আশরাফের মুঠোয় শিমুলিয়া ঘাট

মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মেদেনীমণ্ডল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা আশরাফ হোসেনের হাতের মুঠোয় শিমুলিয়া ঘাট। ঘাটের ইজারাদার আশরাফ প্রতি বছর অবৈধভাবে হাতিয়ে নিচ্ছেন ১০ কোটি টাকা। শুধু ঘাটেই নয়, লৌহজং উপজেলায় আশরাফ সিন্ডিকেটের একচেটিয়া আধিপত্য। ঠিকাদারি ছাড়াও অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, নৌপথ এবং সড়কপথে চাঁদাবাজি করে বিপুল টাকার মালিক তিনি। সাত বছর আগেও তিনি এলাকায় রিকশায় চলাচল করতেন, সাধারণ মানের জীবনযাপন করতেন। এখন চলেন দামি গাড়িতে। পরিবারের জন্য রয়েছে আরও তিনটি গাড়ি। মেদেনীমণ্ডল ইউনিয়নের জশলদিয়া গ্রামের বাড়িতে টিনের ঘরের জায়গায় নির্মাণ করা হয়েছে ২ কোটি টাকায় বিলাসবহুল বাড়ি। চলাচলের সময় তার গাড়ির আগে এবং পেছনে থাকে ২৫-৩০টি মোটরসাইকেল। গতকাল বুধবার লৌহজং উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার সড়ক যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিমুলিয়া-কাওড়াকান্দি নৌরুট। লৌহজং উপজেলার শিমুলিয়া ঘাট থেকে প্রতিদিন ১০-১২ হাজার মানুষ পদ্মা পাড় হয়। তাদের চলাচলের অন্যতম মাধ্যম সি-বোট ঘাট। সি-বোট ঘাট জেলা পরিষদের অধীনে অতীতে ইজারার মাধ্যমে পরিচালিত হলেও এখন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। জেলা পরিষদ সর্বশেষ দরপত্রের মাধ্যমে ইজারা থেকে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করলেও বিআইডবি্লউটিএ পাচ্ছে বছরে মাত্র কোটি টাকা।

সমকালের অনুসন্ধানে জানা গেছে, সি-বোটে পদ্মা পার হতে দরপত্র অনুযায়ী জনপ্রতি ১২০ টাকা নেওয়ার কথা থাকলেও নেওয়া হচ্ছে ১৫০-১৬০ টাকা। সন্ধ্যার পর সি-বোট চালানোয় নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও জনপ্রতি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় প্রতিদিন পারাপার করা হচ্ছে। ইজারার শর্ত অনুযায়ী ভাড়ার তালিকা বোটঘাটে টানিয়ে দেওয়া কিংবা টিকিটের গায়ে উল্লেখ থাকার কথা থাকলেও এ শর্ত মানা হচ্ছে না। যাত্রী ওঠানো এবং নামানোর জন্য ঘাটে নেই সুব্যবস্থা। ঝুঁকি নিয়েই উঠতে হচ্ছে যাত্রীদের। রাতে সি-বোটে পার হতে গিয়ে ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে যাত্রীর প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে।

একেকটি মাঝারি সি-বোটে ১২-১৪ জন যাত্রী নেওয়ার কথা থাকলেও গাদাগাদি করে নেওয়া হচ্ছে ১৮-২০ জন। পারাপারের সময় প্রতিজনের লাইফ জ্যাকেট গায়ে দেওয়ার নিয়ম থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। বিশেষ করে নারী ও শিশু যাত্রীদের ঝুঁকি নিয়ে পদ্মা পাড়ি দিতে হচ্ছে। আর সি-বোট চালকদের নেই কোনো সনদ কিংবা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। অতিরিক্ত যাত্রী বহন করায় প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা।

ঘাট নিয়ন্ত্রণকারী মেদেনীমণ্ডল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আশরাফ হোসেন সম্প্রতি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হয়েছেন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান। সি-বোট ঘাটে নানা দুর্নীতির ক্ষেত্রে ইজারাদার আশরাফ হোসেনের অন্যমত সহযোগী শিমুলিয়া নৌবন্দরের কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিন।

আশরাফ পরিবারের নিয়ন্ত্রণে সি-বোট : শিমুলিয়া ঘাটে আশরাফ পরিবারের বাইরে কম লোকেরই সি-বোট রয়েছে। মাওয়া-কাওড়াকান্দি রুটে আগে অনেকের সি-বোট চলাচল করত। তাদের বেশিরভাগই এখন শিমুুলিয়া ঘাটে সি-বোট চালাতে পারছেন না। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে সি-বোট কম দামে আশরাফের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঘাটের দেড় শতাধিক বোটের মধ্যে ইজারাদার আশরাফ হোসেন ও তার পরিবারের সদস্যদের রয়েছে শতাধিক। শুধু আশরাফের রয়েছে ২০টির বেশি সি-বোট। আশরাফের জামাতা শেখ সুমন ও জামাতার বড় ভাই শেখ জামানের আছে ১৫টি। আশরাফের শ্যালক ডিজিটাল মতিনের আছে ১২টি। এ ছাড়া নামে-বেনামে রয়েছে কয়েক আত্মীয়ের অনেক সি-বোট।

ঘাটের ইজারাদার আশরাফ হলেও ঘাট থেকে প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকার বেশি চাঁদা নেন নৌবন্দর কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিনের নামে। তার সামনে সি-বোট ঘাটে অনেক অনিয়ম হলেও তিনি মুখবুজে থাকেন। এক কর্মচারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ঘাটে যত অনিয়ম হয় সবকিছু দেখলেও কোনো ব্যবস্থা নেন না মহিউদ্দিন। কারণ ইজারাদারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেন তিনি। বোটের যাত্রী মাদারীপুরের বাসিন্দা করিম হাওলাদার বলেন, ‘১৬০ টাকায় টিকিট কিনেছি, কিন্তু টিকিটের গায়ে কোনো মূল্য লেখা নেই। আর ঘাটের কোথাও মূল্য তালিকাও টানানো নেই।

আরেক যাত্রী গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার বাসিন্দা নিয়ামত উল্লাহ বলেন, ‘বোটে ১২ জনের জায়গায় ১৮ জন ওঠায়, কিছু বললে খারাপ ব্যবহার করে।’ একই জেলার সোলায়মান মিয়া বলেন, ‘বৃহস্পতিবার টিকিটের দাম হয়ে যায় দ্বিগুণ। কেন দাম বাড়ানো হয়_ সেটা জানতে চাইলে টিকিট বিক্রি করে না।’ ঘাটে অনিয়ম প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নৌবন্দর কর্মকর্তা মহিউদ্দিন সমকালকে বলেন, ‘আমি আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য নই। আপনি আমার অধিদপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলুন।’ একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘আপনি যা পারেন লেখেন। আপনার মতো সাংবাদিকরা অনেক লিখেছে, তাতে আমার কিছুই যায়-আসে না।’ জানা গেছে, ঢাকার মিরপুরসহ বিভিন্ন স্থানে আশরাফের বাড়ি রয়েছে। লৌহজংয়ের জশলদিয়া গ্রামে অনেক জমি ক্রয় করেছেন আশরাফ। ঢাকা-মাওয়া রুটে চলাচলরত ইলিশ পরিবহনে রয়েছে তার বেশ কয়েকটি বাস।

আশরাফ বাহিনীর মুঠোয় শিমুলিয়া ঘাট : মাদক ব্যবসায়ী রনি, আশরাফ হোসেনের মেয়ের জামাই সুমন, ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ জামান, হারুন, রিপন, সালাউদ্দিন, সিরাজ মেম্বার, মকবুল, মিনজুসহ অর্ধশতাধিক সদস্য রয়েছে আশরাফ বাহিনীতে। এই বাহিনীর সদস্যরা শিমুলিয়া ঘাটের চাঁদাবাজি, মেদেনীমণ্ডল ইউনিয়নসহ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে মাদক সরবরাহ, মাদক বিক্রি, ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও যাত্রী হয়রানি করে। তাদের মতের বিরুদ্ধে গেলে হামলার শিকার হতে হয় সাধারণ মানুষকে।

মেদেনীমণ্ডল ইউনিয়নে গিয়ে আশরাফ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কুমারভোগ গ্রামের ষাটোর্ধ্ব আবদুল হামিদ বলেন, ‘সাত বছর আগেও রিকশায় চলাচল করতেন আশরাফ, এখন দামি গাড়ি হাঁকান। সি-বোট ঘাট তার কপাল খুইল্যা দিছে। সারাজীবন আশরাফ হোসেন হিসেবেই জানলাম। এখন নামের পরে খান উপাধিও ব্যবহার করছেন।’ আশরাফের গ্রামের একাধিক বাসিন্দা সমকালকে জানান, আশরাফ জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি ইকবাল হোসেনের অন্যতম ক্যাডার ছিলেন; পরে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। তিনি ঢাকার হারুন নামের একজনের সঙ্গে মিলে নিজ বাড়িতে চোরাই বিদ্যুতের তার গলিয়ে বিক্রি করতেন। সে ব্যবসা করতে গিয়ে তিনি মামলার আসামিও হয়েছেন। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে যৌথ বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তার জীবন পাল্টাতে শুরু করে।

অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে আশরাফ হোসেনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। মোবাইলে মেসেজ পাঠালেও তিনি জবাব দেননি। পরে তার শ্যালক ডিজিটাল মতিনের কাছে ফোন করা হলে তিনিও রিসিভ করেননি। আশরাফ হোসেনের মেয়ের জামাই শেখ সুমনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমার শ্বশুরের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে সেগুলো মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন। বোটে যাত্রীর চাপ বেশি থাকলে অনেক সময় যাত্রীরাই বেশি টাকা দিয়ে যায়। জোর করে বেশি নেওয়া হয় না। প্রতিপক্ষ তার সম্মান নষ্ট করতে নানা অভিযোগ করছে।’

হায়দার আলী ও কাজী সাবি্বর আহামেদ দীপু
সমকাল
রিপোর্ট তৈরিতে আরও সহযোগিতা করেছেন ইমতিয়াজ উদ্দিন বাবুল ও শফিকুল ইসলাম

Comments are closed.