বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল সড়ক হচ্ছে বাংলাদেশে: ঢাকা-মাওয়া-ভাঙা

বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে বাংলাদেশে। ৫৫ কিলোমিটার ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা মহাসড়কে নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ হাজার ৯৬২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। চার লেন সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি স্থানীয় যানবাহনের জন্য নির্মাণ করা হবে দুই লেনের সড়ক। এতে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হবে ১০৮ কোটি ৪১ লাখ টাকা। তবে কাজ শুরু না করেই ব্যয় বৃদ্ধি করা হয়েছে এক দফা। গত অক্টোবরে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ২৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এখন তা ৯৩২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা বাড়িয়ে ৫ হাজার ৯৬২ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয় নির্ধারণ করে প্রকল্পটির প্রস্তাবনা (ডিপিপি) চূড়ান্তের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে বলে সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগ সূত্র জানায়। তাই এই ঠিক থাকলে বিশ্বে সবচেয়ে ব্যয়বহুল সড়ক হবে এটি। বিশ্বের উন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশের সড়ক অবকাঠামো নির্মাণে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হচ্ছে। ইউরোপে চার লেনের নতুন মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়ছে ২৮ কোটি টাকা। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এ ব্যয় ১০ কোটি টাকা। আর চীনে তা গড়ে ১৩ কোটি টাকা। তবে অপরিকল্পিত ব্যবস্থায় কারণেই সড়ক নির্মাণে ব্যয় বেশি হচ্ছে কিন্তু মান পাওয়া যাচ্ছে না। তাই সড়ক অবকাঠামো বেশি স্থায়ী হচ্ছে না বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।

জানা গেছে, দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিকায়নে জন্য ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতর প্রকল্প নেয়া হয় ২০১৫ সালে। গত অক্টোবরে প্রকল্পটির বিভিন্ন খাতের ব্যয় অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। এর মধ্যে বিদেশে প্রশিক্ষণ বাবদ খরচ প্রস্তাব করা হয়েছে ২০ কোটি টাকা। এ প্রকল্পের কার্যক্রম বিবেচনায় বিদেশ ভ্রমণ কতটুকু যুক্তিযুক্ত, বিদেশ ভ্রমণের বিষয়াবলি কী হবে, কোন সংস্থার লোক কোন পর্যায়ে বিদেশ ভ্রমণ করবেন- তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে। এছাড়া প্রকল্পের আওতায় গাড়ি ক্রয়, মেরামত ও সংরক্ষণ বাবদ ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ১৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা, অফিস ফার্নিচার ও যন্ত্রপাতি বাবদ ৫ কোটি টাকা ও ইঞ্জিনিয়ারিং ইক্যুইপমেন্ট বাবদ ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। এর বাইরে অপর এক খাতে কম্পিউটার খাতে ১ কোটি ও অন্যান্য দ্রব্যাদি খাতে ৫ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। আর যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত বাবদ ৬ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। গাড়ির গ্যাস, পেট্রোল, লুব্রিকেন্ট ও জ্বালানি খাতে ৮ কোটি টাকা খরচ ধরা হয়েছে। এছাড়া সড়কের পাশে বৃক্ষরোপণ খাতে সাড়ে ৫ কোটি টাকা ও বিদ্যমান ৪টি সেতু ভাঙতে ৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদ্যমান বাজারদরের চেয়ে এসব ব্যয় বেশি মত দেয় মন্ত্রণালয়। আবার অদৃশ্য খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ২১ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। আর উৎসব ভাতা খাতে ধরা হয় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এই প্রকল্পের আওতায় ৫৫ কিলোমিটার চার লেন ছাড়াও ৮টি আরসিসি ব্রিজ, ১৯টি পিসি গার্ডার ব্রিজ, ২টি ফ্লাইওভার, ৭টি ওভারপাস ও ৮টি প্রেড সেপারেটর (ইউ লুপ) নির্মাণের কথাছিল। পরবর্তীতে এরসঙ্গে ইকুরিয়া মোড়ে আরেকটি ওভারপাস যুক্ত করা হয়েছে। শতভাগ সরকারি অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ৫ হাজার ৯৬২ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে বলে সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগ সূত্র জানায়।

এ ব্যাপারে সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এমএএন ছিদ্দিক বলেন, সবচেয়ে ব্যয়বহুল সড়ক বলা ঠিক নয়। ডিপিপি যে ব্যয় চূড়ান্ত করা হবে সে অনুযায়ী সড়ক নির্মাণে ব্যয় হবে। তবে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা মহাসড়কটি নির্মাণ করা হবে ছয় লেনের। এর মধ্যে চার লেন থাকবে সম্পূর্ণ এলিভেটেড। এছাড়া স্থানীয় যানবাহন চলাচলের জন্য পাশ দিয়ে দুই লেন বিশিষ্ট সড়ক নির্মাণ করা হবে। সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তত্ত্বাবধায়নে সড়ক ও জনপথ অধিদফতর এই সড়কটি নির্মাণ করবে। এতে ফ্লাইওভার এবং ওভারপাস থাকায় এর ব্যয় একটু বেশি হতে পারে।

সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত ফেব্রুয়ারিতে সওজের বিভিন্ন চলমান ও প্রক্রিয়াধীন প্রকল্পের কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় জানতে চায় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। এর উত্তরে ৮টি প্রকল্পের তথ্য জমা দেয় সওজ। এক্ষেত্রে কিলোমিটারপ্রতি সবচেয়ে বেশি ব্যয় দেখানো হয় প্রস্তাবিত ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা চার লেনের। এতে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ধরা হয়েছে ১০৮ কোটি ৪১ লাখ টাকা, যা বিশ্বে সবচেয়ে ব্যয়বহুল। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে চার লেন সড়কের তুলনায় ঢাকা-মাওয়ায় প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণ অনেক কম। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২৫ হেক্টর জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে। ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন খাতে তাই ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৭ কোটি ৩ লাখ টাকা। এছাড়া কিলোমিটারপ্রতি ব্যয়ের দিক থেকে এরপর রয়েছে এলেঙ্গা-রংপুর চার লেন প্রকল্প। এতে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ৬৭ কোটি ৫ লাখ টাকা। এটিও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অন্যান্য প্রকল্পের কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় আরও কম। এর মধ্যে সম্প্রতি শুরু হওয়া ঢাকা-টাঙ্গাইল-এলেঙ্গা চার লেন প্রকল্পের কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ৪৮ কোটি ৬ লাখ টাকা। শেষ হতে চলা ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেনে এ ব্যয় ১৯ কোটি ৮৫ লাখ ও ঢাকা-ময়মনসিংহ চার লেন প্রকল্পে ২০ কোটি ৮২ লাখ টাকা। যদিও ইউরোপে চার লেনের নতুন মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়ছে ২৮ কোটি টাকা। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এ ব্যয় ১০ কোটি টাকা। আর চীনে তা গড়ে ১৩ কোটি টাকা। তাই ব্যয় বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে বাংলাদেশে সড়ক নির্মাণে অনেক বেশি ব্যয় হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

২০১৪ সালে সেপ্টেম্বরে জেনেভায় ইউএন-ইসিই (ইকোনমিক কমিশন ফর ইউরোপ) আয়োজিত এক সেমিনারে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মহাসড়ক নির্মাণের তুলনামূলক ব্যয়ের চিত্র তুলে ধরেন গ্রিসের ন্যাশনাল টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব এথেন্সের অধ্যাপক দিমিত্রিয়স স্যামবুলাস। ‘এস্টিমেটিং অ্যান্ড বেঞ্চমার্কিং ট্রান্সপোর্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার কস্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে তিনি বলেন, চার লেনের নতুন মহাসড়ক নির্মাণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে খরচ হয় গড়ে ৩৫ লাখ ডলার বা ২৮ কোটি টাকা। আর দুই লেন থেকে চার লেনে উন্নীত করতে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ২৫ লাখ ডলার বা ২০ কোটি টাকা। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত বিশ্বের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর সড়ক অবকাঠামোর নির্মাণ ব্যয়-সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন চার লেনের মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হবে ২২ লাখ ডলার বা ১৭ কোটি টাকা। আর দুই লেনের মহাসড়ককে চার লেন করতে এ ব্যয়ের পরিমাণ সাড়ে ১৪ লাখ ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১১ কোটি টাকা। ৪০টি দেশের নির্মাণ ব্যয়ের ভিত্তিতে ইকোনোমেট্রিক মডেল প্রয়োগ করে গড় ব্যয় নির্ণয় করা হয়। ‘দ্য কস্ট অব রোড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইন লো অ্যান্ড মিডল ইনকাম কান্ট্রিজ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি যৌথভাবে প্রণয়ন করেন অক্সফোর্ড, কলাম্বিয়া ও গোথেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন অধ্যাপক।

এছাড়া পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ২০১৫ সালে প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, চার লেনের নতুন মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় গড়ে ৮-৯ কোটি রুপি; বাংলাদেশের মুদ্রায় যা সাড়ে ৯ থেকে সাড়ে ১০ কোটি টাকা। জমি অধিগ্রহণ ব্যয়ও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। আর জমি অধিগ্রহণ করা না হলে ব্যয় অর্ধেকে নেমে যাবে। তবে দুই লেনের মহাসড়ক চার লেন করতে কিলোমিটারপ্রতি ৫ কোটি রুপি বা ৬ কোটি টাকা ব্যয় হবে। দেশটির ১২তম (২০১২-১৭) পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ রয়েছে। চীনের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশটিতে চার লেনের নতুন মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় গড়ে ১৬-১৭ লাখ ডলার; বাংলাদেশের মুদ্রায় যা সাড়ে ১২ থেকে সাড়ে ১৩ কোটি টাকা। তবে দুই লেনের মহাসড়ক চার লেন করতে কিলোমিটারপ্রতি পড়বে ১০ কোটি টাকার কম। দেশটির ১২তম (২০১০-১৫) পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এ তথ্য উল্লেখ আছে।

এ ব্যাপারে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এমএএন ছিদ্দিক বলেন, নতুন চার লেন প্রকল্পগুলোয় ধীরগতির যানবাহনের জন্য পৃথক লেন নির্মাণ করা হবে। রেলক্রসিং ও ইন্টারসেকশনে (মোড়) ওভারপাস, ইউ-লুপ ও ফ্লাইওভার থাকবে। ফলে আন্তর্জাতিক মানের সড়কে কোনো বাধা ছাড়াই যানবাহন চলাচল করবে। বেশকিছু সেতু ও কালভার্টও রয়েছে প্রকল্পগুলোর আওতায়। এছাড়া জমি অধিগ্রহণেও ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। এজন্য খরচ কিছুটা বেশি হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মানের কারণে সড়কের নির্মাণ ব্যয় বেশি হবে- এ যুক্তির সঙ্গে একমত নন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ২০০৫ সালে নির্মাণ করা বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কটি বাংলাদেশের একমাত্র আন্তর্জাতিক মানের সড়ক। ধীরগতির যানবাহনের জন্য পৃথক লেনও রয়েছে এতে। এটি নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হয়েছে মাত্র ৫ কোটি টাকা। গত ১০ বছরে এ ব্যয় বাড়লেও ১০ কোটি টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। তবে ফ্লাইওভার বা ওভারপাস ও সেতুর কারণে ব্যয় কিছুটা বাড়তে পারে। তবে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ১০৮ কোটি ৪১ লাখ টাকা হওয়ার পেছনে কি কারণ রয়েছে তা স্পষ্ট নয় বলে জানান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক।

সংবাদ

Comments are closed.