জাপানি উদারতা রূপকথাকেও হার মানায়

রাহমান মনি: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর জাপান সভ্যতার চরম শিখরে যে অবস্থান করছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। জাপানি ম্যানার সর্বজনবিদিত। আধুনিক বিশ্বে জাপানি ম্যানার এক রোলমডেল হিসেবে স্বীকৃত। যদিও কথায় কথায় মাথানত করা বর্তমান জাপানের অভ্যন্তরেও প্রশ্নের সম্মুখীন। কট্টরপন্থি এবং যুবসমাজ কথায় কথায় মাথানত করাকে একধরনের হিনম্মন্যতা বলতেও কুণ্ঠাবোধ করছে না, তারপরও জাপানের তুলনা হয় না।

অতিসম্প্রতি (১ জুলাই ২০১৬) ঢাকার গুলশানে ঘটে যাওয়া ন্যক্কারজনক ঘটনার পর বিশেষ করে ৭ জন জাপানি এবং ৯ জন ইতালিয়ান নাগরিক হত্যাকাণ্ড ঘটনার পর প্রবাসে বিশেষ করে জাপান এবং ইতালিতে প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজে যে চরম অনিশ্চয়তা এবং বিব্রতকর পরিস্থিতির শিকার এবং প্রতিশোধের খড়গ নেমে আসার যে আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল, বাস্তবে তা অসাড় প্রমাণিত হয়েছে তা ‘সাপ্তাহিক’ জাপান প্রতিনিধি রাহমান মনি এবং ইতালি প্রতিনিধি পলাশ রহমানের সরেজমিন অভিজ্ঞতায় প্রবাস প্রতিবেদনে ‘সাপ্তাহিক’-এর কল্যাণে আমরা জেনেছি। এজন্য একজন বাংলাদেশি হিসেবে জাপান এবং ইতালির নাগরিকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা আমার জানা নেই।

টোকিওস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস আয়োজিত জাতীয় শোক দিবসে ‘বঙ্গবন্ধুর কর্মময় জীবন ও স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে তার অসামান্য অবদান’ শীর্ষক এক আলোচনায় রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমা তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘৭ জন জাপানি নাগরিকের শবদেহ বিশেষ বিমানে করে হানেদা বিমানবন্দরে গ্রহণ এবং পরবর্তীতে টোকিওর আয়োইমাতে আয়োজিত স্মরণসভা (মৃতদেহ সৎকারে বিশেষ প্রার্থনা সভা)-তে কিছু ভীতি নিয়েই আমি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করি। ভীতির কারণ ছিল নিহতদের স্বজন পরিবেষ্টিত পারিবারিক আয়োজনে বাংলাদেশে হত্যার কারণে কিছুটা ক্ষোভ আসলে আমার উপর আসতেও পারত। কিন্তু অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার পর জাপানিদের যে আচরণ আমি পেয়েছি তাতে হত্যাকাণ্ডে শোকে মাথানত হওয়ার চেয়েও শ্রদ্ধায় আরও বেশি মাথানত হয়েছে। সৎকার অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার পর জাপানি আতিথেয়তায় বরণ করে নেয়ার পর শবদেহে পুষ্পার্ঘ অর্পণ এবং সকল আনুষ্ঠানিকতায় তারা আমাকে অগ্রভাগে স্থান দিয়েছেন যা আমাকে মুগ্ধ করেছে।’ অভিজ্ঞতাটি এর আগেও তিনি একাধিকবার শেয়ার করেছেন।

এই দিন রাষ্ট্রদূত এমন একটি তথ্য দিলেন যা জানলে একজন বাংলাদেশি হিসেবেই কেবল নয়, যে কোনো মানব সন্তানই জাপানি জাতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা আরও বেড়ে যাবে শতগুণ।

রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমার দেয়া তথ্যমতে, নাম ঠিকানাবিহীন একটি খামের ভেতর জাপানি ভাষায় লেখা এবং নিজেকে কেবল জাপানি পরিচয়ে একটি চিরকুট এবং নগদ দশ লাখ (১ মিলিয়ন) ইয়েন দূতাবাসের পোস্ট বক্সের ভেতর দেখতে পান। খামটি খোলার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন ভাবনায় কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকলেও খোলার পর দূতাবাস অবাক বনে যান। চিঠির ভাষা বাংলায় ভাষান্তর করলে যা দাঁড়ায় তার অর্থ হলো, ‘গুলশান ট্র্যাজেডিতে ৭ জন জাপানি নিহত এবং ১ জন আহতসহ পুরো ঘটনায় আমরা গভীর শোকাহত। কিন্তু বিশ্ব সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় বাংলাদেশও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। সেই সঙ্গে গুলশান ট্র্যাজেডিতে বাংলাদেশেরও জানমালের ক্ষতি হয়েছে। তাদের জন্য আমার সামান্য এই উদ্যোগ, গ্রহণ করলে খুশি হব।’ যোগাযোগের জন্য কোনো মাধ্যমই দাতা সংশ্লিষ্ট রাখেননি।

ক্ষতিগ্রস্ত হয়েও দেশ হিসেবে জাপান এবং জাতি হিসেবে জাপানিদের এমন উদারতা রূপকথাকেও হার মানায়।

সাপ্তাহিক

Comments are closed.