বাবা দিবস : আমার ভালো মানুষ আব্বা

রেখা রহমান: আমার অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী আব্বা মোহাম্মদ আবুল হাশেম মানুষ হিসেবে এত সৎ, কর্তব্যপরায়ণ, মহানুভব, ধার্মিক, রুচিশীল মানুষ যে, অনায়াসে তিনি সন্তানদের জন্য শিক্ষাগুরু আদর্শ পিতা। শিশুকাল থেকেই দেখে এসেছি আমাদের তিন ভাইবোনকে যে কঠোর নিয়মনীতি, ধৈর্য, স্নেহের পরশের মধ্যে বড় করেছেন এখন এই পরিণত বয়সে এসেও বুঝি আমরা ঠিক এতটা ধৈর্য সহ্য, নিয়মনীতি আয়ত্তে আনতে পারিনি।

সংসারে দেখে এসেছি আমাদের মমতাময়ী আম্মাকে তিনি কতটা ভালোবেসেছেন, বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করেছেন, সম্মান করেছেন এবং গুরুত্ব দিয়েছেন। সবসময় দেখেছি আম্মার সম্মানের দিকে খেয়াল রাখতে। আর আম্মাও হচ্ছেন তেমনি স্বামীর প্রতি কৃতজ্ঞতায় ভরপুর, ধার্মিক, শিক্ষিত, গুণবতী, মার্জিত, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন যোগ্য অর্ধাঙ্গিনী। আমাদের নিকট আত্মীয়স্বজন, গ্রাম সম্পর্কীয় আত্মীয়স্বজন সবসময়ই আমাদের সেই টিটিসি কোয়ার্টারের সরকারি বাসায় বেড়াতে আসতেন। আমাদেরও আত্মীয়দের বাসার যে কোনো অনুষ্ঠানে আব্বা-আম্মা নিয়ে যেতেন। আব্বা-আম্মা আমাদের আত্মীয়স্বজনদের প্রতি খুবই আন্তরিক ছিলেন, আছেন। বরঞ্চ আমরা ছোট ছিলাম বিধায় কখনো কখনো না বুঝে অভিযোগ করতাম, হয়ত চাচাত, ফুফাত, মামাত বোন, ভাইকেই আব্বা-আম্মা বেশি ভালোবাসেন। দাদি আমাদের সঙ্গেই থাকতেন। আব্বা রোজ অফিসে যাওয়ার সময় বলে যেতেন, মা অফিসে যাচ্ছি, দোয়া করবেন। দাদি পরম মমতায় আব্বার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন আর বলতেন, হ্যাঁ বাবা আল্লাহর কাছে তোমার জন্য দোয়া করি।

আমাদের তিন ভাইবোনের সবাইকে আব্বা আদর করে এবং সূরা পড়ে ফু দিয়ে যেতেন। আর বলতেন, বাসায় এসে যেন প্রত্যেকের অঙ্কগুলো করা হয়েছে দেখতে পাই বা কোনো রচনার কথা বলে বলতেন যেন মুখস্থ পাই। অফিস থেকে এসে দাদির সঙ্গে সবার আগে দেখা করতেন। আব্বা আমাদের উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে যথেষ্ট শ্রম দিয়েছেন। অঙ্কে আমি ছোটবেলা থেকে দুর্বল ছিলাম। আব্বা টিভি দেখা, গল্প করা বাদ দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমাকে অঙ্ক বুঝাতেন, শিখিয়েছেন। আর এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্টে আল্লাহ তায়ালার রহমতে আব্বার কারণেই উল্লেখযোগ্য মার্কস পেয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হই। মাস্টার্স পরীক্ষার ফাইনাল পর্যন্ত প্রতিটি পরীক্ষাই বাসায় আব্বার কাছে বহুবার দিতে হয়েছে। আমার ছোট ভাই দুটি যখন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে তখনও তাদের অনেক ড্রয়িং শিট তৈরি করাতে আব্বার উপদেশমূলক সহযোগিতা থাকত। আব্বা আমাদের তিন ভাইবোনের সব ধরনের আবদার রাখতেন।

আব্বার সীমিত আয়ের মধ্যে নিজেই যে কোনো উৎসবে মার্কেট থেকে পছন্দ করে আমাদের জামা-কাপড় কিনে দিতেন এবং তা আমাদের খুবই পছন্দ হতো। কারণ আব্বার রুচি সত্যি প্রশংসনীয়। আমি মেয়ে হয়েও ঈদে তেমন মার্কেটে যেতাম না। কিন্তু আব্বাই সে ক্ষেত্রে নিজে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে আনতেন এবং সেটি আমার তো বটেই, প্রতিবেশী আত্মীয়রাও পছন্দ করতেন। এখন অবধি নিজেই আমাদের জন্য কেনাকাটা করে সুদূর প্রবাসে পাঠান এবং আমরা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে সেইসব শাড়ি, পোশাক পরেই বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে থাকি। আব্বা রান্নায়ও পারদর্শী। আব্বার হাতের বিরিয়ানি রান্না আমাদের আত্মীয়স্বজন, বন্ধুমহলে ভীষণ জনপ্রিয়। আব্বার হাত ধরেই আমরা ভাইবোনেরা খুব ছোটবেলায় বৈশাখী মেলা, বইমেলায় গিয়েছি। আব্বা আমাদের প্রতি জন্মদিনেই একটি করে বই উপহার দিতেন, কখনো-বা ডায়েরি, কলম।

আব্বা খুব বেড়াতে পছন্দ করেন। সরকারি চাকরির কল্যাণে কয়েকটি দেশে আব্বার সম্মানের সঙ্গে ঘোরার সুযোগ হয়েছে। নিজের দেশেরও উল্লেখযোগ্য প্রত্যেকটি দর্শনীয় স্থান ঘুরে ঘুরে দেখেছেন। কখনো পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে, কখনো অফিস ট্যুরের মাধ্যমে। আব্বা আমাদের দেশের নয়নাভিরাম সেইসব দর্শনীয় স্থানে বারবার যেতে চান এবং আমাদেরও এর বিভিন্ন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক তুলে ধরে যেতে উদ্বুদ্ধ করেন। আজ আমি বৈবাহিকসূত্রে জাপান আছি। যখন কোনো সুন্দর পার্ক বা সাগর তীর বা সুন্দর করে সাজানো গোছানো কোনো স্থাপনা দেখি ভ্রমণ পিপাষু আব্বার কথাই তখন সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে। মনটাই খারাপ হয়ে যায় তখন। ইলেকট্রনিকের এই যুগে যখন ছবি বা ভিডিওতে সেসব দেখাই তখন তিনি ভীষণ মুগ্ধ হয়ে দেখেন।

আমার ভালো মানুষটি আব্বা শিশুর মতোই সরল। সকল মানুষকেই তিনি বিশ্বাস করেন, সাধ্যমতো উপকার করার চেষ্টা করেন। আব্বাকে সেই ছোটবেলা থেকে আজ অবধি তাহাজ্জুদ নামাজ ছাড়তে দেখিনি কখনো। আব্বার দিকে তাকালেই পবিত্রতায়, ভালো লাগায় মন ছুঁয়ে যায়। বিশ্ব বাবা দিবসে সাপ্তাহিক-এর মাধ্যমে আব্বাকে অনেক অনেক ভালোবাসা এবং সশ্রদ্ধ সালাম জানাচ্ছি। আব্বা আপনাকে অনেক ভালোবাসি। বুঝে না বুঝে আপনার কথার অনেক অবাধ্য হয়েছি, কষ্ট দিয়েছি, ঝগড়াও করেছি। প্লিজ আব্বা আমাকে মাফ করে দিবেন। অনেকটা সময় পর এখন বুঝতে পারছিÑ পিতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহতায়ালা সন্তুষ্টি, পিতার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহতায়ালার অসন্তুষ্টি। প্লিজ আমাকে মাফ করবেন আব্বা।

সাপ্তাহিক

Comments are closed.