মহানুভবতা: ব.ম শামীম

আজ পহেলা বৈশাখ। রাস্তা দিয়ে বের হতেই চারদিকে কেমন ঢাক ঢোলের শব্দ। একেইতো প্রচন্ড দাবদাহ। তারপরে এই ঢাক ঢোলের শব্দগুলো যেন পরিবেশটাকে আরো বেশি রুদ্ধ করে তুলছে। গ্যালাইয়া বা বিভন্নস্থানে বৈশাখী মেলা চলছে পূর্ণদমে। মেলা হতে ফেরার পথে ছেলে-মেয়েরা তাদের কিনে নিয়ে যাওয়া বাঁশি বাজিয়ে জানান দিচ্ছে তাদের মেলায় আগমনের বার্তাটা।

চারদিকে প্রকৃতিতেও একটি আনন্দভাব। উচ্ছাসিত মানুষদের সাথে সাথে প্রাকৃতিও কেমন উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছে। এমন দিনে ঘরে বসে থাকা দায়। তাই মটরসাইকেল নিয়ে বিনোদনের জন্য আশেপাশের সবচেয়ে ভালোস্থানটির খুজেঁ আমরা ৩ জন বিভিন্নস্থানে ঘুরতে লাগলাম। ঘুরতে ঘুরতে বেতকা ব্রীজের উপরে গিয়ে থামলাম। ধলেস্বরীর শাখা নদীর উপর নির্মিত লম্বা ব্রীজটির উপর অসংখ্য মানুষের ভিড়। দক্ষিনা বাতাসের হিমশিম বয়ে যাওয়া আর রুপালি চাঁদের সাথে ব্রীজের নিচের পানির সাথে মিতালীর ঝলমলে রুপ মিলে চারদিকে অপূর্ব এক পরিবেশ।

যদিও নিস্তব্ধ নিরবতা নেই। মানুষের কোলাহলে মুখরিত চারদিক মাঝে মধ্যে দু-একটি মটর-সাইকেলের অকারনে উচ্ছস্বরে হর্ণ আর উচ্চ গতির বিকট শব্দ প্রকৃতি প্রেমিদের বিরক্ত করে তুললেও পরিবেশটা যে বিণোদনের জন্য এক অপূর্বস্থান এটা প্রকৃতি প্রেমিদের গভীর রাত অব্দি অবস্থানই প্রমান করে দিচ্ছে। ব্রীজের পাশে মটরসাইকেল রেখে তার পাশ দিয়ে হাটছি আমরা ৩ জন।

একটু এগুতেই দেখি ১২-১৫টা মটর-সাইকেল একস্থানে জড়ো হয়ে রয়েছে। পাশেই পুলিশ দাড়িয়ে আছে। থানা এসআই শাখাওয়াত হোসেনের কাছে অনেকে তাদের মটরসাইকেল ছেড়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছে। আমি সামনে গিয়ে দেখি শাখাওয়াত সাহেব তার মটরসাইকেলে হেলান দিয়ে বসে আছে। চেহারা দেখলেই বুঝা যায় চেহারার মধ্যে একটি ইননোসেন্ট ভাব। ওই ভদ্রলোকের সঠিক বয়স কত জানানেই আমার।

তবে ওই ভদ্রলোককে যখনই দেখি তার দৃষ্টির আগোচরে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি তার মুখের দিকে। তার চেহারাটা ১৭-১৮ বছরের বালকদের মতো উদয়মান কৈশরের মতো রুপ তার। কথা বার্তাও বলেন খুব ধীর গতিতে আস্তে আস্তে। সামনে যেতেই ভাই এইযে, মটরসাইকেল গুলো ওরা এই ব্রীজের উপর বেপোরোয়াভাবে চালাচ্ছে এবং মেয়েগুলো দেখলেই গতিবেগ বাড়িয়ে দিয়ে জোড়ে হর্ণ বাজাচ্ছে। ওদের যন্ত্রনায় ব্রীজের উপর দিয়ে ঠিকমতো মানুষ হাটতে পারছেনা।

আমি বললাম ঠিক আছে মটরসাইকেল আটক করেছেন একদম ঠিক কাজটি করেছেন। এর মধ্যেই আরো বেপরোয়া গতিতে মটরসাইকেল চালিয়ে চালকরা আসছে আর তাদের থামিয়ে চাবি নিয়ে মটরসাইকেল এক পাশে জড়ো করছেন শাখাওয়াত সাহেব। আমি থাকলে ভদ্রলোকের কাজের ক্ষতি হবে ভেবে তার কাছ হতে একটু দুরে চলে আসলাম। যেই একটু দুরে এসে দারলাম ৩ যুবক না কৈশর হবে অথব যুবক কিংবা কৈশরের মাঝি-মাঝি বয়সের ৩জন আমার কাছে এসে ভাই আমাদের বাসা কেরানিগঞ্জ এই ব্রীজের উপর ঘুরতে এসেছিলাম পুলিশ আমাদের মটরসাইলেটা আটক করেছে আপনি একটু বলে দেননা আমাদের মটরসাইকেলটা যাতে ছেড়ে দেয়। স্যার একটু বলেন না আমরা সবাই কলেজে পরি একটু ঘুরতে এসেছি আপনে বললে ছেড়ে দিবে একটু বলেননা। স্যার আমরা যদি আপনার ভাই হইতাম ছোট ভাই ভূল করলে তার একটু উপকার করতেন না বলেন না ভাই।

তাদের আকুতি মিনতি শুনে আমি বললাম তোমরা যেভাবে আমার কাছে আকুতি মিনতি করছো ওইখানে যে পুলিশ অফিসার আছে সে অতিসয় ভদ্রলোক তার কাছে গিয়ে বলো সে ছেড়ে দিবে। বললো না স্যার আমরা তার কাছে অনেকবার বলেছি সে ছাড়ছেনা আপনি একটু বলেন না। ছেলেগুলো কখনো স্যার কখনো ভাই সম্বোধন করছে আমায় কখনো হাত কখনো আমার পা ছুয়ে বলছে ভাই আমরা আপনার ছোট ভাই হলে আমাদের ক্ষমা করতেন না। আমাদের বাসা কেরণীগঞ্জ অনেকদুরে আমাদের একটু ছেড়ে দিতে বলেননা। দেখলাম ছেলেগুলো নাছোরবান্দা তারা আমাকে কিছুতেই ছাড়বেনা। তাই পুলিশ অফিসার শাখাওয়াত ভাইকে বললাম ওরা কলেজের ছাত্র। বলছে ওদের ভূল হয়ে গেছে জীবনে আর ওভাবে বেপোরোয়া হয়ে ৩ জন নিয়ে মটরসাইকেল চালাবেনা।

প্রতিজ্ঞা করছে ওদের এবারের মতো ক্ষমা করে দেন। শাখাওয়াত ভাই কনেষ্টোবল ইসহাক সাহেবকে বললো এই ছেলেদের মটোরসাইকেলের চাবিটা দিয়ে দেন। ইসহাক সাহেব পকেট হতে অনেকগুলো চাবি বের করে কোনটা আপনাদের চাবি বেছে নেন। ছেলেগুলো বললো ওই যে কালো পালছার ওই মটরসাইকেলটি আমাদের আর চাবি হলো এটি বলেই চাবিটি নিয়ে চলে গেলো ওরা। তখন অন্য ২ যুবক আমায় ধরে বসলো ভাই আমাদের মটরসাইকেলটা একটু ছেড়ে দিতে বলেন না । অন্য আরো কয়েক যুবক এগিয়ে আসছে আমার দিকে আমি চুপে ওই স্থান ত্যাগ করে দ্রুত অন্যস্থানে চলে অসলাম।

এসে একটু হাফ ছেড়ে দম নিচ্ছি দেখি ২ যুবক আমার দুই পাশে দাড়িয়ে ভাই আপনে বললে ছেড়ে দিবো টাকা পয়সা কিছু লাগলেও দিমু। আপনে একটু কইয়া দেননা আমাদের মটরসাইকেলটি যাতে ছেড়ে দেয়। কি যন্ত্রনা দু-পাশে দুই জন দাড়িয়ে। আমি বললাম এইবার তোমাদের জন্য গেলে পুলিশ আমায় বেধে রাখবো। ওরা বললো না স্যার পুলিশ আপনায় কতো সন্মান করলো আপনি একটু মুখে বললেই ছেড়ে দিবো আপনি শুধু একটু বলেন যদি না ছেড়ে দেয় তাহলে আমাদের আর কোন আপত্তি নেই।

কি যন্ত্রনা কি করি দুর হতে লক্ষ্য করছি অন্য যুবকরাও আমায় খুজঁছে রিকুয়েষ্ট করানোর জন্য। আমি ওই যুবক ২ জনকে বললাম দেখো আমি আমার সঙ্গীদের হারিয়ে ফেলেছি তাদের খুজেঁ পাচ্ছিনা আমি এমনিই বিরক্ত। তাদের খুজে নেই বলে দাড়ানো স্থান হতে উঠে অন্যত্র যাওয়ার উদ্যেশে হাটতে শুরু করলাম। কিন্তু যুবকগুলো নাছোরবান্দা তারাও আমার সাথে সাথে হাটতে শুরু করলো । আবশেষে আমার সাথের সঙ্গী রাসেল ও সাকিব বললো ভাই এই যে আমরা এখানে বলে ওরা ২ জন এগিয়ে আসলো আমার দিকে। আমি ওদের দেখতে পেয়ে খুশির চেয়ে বেজায় নিরাশ হলাম।

২ যুবককে ফাকি দেওয়ার জন্য সঙ্গীদের খোঁজার বাহানা করে ২ যুবকের অন্তরাল হতে চাইলাম আর ওরা কিনা। ওরা ২ জন এগিয়ে আসার পর যুবক ২টি বলছে ভাই আপনার লোকতে পেয়ে গেছেন এবার চলেন না। একটু বলে দেননা। রাসেল বললো কি হয়েছে ভাই। আমি বললাম ওদের মটরসাইকেল পুলিশ আটক করেছে একটু আগে একটা ছাড়িয়ে দিয়ে আসলাম আবার ওরা দেখোতো। রাসেল একটু ধমকের সুরে বললো বেপোরোয়া গাড়ি চালাতে পারো আর পুলিশকে বুঝিয়ে গাড়িটা নিয়ে যেতে পারো না। যাও পুলিশকে বুঝিয়ে নিয়ে যাও। না ওরা কিছুতেই যাওয়ার পাত্র নয় আবার কাকুতি মিনতি করতে শুরু করলো। আমি বললাম রাসেল একটু দেখোতো ওই ২ যুবককে বললাম তোমরা রাসেলের সাথে যাও সে ছাড়িয়ে দিবে।

না ওরা এটা মানতেও নারাজ ওদের ধারনা রাসেলের কথায় তাদের মটরসাইকেল ছাড়বেনা পুলিশ। এবার আমার হাত ধরে চলেন স্যার আপনারই যেতে হবে। আমি বললাম বোকা ছেলেরা ওরা মানে রাসেল আর সাকিব সাংবাদিক ওদের নিয়ে যাও ছেড়ে দিবে। সাংবাদিকের কথা শুনে ছেলে দুটি মনে হয় একটু ভরসা পেলো তারপর রাসেল ও সাকিব গিয়ে মটরসাইকেলটি পুলিশকে বলে ছাড়িয়ে দিয়ে আসতেই দেখি অন্য কয়েক যুবক অন্ধকারে আমাকে খুজছে আর একজন অন্য জনকে বলছে ওই ভাইটি তো এখানেই ছিলো। কোথায় গেলো যুবকগুলো যে আমায় খুঁজছে আমি তা বুঝতে পেরে একেবারে ব্রীজের রেলিং ধরে দাড়িয়ে পানির দিকে তাকিয়ে আছি। যুবকগুরো আমায় খুজতে খুজতে আমার পাশ দিয়ে অন্যত্র চলে গেলো।

একটু পরেই রাসেল আর সাকিব ফিরে এলো আমার কাছে। আমি বললাম চুপচাপ মটরসাইকেলে ওঠো। বললো কেন ভাই এখানে কত সুন্দর পরিবেশ আমরা এখানে গভীর রাত পর্যন্ত থাকবো। এমন পরিবেশ পাওয়া খুব ভাগ্যের বিষয়। আমি বললাম আর একটি কথাও বল না সমস্যা আছে চুপচাপ মটরসাইকেলের পিছনে বসো বলে আমি মটরসাইকেলে উঠে ইষ্ট্যার্ট দিলাম আর ওরা ২জন আমার পেছেনো ভিতু হয়ে বসে রইলো আর বড় ধরনের কোন আক্রমনের ভয়ের আশঙ্কায় চুপ করে রইলো। কিছুদুর যাওয়ার পর আমরা এভাবে চলে এলাম কেন জানতে চাইলে আমি বললাম ওযে আটকে রাখা মটরসাইকেলের অধিপতিগুলো তোমাদের আমায় তন্নতন্ন করে খুজছে। সাকিব কেন ভাইয়া? ওই যে কাজটি করে আসলে সেটা করার জন্য।

রাসেল তার মানে রিকুইষ্ট করার জন্য আর আমরা সেই ভয়ে চোরের মতো এভাবে পালিয়ে আসলাম বলেই ওরা দু-জন আশ্চার্যনিত হয়ে হেসে উঠলো। সাথে আমিও হেসে উঠলাম। সাকিব ভাইয়া যাই বলেন এতো সুন্দর একটা পরিবেশ ছেড়ে আমাদের এভাবে চলে আসা ঠিক হয়নাই। চলেননা আবার ওইখানে ফিরে যাই। আমি বললাম গেলেই আবার তোমাদের ঘেরাও করে ধরবে ওরা মটরসাইকেল ছাড়ানোর জন্য । রাসেল তাদের ভয়ে চোরের মতো পালিয়ে যাবো আমরা একটু বিণোদন করতে পারবো না। সাকিব ভাই সব স্থানে মহানুভবতা করা যায়না আজকে বুঝলাম।

রাসেল পুলিশকে এ জন্যই মাঝে মধ্যে কাঠোর হতে হয় । তারাও যদি আমাদের মতো মহানুভবতা দেখাতো তাহলে ওই মটরসাইকেল ওয়ালাদের যন্ত্রনায় ওই ব্রীজে কেউ ঠিকমতো বিণোদন করতে পারতোনা। আমি ভাবলাম কথাটা ঠিকই সবস্থানে মহানুভবতা ঠিক নয়। একজনের উপকার করতে গিয়ে মহনুভবতা দেখিয়ে দশজনের ক্ষতি না করাই ভালো। তাই এরপরে মহানুভবতা দেখানোর আগে চিন্তা করবো এই মহনুভবতার কারনে অন্য কারো ক্ষতি হবে কিনা। ভাবতে ভাবতে মটরসাইকেল চালিয়ে চলে আসলাম নিজ গন্তব্যের দিকে।

Comments are closed.