উপেক্ষিত প্রবাসী সমাজ: টোকিওতে দূতাবাস ভবন উদ্বোধন

রাহমান মনি: বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে কেনা জমিতে নবনির্মিত বাংলাদেশ দূতাবাস ভবন উদ্বোধন করা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই দূতাবাস ভবন উদ্বোধন করেন। ২৮ মে শনিবার বিকেলে প্রায় দুইশ’ অতিথির উপস্থিতিতে দূতাবাস ভবন উদ্বোধন করা হলেও উপেক্ষিত হয়েছে জাপান প্রবাসী বাংলাদেশিরা। যদিও দূতাবাস তাদের কল্যাণেই।

দূতাবাস হলো প্রবাসীদের জন্য প্রবাসে নিজ দেশ। আর দেশ মাতৃকা হলো নিজ মায়ের মতোই। মায়ের কাছে যাবার, তার সান্নিধ্য পাবার অধিকার যেমন প্রতিটি শিশুরই রয়েছে, তেমনি দূতাবাসে পদচারণার অধিকার সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের রয়েছে। আর তা যদি হয় নিজস্ব জায়গায় নতুন ভবন উদ্বোধন হওয়ার মতো কোনো ঘটনা এবং স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে, তার দ্বারা, তাহলে প্রবাসীদের উৎফুল্লতায় যে ভিন্ন মাত্রা পায় তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ এটা হবে একদিন ইতিহাস। আর ইতিহাসের সাক্ষী হতে কে না চায়।

কিন্তু চাইলেই তো আর হবে না। বিশেষ করে এইসব মানে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে কোনো আয়োজনে ইচ্ছা করলেই অংশগ্রহণ করা যায় না। তাই বলে কি সবাইকে উপেক্ষা করা হবে। প্রবাসীদের মধ্যে এ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না দূতাবাসের এ আচরণ। তারা মনে করেন, নিয়মকানুন এবং স্থান সংকুলান ইত্যাদি বিষয়ে চিন্তা করলে সবাইকে কিংবা ঢালাওভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া সম্ভব না হলেও বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক সংগঠনসমূহের নেতৃবৃন্দ এবং প্রবাসী সমাজে সবসময় যাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং অবদান তাদেরকে অন্তত দূতাবাস উদ্বোধনী আয়োজনে অংশ নেয়ার সুযোগ দেয়া উচিত ছিল।

দূতাবাস উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এবং ২৯ মে হোটেল ইম্পেরিয়ালে দেয়া আওয়ামী লীগের নাগরিক সংবর্ধনা আয়োজনে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বিদেশে প্রতিটি নাগরিকই একেকজন অ্যাম্বাসেডর। আসলেও তো তাই-ই। কারণ প্রবাসে একজন নাগরিকের ভালো কাজে যেমন তার দেশের নামটি জড়িয়ে যায়, সুনাম বয়ে আনে তেমনি তার মন্দ কাজেও নিজ দেশের নামটি চলে আসে। দুর্নাম বয়ে আনে।

এই জাপানে একজন মুন্শী কে. আজাদ যেভাবে বাংলাদেশকে তুলে ধরেছেন, পরিচিতি করিয়েছেন, ১০ জন রাষ্ট্রদূতও সেভাবে বাংলাদেশের পরিচিতি আনতে পারেননি।

জাপানে যে সমস্ত জাপানিরা বাংলা ভাষায় পারদর্শী হয়ে উঠেছেন তাদের বেশিরভাগই মুন্শী কে. আজাদের কাছেই বাংলা শিখেছেন। তিনি জাইকা (ঔওঈঅ) ট্রেনিং সেন্টারে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। এখনও করছেন। জাপানের আদালত, জাপান পুলিশ বিভাগের প্রয়োজনীয় বাংলায় অনুবাদের কাজগুলো যারা করে থাকেন, তাদেরই একজন মুন্শী কে. আজাদ। ওয়াসেদা (ডঅঝঊউঅ) বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা শিখানোয় শিক্ষকতা, জাপানে বাংলাদেশি কালচারাল একাডেমি ‘স্বরলিপি’র প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আজাদ দম্পতি দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে জাপানিদের বাংলা ভাষা, বাংলা সংস্কৃতি শিখানোর কাজ করে আসছেন। এমনকি জাপানে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশিদেরও বাংলা সংস্কৃতি শিক্ষা দান করে আসছেন। এই কাজগুলো কি জাপানে বাংলাদেশকে তুলে ধরার জন্য একজন রাষ্ট্রদূতের ভূমিকার চেয়েও কোনো অংশে কম?

এই প্রসঙ্গে একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং সত্যি ঘটনা তুলে ধরছি। ১১ মার্চ ২০১১ ভূমিকম্পে বিপর্যয়ের পর কিয়োশু বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম ‘জাপানে অভিবাসীদের ভূমিকা’ শীর্ষক এক সেমিনারে। সেখানে আমারও বক্তব্য রাখার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে সিঙ্গাপুর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মিজানুর রহমান (বর্তমানে ব্র“নাই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক)ও ছিলেন। তিনিই মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছাড়াও আরও ১২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সেমিনারে অংশ নিয়ে থাকেন। ড. মিজানুর রহমানের অনুপ্রেরণায় আমার সেখানে যাওয়া।

সেমিনার শেষে এক নৈশভোজে হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক আমার কাছে বাংলা ভাষাতেই জানতে চাইলেন আমি মুন্শী কে. আজাদ স্যারকে চিনি কিনা? একজন প্রফেসর জানতে চাইছেন আজাদ স্যারকে চিনি কিনা, তাও আবার বাংলা ভাষায়। আমি ভুল শুনছি না তো! দ্বিধাদ্বন্দ্বে থেকে ভিজিটিং কার্ডটি দেখে নিলাম। না, ঠিকই উনি তো প্রফেসর। আবার বললেন, আপনি তো টোকিও থেকে এসেছেন, তাই না? আপনি আজাদ স্যারকে চেনেন কি? এবার আমি হ্যাঁ সূচক উত্তর দিয়ে বললাম, চিনি মানে, ভালোভাবেই চিনি। তিনি আমার বড় ভাই, আমার একজন অভিভাবক এবং একাধারে আমার শিক্ষকও। আপনি উনাকে চেনেন কীভাবে? জবাবে তিনি বললেন, আজাদ স্যার আমার বাংলার শিক্ষক। এখানে আমরা যারা বাংলা ভাষা শিখেছি সবাই আজাদ স্যার এবং উনার স্ত্রী রেণু আজাদের কাছ থেকেই শিখেছি।

এরপর একে একে আরও কয়েকজন শিক্ষক আজাদ স্যারের কথা বললেন, বাংলা ভাষা, বাংলা সংস্কৃতি শেখার কথা বললেন। একজন বাংলাদেশি হিসেবে সেদিনকার অনুভূতির কথা লিখে বুঝানো সম্ভব নয়। পাকিস্তানি পাসপোর্ট নিয়ে জাপান আসা মুন্শী কে. আজাদ বাংলাদেশের জন্ম হলে দেশে ফিরে যান এবং বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে আবারও জাপান আসেন। অনেক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি কোনোমতে জাপানি পাসপোর্ট গ্রহণ করেননি। বাংলাদেশি পাসপোর্ট হারাতে হবে বলে।
বিগত দিনগুলোতে বাংলাদেশ দূতাবাস কর্তৃক আয়োজিত জাতীয় দিবসগুলোতে যাদের সম্মানের সঙ্গে দাওয়াত দেয়া হতো, তাদের একজন আজাদ ভাই। সেই আজাদ ভাইকে যখন দূতাবাস উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডাকা হয়নি, একজন বাংলাদেশি হিসেবে তা মেনে নিতে কষ্ট হয়। আজাদ ভাইকে না ডাকার কারণ তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। সরকারি দলে তো নয়ই।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দূতাবাস জাপানে আওয়ামী লীগের বিবদমান দুইটি গ্রুপ থেকে (তাদের মতে গ্রুপ দুইটি হলেও জাপানে আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা গঠনতন্ত্র মোতাবেক পর্যবেক্ষণ করে একটি গ্রুপকেই সমর্থন দিয়ে গেছেন) প্রথমে ৫ জন করে মোট ১০ জনের নাম চেয়ে পাঠায়। অনেক দেন-দরবার শেষে তা ৭ জন করে মোট ১৪ জনে সমঝোতা হয়। মতান্তরে ১০ জন করে ২০ জনের কথাও প্রচলিত আছে। এছাড়াও আরও ৫/৬ জন বিভিন্ন দেন-দরবার করে অনুমতি পেতে সক্ষম হন। সংখ্যার দিক থেকে ৫, ৭ বা ১০ যাই হোক না কেন প্রশ্ন হচ্ছে দূতাবাস কোন নৈতিক অধিকার বলে আওয়ামী লীগের দুইটি গ্রুপ থেকে নাম চেয়ে পাঠাবে? তার অর্থ এই যে, তারা কি পক্ষান্তরে দুটি গ্রুপকেই সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে বা জানাচ্ছে বা স্বীকৃতি দিচ্ছে? দূতাবাস কি সেটা পারে? অপ্রিয় হলেও সত্যি যে, বাবু জীবন রঞ্জন মজুমদারদের মতো অফিসার থাকলে তারা পারে এবং দিয়ে যাচ্ছে। কারণ দলে অনুপ্রবেশকারী হাইব্রিড নেতা সংবলিত গ্রুপটিকে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে দূতাবাসই সহযোগিতা দিয়ে আসছে। দূতাবাস সংবলিত সব খবরই গ্রুপটি আগেভাগেই পেয়ে যায় যা দূতাবাসে কর্মরত অনেক জুনিয়র অফিসাররাও জানেন না।

দূতাবাস যদি আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা অন্যান্য দলগুলো থেকে এবং একই সঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক বা কর্মতৎপরতা আছে এমন কোনো সংগঠনগুলো থেকে ২ জন বা যে কোনো সংখ্যার সদস্যদের তালিকা চেয়ে পাঠাতেন, তা হলে কোনো প্রশ্ন উঠত না। কারণ দূতাবাস কোনো দলের নয়। দল সরকার গঠন করে। সরকার দেশ পরিচালনা করে। সরকার আসে, সরকার যায়। দূতাবাস কিন্তু রয়ে যায়। কারণ দূতাবাসের মালিক দেশের জনগণ। প্রবাসীরা তার অংশীদার। সেই অংশীদারদের ছাড়া দূতাবাস উদ্বোধন কতটুকু শোভা পায়? কতটুকু নৈতিকতাইবা বজায় থাকে? রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমা তার জবাব দিবেন কি?

এবার দূতাবাস উদ্বোধন নিয়ে খোদ আওয়ামী লীগাররাও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তার যথেষ্ট কারণও রয়েছে। কারণ সত্যিকার অর্থেই তারা জনগণের কল্যাণে কাজ করেন তারা যে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকেন। জনগণ উপেক্ষিত হয় তা তারা মেনে নিতে পারেন না। আবার হাইব্রিড নেতাদের খালি মাঠে গোল দেয়ার সুযোগটি দিতে চান না। জাপান আওয়ামী লীগের সভাপতি সালেহ্ মোঃ আরিফ রাষ্ট্রদূতকে আরও বেশিসংখ্যক প্রবাসীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
জানা যায়, এবার প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়ে এসেছিলেন মোট ৯৩ জন। এদের মধ্য থেকে ৭০ জনকে দূতাবাস উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়। দূতাবাস মিলনায়তনের আসন সংখ্যা ছিল ১৬০টি। উপস্থিতির সংখ্যা বেশি হওয়ায় কোনো আসন পাতা হয়নি। সবাই দাঁড়িয়ে অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। প্রায় ২০০ অতিথি অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। দূতাবাসের কর্মচারী এবং পোষ্যদের অনেককেই বাইরে থেকে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে হয়।

এখন কথা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী ৭০ জনের অংশগ্রহণ কি জরুরি ছিল? নাকি প্রবাসীদের অংশ নেয়াটা বেশি প্রয়োজন ছিল বা অধিকার ছিল।

দূতাবাসের প্রয়োজনে কিন্তু প্রবাসীরাই সাড়া দিয়ে থাকেন। ১১ মার্চ ২০১১ ভূমিকম্প, সুনামি এবং পরবর্তী বিপর্যয়ের পর দুর্গত এলাকা থেকে অর্ধশত প্রবাসীদের উদ্ধারকার্যে কিন্তু প্রবাসীরাই এগিয়ে এসেছিলেন। তারা পরিবহন খরচসহ পরবর্তী সহযোগিতা করেছিলেন। বাংলাদেশের জাতীয় দিবসগুলোতে জাপানের বিভিন্ন পত্রিকায় ঢাউস আকারে যে বিজ্ঞাপন দেয়া হয়ে থাকে তার খরচের জোগানটা কিন্তু প্রবাসী ব্যবসায়ীরা দিয়ে থাকেন। এছাড়াও দূতাবাসের অনেক আয়োজনেই প্রবাসী ব্যবসায়ী, প্রবাসী চিত্রশিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মীদের ডাক পড়ে। তাদের কাছেই ধরনা দিতে হয়। প্রবাসীরা ছাড়া দূতাবাস এইসব ক্ষেত্রে অচল প্রায়। তাহলে দূতাবাস উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রবাসীরা উপেক্ষিত রইবেন কেন?

জাপানে বর্তমানে প্রায় সাড়ে এগারো হাজারের মতো প্রবাসী রয়েছেন। তার মধ্যে প্রায় ১৬০০ মতো রয়েছেন শিক্ষার্থী (ছাত্র, উচ্চ শিক্ষা কিংবা প্রশিক্ষণরত)। এদের সবাই নিজ উদ্যোগেই জাপান এসেছেন। নিজ চেষ্টায় অনেকেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। বিশেষ করে ব্যবসা ক্ষেত্রে। আগে যে যে ব্যবসাগুলো পাকিস্তানি বা ভিন্ন কোনো দেশের নাগরিকরা লিড দিত সেই ব্যবসাগুলো এখন বাংলাদেশিদের কব্জায়। এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসমূহে বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের অভিবাসী এবং জাপানিরাও কর্মরত। প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা এসব কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন। প্রবাসীরা বাংলাদেশে রেমিটেন্স পাঠাচ্ছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা তা স্বীকারও করছেন। তবে, শুধু তা মুখে মুখে। কাজের বেলায় নিজের দিকটাই দেখছেন।

প্রধানমন্ত্রী তো একজন বিচক্ষণ ব্যক্তি। হেড অব দ্যা গভর্নমেন্ট হিসেবে সবকিছুই নাকি তার নখদর্পণে। নিজের বোনকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, অনেকটা জোর করেই তাকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন। কারণ ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর জাপান সফরকালীন সময়ের একমাত্র জীবিত সদস্য হলেন শেখ রেহানা। তাই ইতিহাসের সাক্ষী রাখার জন্য তাকে জোর করে নিয়ে এসেছিলেন। এর মাত্র এক সপ্তাহ পর সৌদি আরব সফরেও প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হন শেখ রেহানা। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিটি সফরেই সফরসঙ্গী হন তার পরিবারের একাধিক সদস্য। জানি না সবাইকে উনি জোর করে কালের সাক্ষী রাখার জন্য নেন কিনা। বিচক্ষণ আমাদের প্রধানমন্ত্রী কি দেখেছিলেন যে, দূতাবাস উদ্বোধনীতে তার ভাষায় প্রবাসী রাষ্ট্রদূতগণ কয়জন উপস্থিত ছিলেন। তার বিচক্ষণ চোখ তো এড়ানোর কথা নয়। তাহলে প্রবাসীদের ওই ২০ জনা-ই কি প্রকৃত দেশপ্রেমিক, চেতনা রক্ষাকারী, বাকি সবাই ভিন্ন মতাবলম্বী। তাহলে শতকরা কত ভাগ তার অনুসারী হলো? তার সামনে যারা ছিলেন তারা তো সবাই তার সফরসঙ্গী। দূতাবাসের অবদান বা ভূমিকাটা কি?

দূতাবাস উদ্বোধনীতে জাপানের নীতিনির্ধারকদের উপস্থিত রাখতে ব্যর্থ হয়েছে দূতাবাস। যেখানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী উপস্থিত সেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা নিদেনপক্ষে একজন মন্ত্রী পর্যায়ের কাউকে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারেনি করিৎকর্মা আমাদের দূতাবাস। জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্ট ফ্রেন্ডশিপের মহাসচিব কিংবা ভাইস মিনিস্টার বা সংসদ সদস্য এবং অনেক দেশের রাষ্ট্রদূতও প্রবাসীদের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকেন। দূতাবাসেও একই পর্যায়ে কর্তাব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

সৌদি আরব, আয়ারল্যান্ড, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, টংগো, কোস্টারিকা, নেপাল, রোয়ান্ডা, কম্বোডিয়া, জাম্বিয়া, জর্ডান, ইউএই, থাইল্যান্ড এবং মালদ্বীপ- মোট ১৪টি দেশের রাষ্ট্রদূত উপস্থিত থেকেছেন বাংলাদেশ দূতাবাস উদ্বোধনী আয়োজনে। জি-সেভেনের আউচ রিচে নাকি বিশ্ব নেতাদের পাশে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর স্থান ও সম্মান দিয়েছে অথচ জি-সেভেনের কোনো দেশের রাষ্ট্রদূত উপস্থিত ছিলেন না আমাদের দূতাবাস উদ্বোধনীতে। জি-সেভেন, ইউরোপ কিংবা নামিদামি কোনো দেশ তো দূরের কথা সার্কভুক্ত দেশের সব কটি দেশের রাষ্ট্রদূতের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারেননি আমাদের দূতাবাস। এমনকি পার্শ্ববর্তী ভারতের রাষ্ট্রদূতও উপস্থিত ছিলেন না। অথচ দাদাগিরিতে ষোলো আনা দেখাতে পারে ভারত। আর রাজাকারের তিলক নিয়েও পাকিস্তান উপস্থিত থেকেছে।

২০০৭ সালের ১৬ মে রাষ্ট্রদূত আশরাফ উদ-দৌলা চিওদা সিটি মেয়রের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের (তত্ত্বাবধায়ক সরকার) পক্ষে ১১১ কোটি ইয়েনের সমমূল্যে (প্রায় ১ কোটি ডলার) ৫ বছরমেয়াদি সুদহীন কিস্তিতে ৭১৪ বর্গমিটার আয়তনবিশিষ্ট জমিটি ক্রয়ে স্বাক্ষর করেন। এলাকা বিবেচনায় নামমাত্র মূল্য বললেও ভুল হবে না। প্রধানমন্ত্রীর অফিস, ডায়েট, মন্ত্রীপাড়া, সচিবালয় সবই পায়ে হাঁটা পথের দূরত্ব।

২০১০ সালের ২৮ নভেম্বর রাষ্ট্রদূত মজিবুর রহমান ভূঁইয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে দূতাবাস ভবন নির্মাণ কাজ ২০১২ সালে সমাপ্তির টার্গেট থাকলেও চার বছর পর তা শেষ হয় শুধু জাপানের আইনি বিধিবদ্ধ এবং বাংলাদেশের আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে। এরপর রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেনের সময় দ্রুতগতিতে এর নির্মাণ কাজ হওয়ার পথে এবং জাপান থেকে যাওয়ার প্রাক্কালে তার পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়ে চা চক্রের নামে নির্মাণাধীন ভবন পরিদর্শন করেন এবং গুটি কয়েকজনের কাছে তার ব্যাখ্যা করেন বৃহৎ গোষ্ঠীকে বাইরে রেখে।

দূতাবাস ভবন ডিজাইনের সঙ্গে স্থপতি মাসুম ইকবাল এবং তার প্রতিষ্ঠান জড়িত থাকলেও কোনো অজ্ঞাত কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংশ্লিষ্ট প্রাক্তন তিনজন রাষ্ট্রদূত এবং স্থপতি মাসুম ইকবালের নামটি ঘুণাক্ষরেও প্রকাশ করা হয়নি।

প্রবাসীদের অনেকেই মনে করেন দূতাবাসের শাক দিয়ে মাছ ঢাকার কাজ প্রবাসীরা হয়ত প্রকাশ করে দিবে, কিংবা আরও কিছু অপ্রিয় সত্য বেরিয়ে আসবে তাই ইচ্ছাকৃতভাবে দূতাবাস প্রবাসী সমাজকে উপেক্ষা করেছে। কিন্তু তাতে কাজ হবে না। ইতিহাসে স্বস্থানে, স্বমহিমায় সবাই একদিন উদ্ভাসিত হবেনই এবং প্রবাসীদের উপেক্ষার খেসারত দূতাবাসকেই বহন করতে হবে।

rahmanmoni@gmail.com
সাপ্তাহিক

Comments are closed.