পিনাক-৬ ট্যাজেডী ॥ বাস্তবায়িত হয়নি তদন্ত কমিটির সুপারিশ

পিনাকা-৬ লঞ্চ ডুবির দুই বছর আজ বৃহস্পতিবার। পদ্মায় হারিয়ে যাওয়া লঞ্চটির সন্ধান মিলেনি এই দীর্ঘ সময়েও। সরকারি হিসেবে এখনও নিখোঁজ রয়েছে ৬১ যাত্রী। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এই দুর্ঘটনায় ৪৯ যাত্রীর লাশ উদ্ধার হয়। শোকাহত স্বজনদের কান্না থামেনি। উত্তাল পদ্মার দাপাদাপিতেই সমাধি খোঁজে অনেক নিখোঁজের স্বজন। যেন পুরো পদ্মাই স্বজনের কবর। এই আলোচিত দুর্ঘটনার তদন্ত কমিটির রিপোর্টের সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হয়নি এখনও। তাই ফের এমন দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছে সংশ্লিষ্টরা।

তবে এই ঘটনায় লঞ্চটির মালিক আবু বক্কর সিদ্দিক কালু ও তার পুত্র ওমর ফারুক লিমন গ্রেফতার হন। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকলেও এখন দু’জনই জামিনে রয়েছেন। কিন্তু এখনও গ্রেফতার হয়নি লঞ্চটির চালকসহ অন্য আসামীরা। লঞ্চটির ত্রুটিপূর্ণ নক্সা এবং এটি অবৈধভাবে চলাচলের অনুমোদন দেয়া সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ঘটনার পর সাময়িক কিছু ব্যবস্থা নেয়া হলেও তারা এখন রয়েছে বহাল তবিয়তে। ঘটনার পরদিন লৌহজং থানায় করা মামলাটি সম্পর্কে লৌহজং থানার ওসি আনিছুর রহমান জানান, চাজশীর্ট দেয়া যায়নি, মামলাটি এখনও তদন্তাধীন রয়েছে।

থানার আরেক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন এলাকার অনেক লোক মারাগেছেন, তাই স্বাক্ষীও অনেক, তাদের স্বজনরা স্বাক্ষী দিতে আসতে চায়না, এসব কারণেই বিলম্ব হচ্ছে। এই মামলার কার্যক্রম এক রকম স্থবির। মামলাটিতে ছয়জন আসামী হলেও মূল অপরাধী চালকসহ অন্য চারজন গ্রেফতার হয়নি। ভূক্তভোগীরা এটি “চাঞ্চল্যকর মামলা” হিসাবে চিহ্নিত করে দায়ীদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করেছেন।

এই দুর্ঘটনার একমাস ৭দিন পর উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটির ৬২ পৃষ্ঠার একটি দীর্ঘ রিপোর্ট সরকারের কাছে পেশ করে। ৩২ জনের স্বাক্ষ্য নেয়া এই রিপোর্টে- অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন, অদক্ষ্যচালক, নকসায় ত্রুটি এবং লঞ্চটির কাগজপত্রে নানা রকম অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়। বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তাসহ সাতজনকে এই লঞ্চডুবির জন্য সরাসরি দায়ী করা হয়েছিল। ইনল্যান্ড শিপিং অডিনেন্স ১৯৭৬ এর ৪৫ (৩) ধারায় গঠিত এই তদন্ত কমিটি লঞ্চ দুর্ঘটনার সঠিক কারণ ও দায়ী ব্যক্তিদেরও চিহ্নিত করে দেয়। বিশেষঞ্জরা বলেছেন-যেহেতু আইন মোতাবেক সরকার তদন্ত কমিটিটি করেছে, তাই মামলার বাইরেও এই তদন্তে দায়িত্ব অবহেলা এবং দোষী সাবস্তদের বিরুদ্ধে সাবলিমেন্ট কেস হতে পারে। তা করা হয়নি। এমনকি কর্তব্যে অবহেলাকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ব্যবস্থা না নেয়ায় নৌদুর্ঘটনা এরপরও ঘটেছে।

ওই বছরের ঈদুল ফিতরের পর কর্মস্তলে ফেরার সময় পিনাক-৬ ডুবে যায়। মাদারীপুরের কাওড়াকান্দি থেকে তিন শতাধিক যাত্রী নিয়ে লঞ্চটি মুন্সীগঞ্জে মাওয়া আসছিল। মাওয়ার অদূরে পদ্মার ঘুর্ণাবতে নদীর বুকে হারিয়ে যায়। পাশের লঞ্চ থেকে মোবাইল ফোনে বন্দি করা সেই ভিডিও এখনও পীরা দেয়। দুর্ঘটনা কবলিত লঞ্চ সনাক্তে বিশ্বের সর্বাধুনিক সকল প্রযুক্তি ব্যবহার করেও ব্যর্থ হয়।

সোনার স্কেন দিয়ে লঞ্চের মত কিছু একটার অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল। প্রায় ৮০ ফুট পানির নিচের সেই বন্ধুটি নিয়ে নানা রহস্যের সৃষ্টি হয়। প্রবল ¯্রােত ও ডুবরিরা সেই স্থানে পৌছতে না পারায় বস্তুটিকে নিশ্চিত করা যায়নি। কিন্তু সেই বস্তুটি আটকাতে পারেনি। সকল চেষ্টা ব্যর্থ হলে সরকার প্রায় ৮ দিন পরে উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষনা করে। এতে এরই মাঝে লঞ্চটিকে উদ্ধারে আশার আলো দেখায় স্থানীয় উদ্ধারকারী একটি দল। তারা স্থানীয় ‘কোপা’ পদ্ধতিতে লঞ্চটিকে আটকাতে সক্ষম হয়েছে বলে দাবী করে। আধুনিক সব যন্ত্রপাতি যখন ফেল করছে লঞ্চটি সনাক্তে তখন এটা তাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য ছিলনা।

তাই পদ্মার তলদেশেই পিনাক-৬ রয়েগেছে। স্থানীয়রা বলছেন এটি হয়তো একটিদন টাইটানিকের মত পদ্মার বুকে আবিস্কৃত হবে।

এই পিনাক কয়েকটি পরিবারকেও নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। বাবা-মা ও সন্তান পরিবারের সকলেই হারিয়ে যায় পদ্মায়। তাদের কান্নার জন্যও যেন কেউ নেই। দুর্ঘটনার পরের দিন ৫ আগস্ট রাতে “অধিক মুনাফার আশায় ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করে বেপোরোয়া লঞ্চ চালিয়ে অবহেলাজনিত নরহত্যার” অপরাধে ছয় জনকে আসামী করে লৌহজং থানায় হত্যা মামলা দায়ের করে বিআইডব্লিউটিএ। এর আগে ৪ আগস্ট মেরিন কোর্টে পাঁচ জনের বিরুদ্ধে প্রথম মামলা করে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর। থানায় দায়ের করা মামলার বাদী বিআইডব্লিইটএ’র টিআই মো. জাহাঙ্গীর আলম বাদী হন। কিন্তু পরে দায়িত্ব অবহেলার কারণে টিআই মো. জাহাঙ্গীরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তবে পরবর্তীতে পুনর্বহাল হয়ে যান।

মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল হাসান বাদল বলেছেন, পিনাক-৬ লঞ্চ ডুবি ছিল বেদনা দায়ক। লঞ্চটি উদ্ধারে সরকারের সর্বাত্মক চেষ্টা ছিল, কিন্তু সম্ভব হয়নি। নিহত ও নিখোঁজের পরিবারগুলোকে সরকারের পক্ষ থেকে সাহায্য সহযোগিতা করা হয়েছে। পরিবারগুলোর প্রতি তিনি সমবেদনা প্রকাশ করে বলেন, লঞ্চটি উদ্ধার করা সম্ভব না হলেও এ ব্যাপারে সরকারের উচ্চ মহলে একটি প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। যাতে ভবিষ্যতে এ ধরণের লঞ্চ দুর্ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়।

জনকন্ঠ

Comments are closed.