুলো দেশজুড়ে মিরকাদিমের সাদা গরু নামেই বিশেষ পরিচিত। স্থানীয়ভাবে বলা হয়, সাদা গাই। যুগের পর যুগ ধরে বংশপর¤পরায় মিরকাদিমের মানুষ বিশেষ ধরনের ধবধবে সাদা রঙের গাই গরু পালন করে আসছে।

সাদা গরুর সুবাদে মিরকাদিম দেশের অন্যান্য অঞ্চলের অনেক মানুষের কাছেও বেশ পরিচিত। বিশেষ করে কোরবানির সময় এ নামটি উচ্চারিত হয় বেশি। ঈদের আগে আগে মিরকাদিমে গরু ব্যবসায়ীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। মিরকাদিমের গরু মানেই বাজারে ব্যাপক চাহিদা আর নিশ্চিত লাভের হাতছানি।

বর্তমানে অনেক খামার মালিক সাদা রঙের ষাঁড় বাছুর কিনে লালনপালন করছেন। তবে পুরান ঢাকাবাসীর কাছে সাদা রঙের ষাড়ের চেয়ে গাইয়ের চাহিদা বেশি। দামেও রয়েছে বেশ তফাৎ। অনেক সময় এই বিশেষ ধরনের পশুর সংকট হলে দাম অনেকটা বেড়ে যায়। ঢাকার আদি বাসিন্দারাও অনেকে বাজারদরের দুই-তিন গুণ বেশি টাকা দিয়ে হলেও মিরকাদিমের গরু কিনে থাকে। অনেকে ব্যাপারীদের অগ্রিম টাকা দিয়ে রাখে। মিরকাদিমের সাদা গাই ঢাকাইয়াদের আভিজাত্যের অংশ হয়ে গেছে। ঈদে যত গরু-খাসির মাংস খাওয়া হোক না কেন, মিরকাদিমের সাদা গাইয়ের এক টুকরো মাংস না খেলে যেন কোরবানির মাংস খাওয়াই অপূর্ণ থেকে যায়। এমনটাই মনে করে পুরনো ঢাকার বাসিন্দারা।

শুধু মিরকাদিমের গরু বিক্রির জন্য রহমতগঞ্জের গনি মিয়ার হাট বিশেষভাবে সজ্জিত করা হয়। আলোকসজ্জার পাশাপাশি ওপরে টানানো হয় রং-বেরঙের সামিয়ানা। এই সামিয়ানার নিচে সাদা গরুগুলো সারিবদ্ধভাবে বেঁধে রাখা হয়। ইচ্ছা করলেই যেকোনো পশুর হাটে মিরকাদিমের গরু মিলবে না। এ জন্য যেতে হবে এই গনি মিয়ার হাটে। প্রতিবছর কোরবানির ঈদের আগে নির্দিষ্ট পরিমাণ গরু ওঠে এই হাটে। এ ধরনের গরু বেচাকেনায় সংশ্লিষ্ট ব্যাপারীর সংখ্যাও সীমিত। হাটের মূল আকর্ষণ বরাবরই মিরকাদিমের গাই। দেখার জন্যও অনেকে হাটে ভিড় করে। তবে এই গরু সীমিত হওয়ায় ঢাকাইয়াদের চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না। অনেকেই খালি হাতে হাট থেকে ফিরে যান।

গরুর নাম কেন মিরকাদিমের নামে হলো এমন প্রশ্ন অনেকের মনে। স্থানীয় লোকজন সূত্রে জানা যায়, প্রায় এক শ বছর আগে ঢাকার কাছাকাছি জনপদ মিরকাদিম এলাকার লোকজন সাদা গাই পালন শুরু করেছিলেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত তা চলে আসছে। মিরকাদিমের গরুর ব্যাপারীরা যশোর, রাজশাহী, দিনাজপুর প্রভৃতি এলাকা থেকে বাছাই করে সাদা গাই গরুর বাছুর কিনে আনেন। এরপর বিশেষ যতেœর সঙ্গে গরুগুলো পালন করে কোরবানির হাটে বিক্রি উপযোগী করে তোলা হয়।

মিরকাদিম এলাকাটি পশুর খাদ্যের জন্য প্রসিদ্ধ। এখানে প্রচুর তেলকল ও ধানের চাতাল থাকায় সাশ্রয়ী দামে খৈল-ভুসি পাওয়া যায়। এ ছাড়া কৃষিপ্রধান এলাকা হওয়ায় উপকরণ সহজলভ্য। নানা কারণে সহজেই মিরকাদিমের গরু বেড়ে ওঠে। গরুগুলো নিখুঁত এবং উচ্চতায় বেশি হয়। সাধারণত খইল, কুঁড়া, ভুসি খাওয়ানো হয় এসব গরুকে। ঘাস খাওয়ানো হয় না। গরুগুলো বেশ সুঠাম দেহের হয়। আর মাংস

বেশ সুস্বাদু। ১৯৩৩ সালে পুরান ঢাকায় হাট শুরুর পর থেকে মিরকাদিমের গরু আসতে শুরু করে। এখন তা ক্রেতাদের আকর্ষণ ও চাহিদার কেন্দ্রে রয়েছে।

রহমতগঞ্জ স্পোর্টিং ক্লাবের খেলার মাঠে গরুর হাটে প্রতিবছর কোরবানির ঈদের দু‘দিন আগে নদীপথে ট্রলার ও জাহাজে গরু আসে। এ পশুর হাট ছাড়া মিরকাদিমের গরু রাজধানীর অন্য কোনো হাটে মেলে না। এসব গরু রাখার জন্য এ হাটে নির্ধারিত জায়গা রাখা হয়। পুরান ঢাকার বড় বড় ব্যবসায়ীরা কোরবানির গরু কেনার জন্য শুধু এ হাটে আসে।

ধলেশ্বরী তীরের মিরকাদিমে সতেজ আবহাওয়া, সুন্দর পরিবেশ, পরিচ্ছন্ন খামার, খামারীদের গরুর প্রতি বিশেষ যতেœর কারণেই মিরকাদিমের গরু এখন বিশেষ লোভনীয়। আর তাই এই গরু কিনতে এখন মুন্সীগঞ্জের খামারেও হানা দিচ্ছে ঢাকার ক্রেতারা।

ক্রেতাদের ভাষায়, এর মাংসও সুস্বাদু। মিরকাদিমের গরুর কদর যেমন বেশি অন্যান্য গরুর চেয়ে দামও তেমনিই বেশি। চাহিদার কারণে হাটের প্রবেশদ্বারে রাখা হয় এই গরুগুলোকে। বিক্রেতারা জানান, হাটে ওঠানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গরুগুলো বিক্রি হয়ে যায়।

মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোঃ সাইফুল হাসান বাদল জানান, মিরকাদিমের গরু এই অঞ্চলের ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি খামারিদের স্বার্থে স্থানীয় প্রশাসন সবরকম সহযোগিতা দিচ্ছে।

ট্যাবলেট খাইয়ে বা ইনজেকশন দিয়ে এখানকার গরু স্বাস্থ্যবান করা হয় না। সাধারণত খৈল, ভুসি, খুদ ইত্যাদি খাইয়ে এখানকার গরুর সুদর্শন করা হয়। স্বাভাবিক স্বাস্থ। যাকে বলা যায় সুস্বাস্থ্যবান।

এখানকার গরুর চাহিদা ইতিমধ্যে সারা বাংলায় ছড়িয়ে গেছে। এছাড়া ভারতের উড়িষ্যা, জঙ্গলি, নেপালের নেপালি, ভুটানের বুট্টি গরুগরুও এখানে লালন পালন হয়ে থাকে। ধান-চাল আর তেলের কারখানা থাকার কারণে মিরকাদিমের ভূষি, কুড়া, খৈলসহ বিভিন্ন উন্নতমানের গরু খাদ্য খুব সহজে পাওয়া যায়।

এখানকার ব্যবসায়ীরা মিরকাদিমের গরুকে মিনিকেট চালের খুদ, এক নাম্বার খৈল, ভাতের মার, সিদ্ধ ভাত, খেসারির ভুসি, গমের ভূষি, বুটের ভূষি খাওয়ান। এছাড়া গরু পালনে প্রশিক্ষিত লোক নিয়োগ করা হয়।

তবে দিন দিন গরুর এই ব্যবসাটিতে এখানকার ব্যবসায়ীরা উৎসাহ পাচ্ছে না। ভূষি, কুড়া আর খৈলের দাম বৃদ্ধি আর অপ্রতুল হওয়ার তারা হতাশ। তাছাড়া এর বাইরের জিনিস তারা গরুকে খাওয়ান না। এসব গরুর মাংস সুস্বাদু হওয়ার এটাই প্রধান কারণ। তাছাড়া মশারি টানিয়ে গরুকে ঘুম পাড়ানো হয়। এক কথায় গরু ব্যবসায়ীরা তাদের সন্তানের মতো করে বিভিন্ন জাতের গরু লালন পালন করেন। আর এ কারণেই মিরকাদিমের এই গরুর ব্যাপক চাহিদা দেশব্যাপী ছড়িয়ে গেছে।

জনকন্ঠ

Comments are closed.