থেমে থেমে ভূমিকম্পে কেঁপে উঠছে জাপান

রাহমান মনি: দফায় দফায় ভূমিকম্পে কেঁপে উঠছে জাপান। গত ১৪ এপ্রিল বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ৯টার দিকে জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কুমামোতো ও কিয়োশু অঞ্চলে ৬ দশমিক ৫ মাত্রার প্রথম দফায় ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এর ফলে ব্যাপক জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হয়। সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বৃহস্পতিবার ভূমিকম্পে ১৫ জন নিহত, ১ হাজার জন আহত এবং শত শত ভবন ধসের খবর পাওয়া গেছে। শহরটিতে বিদ্যুতের সংযোগ এবং পানির লাইন বন্ধ রাখা হয়েছে, তবে এ ঘটনায় কোনো সুনামির সতর্কতা জারি করা হয়নি।

জাপানি স্কেলে ৭ মাত্রায় ভূমিকম্পের পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে থেমে থেমে দেড় শতাধিক আফটার শক রেকর্ড করার খবর পাওয়া গেছে ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া সূত্রে। হাজার হাজার লোক খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছেন। আফটার শকের ভয়েই অনেকে আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছেন, কেউবা আবার নিরাপদ স্থানে গাড়ির ভেতর রাত কাটাচ্ছেন বলে টেলিভিশন নিউজে দেখা যায়।

বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৬টা ২৬ মিনিটে প্রথম ৬.১ মাত্রার ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এরপর ৬টা ৪২ মিনিটে ৪.৮ মাত্রায় আফটার শক ভূমিকম্প হয়। এরপর আবারও ৭টা ৭ মিনিটে ৫.৫ মাত্রার, ৭টা ২২ মিনিটে ৪.৮ মাত্রার, ৭টা ৩৮ মিনিটে ৪.৮ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। ইউএসজিএস জরিপে নির্ধারিত ৬.৪ মাত্রার ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ইউকি শহর থেকে মাত্র সাত কিলোমিটার দূরে এবং গভীর সমুদ্রের ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে।

প্রথম দফায় ভূমিকম্পে আঘাত হানার পর এর ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণসহ সামাল দেয়ার পূর্বেই মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে প্রায় একই এলাকায় অর্থাৎ কুমামোতো প্রদেশের ইউকি শহরের মাত্র ১৩ কিলোমিটার দূরে এবং ভূ-পৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ দফতর ইউএসজিএস এর তথ্য অনুযায়ী ১৬ এপ্রিল শনিবার প্রথম প্রহরে রাত ১টা ২৫ মিনিটে জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কুমামোতো প্রদেশে আঘাত হানা ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৭-এর পর মাত্র ২০ মিনিটের ব্যবধানে এই অঞ্চলে ৫.৮ এবং ৫.৭ মাত্রার আরও দুটি ভূকম্পন অনুভূত হয়।

প্রায় ২৭ ঘণ্টার ব্যবধানে এবং এর মধ্যে কয়েক দফার এসব ভূমিকম্পে মাত্র ৫ বছর আগে ঘটে যাওয়া ২০১১ সালের মার্চের ভয়াবহতার পর বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে জরুরি সভা ডেকে প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থেকে সব ধরনের সহায়তা প্রদানের জন্য প্রস্তুত থাকতে নির্দেশনা দিয়েছেন। বিশেষ করে বৈরী আবহাওয়া (বৃষ্টি, ঝড়ো বাতাস এবং শীতের তীব্রতা) মোকাবিলার জনগণের পাশে থাকার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন, এবং জনগণকে আতঙ্কগ্রস্ত না হয়ে দুর্যোগ মোকাবিলা করতে অনুরোধ করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে ২০১১ সালের ভূমিকম্পের আফটার শক হিসেবেই বা এর ধারাবাহিকতা এবং আরও বেশ কিছুদিন অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

১৬ এপ্রিল গভীর রাতে ভূমিকম্পের পর ১ মিটার উঁচু সুনামির সতর্কতা জারি করা হয় এবং কিছুক্ষণ পরই তা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।

২০১১ বিপর্যয়ের পর একমাত্র চালু থাকা পরমাণু চুল্লি এই প্রদেশেই অবস্থিত। এখনও পর্যন্ত চুল্লি ২টিতে কোনো ক্ষয়ক্ষতির কথা জানা যায়নি। কর্মকর্তারা এই প্লান্টের দুটির চুিল্লর কোনটিতেই কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা যায়নি এবং কাজেও কোনো বিঘœ সৃষ্টি হয়নি।

ভূমিকম্পের সময় জাপান বুলেট ট্রেনের (সিনকান সেন) একটি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়। তবে সেই সময় ট্রেনের ভেতর কোনো যাত্রী না থাকায় কেউ হতাহত হননি।
বেশ কিছু এলাকায় মহাসড়কে ফাটল কিংবা ভেঙে অথবা দেবে গেছে বিধায় স্থানীয় প্রশাসন বেশ কিছু মহাসড়ক-এর কোনো কোনো অংশ এবং স্থানীয় সড়ক বন্ধ কিংবা চলাচল সীমিত করে দেয়। এর ফলে তাৎক্ষণিক উদ্ধারকার্য পরিচালনা কিংবা খোঁজ-খবর নেয়া দুরূহ হয়ে গেছে।

কিয়োশু অঞ্চলের কুমামোতো বিমানবন্দর রানওয়ে পরীক্ষার জন্য বিমান চলাচলে বিঘিœত হয়। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে পুরো এলাকা।
অল্প সময়ের ব্যবধানে একই এলাকায় কয়েক দফায় এসব ভূমিকম্প হওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কুমামোতো প্রিফেকচারের মাইশি এলাকা। বিদ্যুৎ গ্যাস, ও পানি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে ওই এলাকায়। ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বিপর্যয় ঘটেছে।

স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার সকালের মধ্যে প্রায় ৪০ হাজার বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। তাদেরকে স্থানীয় স্কুল, কিন্ডারগার্টেন কিংবা উপাসনালয়গুলোতে আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে সেখানে স্থান দেয়া হয়েছে এবং প্রশাসন থেকে সব ধরনের সহায়তা দেয়া হচ্ছে।
ভূমিকম্প পরবর্তী উদ্ধার তৎপরতার জন্য নিরাপত্তা বাহিনী সেলফ ডিফেন্স ফোর্স (এসডিএফ) এর এক হাজার সাত জন, ১ হাজার ৯২০ পুলিশ কর্মকর্তা এবং ২ হাজার ৯৩৭ জন অগ্নিনিরাপত্তা কর্মী স্থানীয়ভাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন ভলান্টির সার্ভিস কর্মীগণ এবং অনেকেই আবার স্বেচ্ছায় এবং স্বপ্রণোদিত হয়ে স্বেচ্ছাশ্রয় দিয়ে যাচ্ছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকেই স্বউদ্যোগে নিজ নিজ নিরাপদ স্থানে চলে গেছেন বা যাচ্ছেন।

ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনও নির্ধারণ করা হয়নি। চাওয়া হয়নি কোনো সহায়তা। জাপান সরকার, স্থানীয় প্রশাসন এবং ভলান্টিয়ায় সংগঠনসমূহ নিরলসভাবে কাজ করছেন। ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে পুনঃগঠনে তাদের এই কাজে শামিল হয়েছে অভিবাসীরাও।

১৯৯৪ সালের কোবে ভূমিকম্প, ২০১১ সালের বিপর্যয়ে জাপান ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ধ্বংস করে দেয়া হিরোশিমা কিংবা নাগাসাকি দেখে আর বুঝার উপায় নেই যে, মানব সভ্যতার চরম বিপর্যয় ঘটানো হয়েছিল এই শহর দুটিতে। ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে জাপান। এবারও হবে। তাদের হতেই হবে। কারণ সামনে রয়েছে তাদের ২০১৯ সালে বিশ্ব রাগবি এবং ২০২০ সালের অলিম্পিক এবং প্যারা অলিম্পিকের মতো বড় বড় আসর।

জাপান প্রবাসী বাংলাদেশিরাও পিছিয়ে নেই জাপান পুনঃগঠন কাজে অংশগ্রহণে। যার যার তরফ থেকে সাধ্যমতো কাজ করে যাচ্ছেন প্রবাসীরা। অন্যদেশের অভিবাসীদের থেকে এগিয়ে।

১৩ এপ্রিল, মিয়ানমার, ভারত, বাংলাদেশে ৭ মাত্রার (৬.৯) ভূমিকম্প, ১৪ এপ্রিল কুমামোতো’তে ৭ মাত্রায় ভূমিকম্প, ১৫ এপ্রিল ইন্দোনেশিয়ায় ৬.৫ মাত্রায় এবং ১৬ এপ্রিল জাপানের কুমামোতে ৭.৩ মাত্রায় ভূমিকম্প যে বড় কোনো দুর্যোগের পূর্বাভাস তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

সাপ্তাহিক

Comments are closed.