জন্মদিনে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: কাজ উপভোগ করাই জীবন

একাশি বছরে পা দিয়েও নিজের কাজ চালিয়ে যেতে চান অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী; আর এর মধ্য দিয়েই জীবনকে উপভোগ করছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। বৃহস্পতিবার ৮০ বছর পূর্ণ করলেন লেখক, প্রাবন্ধিক ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সক্রিয় সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ইমেরিটাস অধ্যাপক নামের আদ্যক্ষর দিয়ে সিক (SIC) নামেই পরিচিত তার ছাত্রসহ অনেকের কাছে।

জন্মদিনের আনুষ্ঠানিকতা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এড়িয়ে চললেও শুভেচ্ছার বার্তা নিয়ে ধানমণ্ডিতে তার বাড়িতে বৃহস্পতিবার উপস্থিত হন তার শুভানুধ্যায়ীরা।

সেখানে সবার মধ্যমনি হয়ে কথার মালা খুলে বসা এই অধ্যাপকের কাছে জানতে চাওয়া হয়- জীবন মানে কী?

‘কাজ করা এবং সে কাজকে উপভোগ করা’ উত্তর আসে ৮০ বছর পেরিয়ে আসা এই ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে।

“কাজটা যদি ভালো হয়, তাহলে জীবনটা সার্থক হয় বলে আমি মনে করি। জীবন মানে তো একটা সময় কাটানো নয়। কাজটার মধ্য দিয়ে যদি আনন্দ থাকে, সন্তোষ পাওয়া যায় তাহলে মনে হয় জীবন সার্থক।”

১৯৮৯ সালে স্ত্রী অধ্যাপক নাজমা জেসমিন চৌধুরীর মৃত্যুর পর জীবনের বাকি পথ একাই পাড়ি দিচ্ছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। অবশ্য দুই মেয়ে ধানমণ্ডির ওই বাড়িতে তার সঙ্গেই থাকছেন।

১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুন মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগরে জন্ম সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর। পুরান ঢাকার সেন্ট গ্রেগরিজ হাই স্কুল থেকে ১৯৫০ সালে মেট্রিকুলেশন পাসে করে নটরডেম কলেজে থেকে আইএ পাস করার পর তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

ইংরেজি সাহিত্যে এমএ ডিগ্রি নিয়ে মুন্সীগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজে শিক্ষকতায় যুক্ত হন তিনি। পাশাপাশি ঢাকার জগন্নাথ কলেজেও খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন।

১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। পরে যুক্তরাজ্যের লিডস ইউনিভার্সিটি থেকে পোস্ট গ্রাজুয়েট এবং লেস্টার ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি নেন।

জন্মদিনে কোনো আনুষ্ঠানিকতা না থাকার বিষয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “আমি প্রচ্ছন্নে থাকাটা পছন্দ করি।

“জন্মদিনকে ঘিরে এক ধরনের উৎসব ও আনুষ্ঠানিকতা হয়; এটা আমাকে কেন্দ্র করে হবে, সেটা স্পর্শকাতর বিষয় মনে হয়। নিজেকে এভাবে উন্মোচিত করা, বিষয়বস্তুতে পরিণত করা, সেটা আমার খুব পছন্দ নয়।”

“আমার মধ্যে দুটো সত্ত্বা কাজ করে, যেটা আমি দেখতে পাই। তার একটা স্পর্শকাতরতা, যেটা মানুষকে গুটিয়ে আনে আর আরেকটি সংবেদনশীলতা, এটা মানুষকে বাইরের দিকে নিয়ে যায়। এই স্পর্শকাতরার কারণে বোধোহয় আমি নিজের মধ্যে থাকাটা পছন্দ করি,” নিজেই নিজের মনোবিশ্লেষণ করেন এই সমাজ ও রাজনীতি বিশ্লেষক।

স্পর্শকাতরতার কারণেই লেখালেখিতে ছদ্মনাম বা বেনামে লেখাকে উপভোগ করতেন বলে জানান আশির দশকে দৈনিক সংবাদের ‘গাছপাথর’ কলামের জনপ্রিয় এই কলামনিস্ট।

পেশায় শিক্ষক হলেও লেখালেখি ‘বেশি উপভোগ’ করা এই অধ্যাপকের প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৯২টি।

লেখালেখি ও শিক্ষকতা নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে তাই সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “আমার প্রথম আকর্ষণ লেখালেখির দিকে ছিল। এখানকার যেসব পরিচয় তার সবগুলো হওয়ার আগে আমি লেখক হতে চেয়েছি।

“কিশোর বয়স থেকে আমি সে চেষ্টা করেছি। হাতের লেখা দেয়াল পত্রিকা বের করা, অনুবাদ ও ছোটদের বিভাগে লিখতে লিখতে আমি বড় হয়েছি। অন্য কাজগুলো পরে এসেছে।”

লেখালেখির সঙ্গে অন্য অনেক কাজেও নিজে সম্পৃক্ত রেখেছেন সদাব্যস্ত সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ৯ বছর কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সম্পাদকের দায়িত্বেও ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট থেকে দুবার উপাচার্য পদে মনোনয়নও পেয়েছিলেন।

“ক্ষমতায় যেতে চাইনি কখনও। আন্দোলন করেছি স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে। সেটা পেয়েছি। তারপর নির্বাচনের কথা আসলে দলের কথা আসল। কিন্তু কর্তার থেকে সুবিধা আদায় আমরা চাইনি।”

তবে গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে শিক্ষকরা যোগাযোগ শুরু করায় পরিণতি ভালো হয়নি বলে মন্তব্য করেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।

“এখন শিক্ষাগত বিবেচনাকে পেছনে পেলে স্বার্থসিদ্ধির বিষয়টি প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। পদ দখলের জন্য হয়ে গেছে। আমরা ভাবতাম, এ বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বায়ত্তশাসন আমরা পেয়েছি, এটাকে আমরা রক্ষা করব।”

“আমরা কোনোমতে সরকারকে এখানে প্রবেশ করতে দেব না। সরকারকে যদি পরামর্শ দেওয়ার প্রয়োজন হয় তাহলে আমরা সেটা করব। সরকারের সঙ্গে গিয়ে আমরা যোগাযোগ করবো সেটা হতে পারে না।”

বর্তমানে ‘অস্বস্তিকর ও অনিশ্চিত’ পরিস্থিতি দেখছেন জানিয়ে তিনি বলেন, “ক্রমাগত নামছি আমরা, উন্নতি তো হচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলার কথা বলি, মানবাধিকারের কথা বলি বা নিরাপত্তার কথা বলি, তাহলে কোনো জায়গায় তো উন্নতি দেখছি না।”

নয় বছর ডাকসুর কোষাধ্যক্ষ থাকার কথা জানিয়ে ২৫ বছর ধরে এই নির্বাচন না হওয়া নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেন এই শিক্ষক।

তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “এখনকার ব্যবস্থাটাকে যদি মেনে নেওয়া হয়, তাহলে সেটা হবে হতাশাজনক। তার পরিণতি খারাপ হবে।

“একাত্তর সালে ধরা যাক- এত বড় একটা আক্রমণ হল, আমরা কিন্তু সেটা মেনে নিই নাই। এখন যদি ব্যবস্থাটাকে যদি আমরা মেনে নিই, তাহলে সেই আত্মসমর্পণ আমাদের ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে।”

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ছয়জন শিক্ষককে আনুষ্ঠানিকভাবে সতর্ক করে দিয়েছিল, তাদের একজন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।

ব্যবস্থাটাকে বদল করতে জনগণের সমস্ত শক্তিকে একত্র হবে মন্তব্য করে সমাজতন্ত্রের আদর্শে বিশ্বাসী এই অধ্যাপক বলেন, “যারা জিনিসটাকে বোঝে, বিবেকবান ও গণতান্ত্রিক- তারা যদি মেহনতি মানুষের কাছে যায় ও তাদের সাথে যুক্ত হয় তাহলে সমাজটা পরিবর্তন হবে।

“মূলশক্তিটা সবসময় এসেছে তাদের দিক থেকে, তথাকথিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি দিয়ে কোনো কিছু হয়নি।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাকালে মাসিক পরিক্রমা (১৯৬০-৬২), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা (১৯৭২), ত্রৈমাসিক সাহিত্যপত্র (১৯৮৪) ইত্যাদি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করতেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।

এখনও তিনি ‘নতুনদিগন্ত’ নামে সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনার পাশাপাশি ‘সমাজ রূপায়ন অধ্যয়ন কেন্দ্র’ নামের একটি প্রাগ্রসর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রেখেছেন।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর প্রকাশিত গ্রন্থ তালিকায় আছে ‘ছোটদের শেক্সপিয়ার’, ‘অন্বেষণ’, ‘বুনো হাঁস’, ‘কাব্যের স্বভাব’, ‘ইনট্রোডিউসিং নজরুল ইসলাম’, ‘দ্বিতীয় ভুবন’, ‘এরিস্টোটালের কাব্য’, ‘তাকিয়ে দেখা’, ‘নিরাশ্রয় গৃহী’, ‘আরণ্যক দৃশ্যাবলি’, ‘শরৎচন্দ্র ও সামন্তবাদ’, ‘কুমুর বন্ধন’, ‘বঙ্কিমচন্দ্রের জমিদার ও কৃষক’, ‘আমার পিতার মুখ’, ‘স্বাধীনতা ও সংস্কৃতি’, ‘দরজাটা খোলা’, ‘উনিশ শতকের বাংলা পদ্যের সামাজিক ব্যাকরণ’, ‘উপর কাঠামোর ভিতরেই’, ‘হোমারের ওডেসি’, ‘আশির দশকের বাংলাদেশের সমাজ’, ‘বেকনের মৌমাছিরা’, ‘লিও টলস্টয়: অনেক প্রসঙ্গের কয়েকটি’, ‘মুখ ও মুখশ্রী’, ‘শ্রেণি, সময় ও সাহিত্য’, ‘বাঙালি কাকে বলি’, ‘স্বাধীনতার স্পৃহা’, ‘বৃত্তের ভাঙাগড়া’, ‘ভালো মানুষের জগৎ’, ‘রাষ্ট্র ও কল্পলোক’, ‘দুই যাত্রায় এক যাত্রী’, ‘উদ্যান এবং উদ্যানের বাইরে’ ইত্যাদি।

সবার শ্রদ্ধেয় এই শিক্ষক সাহিত্যকর্মে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ‘বাংলা একাডেমি স্বর্ণপদক’, ‘বিচারপতি ইব্রাহিম পুরস্কার’, ‘অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার’, ‘বেগম জেবুন্নেসা ও কাজী মাহবুবুল্লাহ ফাউন্ডেশন পুরস্কার’ সহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে বেশ কিছু পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত।

বিডিনিউজ

Comments are closed.