পঞ্চসার: তিন শীর্ষ নেতার প্রেস্টিজ লড়াইয়ে সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে!

মোজাম্মেল হোসেন সজল: ব্যাপক রক্তপাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে শহর লাগোয়া পঞ্চসার ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির তিন শীর্ষ নেতার দৃস্টি এখন এ ইউনিয়নে। রাজনীতির সব ধরণের শক্তি প্রয়োগে নেমেছেন শীর্ষ নেতারা। তিন নেতার তিন প্রার্থী। ইতোমধ্যে সহিংসতায় স্থানীয় সংসদ সদস্যের আপন ভাতিজা, জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকসহ ৬ জনকে বেধড়ক পিটিয়ে আহত করা হয়েছে। তারা এখন ঢাকায় চিকিৎসা নিচ্ছেন।

ঘটনাস্থল থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় দুইটি পিস্তল ও ৪ রাউন্ড গুলি উদ্ধার দেখিয়েছে পুলিশ। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মোহাম্মদ মহিউদ্দিন ও তার ছেলে মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার মেয়র ফয়সাল বিপ্লব সমর্থক শিল্পপতি গোলাম মোস্তফা। তিনি আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী। তিনি আবার জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল হাইয়ের আপন চাচাতো ভাই। ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে মাঠে নেমেছেন জেলা বিএনপির সভাপতির ছোট ভাই সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ। তার বন্ধু হাবিবুর রহমান হাবিবকে দিয়েছেন ধানের শীষ প্রতীক।

হাবিবুর রহমান গত দুই মেয়াদে ১৩ বছর ধরে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। এ সময়ে তার অর্জন শুন্য বলে মনে করছেন সেখানকার ভোটাররা। নৌকার প্রার্থী মো. আবদুল সাত্তারের পক্ষে রয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির উপদপ্তর সম্পাদক অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস। দুই দলের তিন শীর্ষ নেতার প্রেস্টিজ লড়াইয়ের নির্বাচন হচ্ছে এ ইউনিয়নে। এ ইউনিয়নটি বিএনপির ঘাটি হিসেবে পরিচিত। এখানে জেলা বিএনপির সভাপতির বাড়ি। এ ইউনিয়নে ৫০ হাজার ১৭৭ভোটার রয়েছে। আগামী ৭ ই মে শিল্পনগরীখ্যাত এ ইউনিয়নের নির্বাচন। এখানে নৌকার ভোট ব্যাংক তেমন নেই। দীর্ঘবছর নিয়ন্ত্রণে রাখা এ ইউনিয়নটি এবার বিএনপির হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার সম্ববনা দেখা দিয়েছে।

আবদুল হাইয়ের চাচাতো ভাই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী গোলাম মোস্তফা কিংবা বর্তমান চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমানের মধ্যেই এখানে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। ভোটের ফলাফলে এগিয়ে থাকতে পারেন গোলাম মোস্তফা। আগামী ১৯ শে এপ্রিল এ ইউনিয়নের প্রার্থীদের প্রতীক দেয়া হবে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রতীক নির্ধারিত হলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী গোলাম মোস্তফার প্রতীক নির্ধারণ করা হয়নি। তার পছন্দের প্রতীক আনারস।

স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে এখানে আবদুল হাই পরিবারের সদস্য সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ, চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমানসহ কয়েকজন দলীয় নেতার বিভিন্ন কর্মকান্ডে খোদ দলের কর্মী-সমর্থকরা বেকে বসেছেন। ওই দুইনেতা টাকার বিনিময়ে আওয়ামী লীগের একটি পক্ষের নেতাদের দিয়ে তাদের বিভিন্ন কাজের সুবিধা নিয়ে থাকতেন। জোর-জবরদস্তি, জমিদখল, ইন্ডাস্ট্রিজ দখলসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ড চালাতেন দলের নেতাকর্মীদেরই বিরুদ্ধে। এতে সময় সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। সম্প্রতি পঞ্চসার ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ডা. কামাল পাশা দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। এ ইউনিয়নে শতকরা ৭০ ভাগ ভোট ব্যাংক রয়েছে বিএনপির। কিন্তু জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল হাইয়ের চাচাতো ভাই গোলাম মোস্তফা ধানের শীষ প্রতীক না পেয়ে তিনি গত ২৭ শে ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন।

এরপর আওয়ামী লীগ সভাপতি গোলাম মোস্তফাকে মনোনীত করে তার নাম প্রস্তাব করে কেন্দ্রে পাঠায়। জেলা বিএনপির সভাপতি চাচাতো ভাই, নৌকার টিকিট নিয়ে জয়ের পর আবার বিএনপিতে অবস্থানসহ নানা অভিযোগের কারণে পরবর্তীতে কেন্দ্র গোলাম মোস্তফাকে নমিনেশন দেয়নি। নৌকা দেয়া হয় পঞ্চসার ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আলমগীর খানকে। তিনি গোলাম মোস্তফার সমর্থক। তিনি টিকিটি ফিরিয়ে দিলে স্থানীয় সংসদ সদস্য পক্ষের আবদুল সাত্তার নৌকার টিকিট পায়। অভিযোগ উঠেছে, গোলাম মোস্তফাকে নৌকার টিকিট না দেয়ার জন্য বিএনপির প্রার্থী হাবিবুর রহমান ও সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ ব্যাপক টাকা খরচ করেন।

এরপর জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মোহাম্মদ মহিউদ্দিন ও তার ছেলে মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার মেয়র ফয়সাল বিপ্লবের সমর্থন নিয়ে গোলাম মোস্তফা স্বতন্ত্র প্রার্থী (আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী) হন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় তিনি নির্বাচনী দৌড়ে সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছে যান। দলবেধে পঞ্চসারের বিএনপির নেতাকর্মীরা গোলাম মোস্তফার দিকে ছুটছেন। গোলাম মোস্তফার ব্যক্তিগত ভোট ব্যাংকও রয়েছে পঞ্চসারে। পঞ্চসার ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ কমিটির অধিকাংশ নেতাই রয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের পক্ষে। দুই বৃহৎ নৌকা ও ধানের শীষ প্রতীকের মাথাব্যথা এখন স্বতন্ত্র প্রার্থী আনারস প্রতীকের (সম্ভাব্য প্রতীক) গোলাম মোস্তফাকে নিয়ে। সেখানকার ভোটারদের মতে, পঞ্চসারে ডুবছে নৌকা, চিটায় ধরেছে ধানে, এগিয়ে যাচ্ছে গোলাম মোস্তফা। পঞ্চসারের আধিপত্য নিয়ে সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ ও চাচাতো ভাই গোলাম মোস্তফার মধ্যে বিরোধ থাকায় তাকে ধানের শীষ প্রতীক দেয়া হয়নি বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছেন।

সেখানকার বিএনপি নেতাদের মতে, জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল হাইয়ের অপর আপন ছোট ভাই আবদুল মতিনকেও ধানের শীষ প্রতীক দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। তাকে মনোনয়ন দেয়া হলে বিএনপিতে এ ভাঙন হতো না বলে ভোটাররা মনে করছেন। কিন্তু বিএনপি নেতা মহিউদ্দিন আহমেদের একগুয়েমি ও একক সিদ্ধান্তে হাবিবুর রহমানকে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হয়। বর্তমানে জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল হাই অসুস্থ হয়ে থাইল্যান্ডে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

এদিকে, গত ১২ই এপ্রিল দুপুর পৌনে ১২টার দিকে মুক্তারপুরে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী গোলাম মোস্তফার কিং ফিশারে সহিংস ঘটনা ঘটে। এরআগে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আবদুল সাত্তার মুক্তারপুর ফেরিঘাট এলাকায় প্রতীক নির্বাচন করা না হলেও নৌকার প্রচারণায় নামেন।

স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী গোলাম মোস্তফা বলেন, জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফয়েজ আহমেদ পাভেল, জেলা তরুণলীগের সভাপতি মৃদুল দেওয়ানের নেতৃত্বে আমার কারখানায় গুলি ফুটিয়ে আক্রমণ করে আমাকে খুঁজতে থাকে। আমি বের হলে আসলে তারা আমাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ে। গুলি দেয়ালে লাগে। এ সময় কারখানার কর্মচারীদের সহায়তায় বিভিন্ন মসজিদ থেকে মাইকিং করা হয়। জনতা এগিয়ে এসে তাদের গণপিটুনি দিয়ে হত্যার চেষ্ঠা চালায়। আমি তাদের রক্ষা করে দ্রুত রুমের ভেতরে নিয়ে রাখি। পরে পুলিশ এসে তাদের নিয়ে যায়। তাদের কাছ থেকে উদ্ধারকৃত ৫টি পিস্তল সদর থানার এসআই শেখ সাদির হাতে দেয়া হয়। মারধর করে আহত করা হয় তার ম্যানেজার মাসুদ রানা, হাসান, শ্রমিক রিয়াদুল ও রাসেলকে।

জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফয়েজ আহমেদ পাভেল জানান, মুক্তারপুর এলাকায় নৌকার প্রার্থী আবদুল সাত্তারকে নিয়ে গণসংযোগ করছিলেন। এ সময় স্বতন্ত্র প্রার্থী গোলাম মোস্তফার ছোট ভাই গোলাম কিবরিয়া, মুসা ও মাসুদসহ একদল সন্ত্রাসী তাদের আটক করে মোস্তফার কারখানায় ভেতরে নিয়ে যায়। নিয়ে তাদের রড-লাঠিসোটা দিয়ে পিটিয়ে আহত করে কারখানার একটি রুমে বন্দি করে রাখা হয়।

সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাসের আপন ভাতিজা আদর দাস জানান, খবর পেয়ে ভাইদের উদ্ধারে গেলে তারা আমাকে ধরে নিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করে একই রুমে বন্দি করে রাখে।

পরে দুপুর দেড়টার দিকে মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার মেয়র ফয়সাল বিপ্লবের হস্তক্ষেপে পুলিশ তাদের উদ্ধার করে সদর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসেন। সেখানেও শহরের দলীয় অপর অংশের নেতাকর্মীদের হাতে আক্রমণের শিকার হন। হাসপাতালের কর্তব্যরত ডাক্তার তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ দুইটি পিস্তল ও ৪ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে। দুপুর আড়াইটার দিকে পঞ্চসারের সহিংসতার জেরে শহরের জুবলী রোডের জগধাত্রীপাড়ায় মৃণাল কান্তি দাস গ্রুপের রেজাউল ইসলাম সংগ্রাম ও মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার মেয়র ফয়সাল বিপ্লব গ্রুপের মধ্যে ৩০-৪০ রাউন্ড গুলি বিনিময় হয়। ভাঙচুর করা হয় বাংলালিঙ্ক পয়েন্ট। এ ঘটনার জেরে মৃণাল কান্তি দাসের সমর্থকরা সদরের সিপাহীপাড়া চৌরাস্তায় ও ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের গজারিয়া অংশের ভবেরচর এলাকায় মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন।

পুলিশ বাদী হয়ে পরিত্যক্ত দেখিয়ে অস্ত্র ও গুলি উদ্ধারের ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ কোন পক্ষরই মামলা নেয়নি।

আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী গোলাম মোস্তফা কিং ফিশারের ম্যানেজার আমির হোসেন জানান, গোলাম মোস্তফার ওপর হামলা, গুলিবর্ষণ ও কারখানায় হামলায় ঘটনায় সংসদ সদস্যদের ভাতিজা আদর দাস, জেলা তরুণলীগের সভাপতি মৃদুল দেওয়ান, জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফয়েজ আহমেদ পাভেল, নয়াগাঁওয়ের জাহিদ হাসানসহ ৯ জনকে আসামি করে তিনি বাদী হয়ে সদর থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন। কিন্তু পুলিশ অভিযোগটি এখনও নথিভুক্ত করেনি।

ওদিকে, একই ঘটনায় সংসদ সদস্য পক্ষের আরেকটি মামলায় গোলাম মোস্তফাকে প্রধান আসামি করে অভিযোগ দায়ের করা হয়। কিন্তু সদর থানার ওসি গোলাম মোস্তফাকে মামলার আসামি করতে না চাইলে তারা অভিযোগপত্রটি জমা না দিয়ে নিয়ে যায় বলে আহত মৃদুল দেওয়ানের ভাই বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য আবু বক্কর সিদ্দিক মিথুন জানিয়েছেন।

এ ব্যাপারে সদর থানার অফিসার ইনচার্জ মো. ইউনুচ আলী বলেছেন, দুইটি পিস্তল ও ৪রাউন্ড গুলি উদ্ধারের ঘটনায় পরিত্যক্ত দেখিয়ে পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করেছেন। দুইপক্ষের অভিযোগ পাওয়া যায়নি, দিলে নেয়া হবে।

নিউজ৬৯

Comments are closed.