নতুন পে-স্কেলে বেতন উত্তোলণ নিয়ে উৎকোচ আদায়

সিরাজদিখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নতুন স্কেলে বেতন পাওয়ার ক্ষেত্রে হয়রানির শিকার হচ্ছে। চলছে বেতন উত্তোলণ নিয়ে সরকারি শিক্ষকদের কাছে উৎকোচ আদায় ! গত মাসের ১০ তারিখের মধ্যে নতুন পে-স্কেলে বেতন (এরিয়ার টাকাসহ) দেওয়ার জন্য শিক্ষা মন্ত্রনালয় থেকে আদেশ দিলেও মন্ত্রনালয়ের সেই আদেশ মানেনি সিরাজদিখান উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ও সিরাজদিখান উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিস।

শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের আদেশ গত ১০ দিন অতিবাহিত হলেও নতুন স্কেলে বেতন পায়নি সরকারি শিক্ষকরা। জানাগেছে, সিরাজদিখান প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি ও উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসে বেতন ছাড় করানোর কথা বলে উপজেলার ১২৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৭৮০ জন শিক্ষকের প্রত্যেকের কাছ থেকে ৫০০ টাকা করে সর্বমোট ৩ লাখ ৯০ হাজার টাকা উৎকোচ আদায় করা হয়েছে। কতিপয় শিক্ষক নেতারাই ওই টাকা তুলেছেন বলে অভিযোগ। সাধারণ শিক্ষকদের জিজ্ঞাসা ঘুষ দেওয়ার পরেও কি কারণে তারা তাদের বেতন তুলতে পারলো না।

তথ্যানুসন্ধানে জানাগেছে, সিরাজদিখান উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি ও উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসে অর্থ না দেওয়ায় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নির্দেশনার পরেও এরিয়ার বিলসহ বেতন পাচ্ছে না সহকারি শিক্ষকরা। শিক্ষা মন্ত্রনালয় থেকে গত ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে বিল উত্তোলনের নির্দেশনা দিলেও শিক্ষকরা ২০১৬ সালের ৯ এপ্রিলও বিল পাননি।

অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি ও উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের দাবীকৃত অর্থ পরিশোধ না করায় বিল দেওয়া হচ্ছে না। সহকারী শিক্ষকদের এরিয়ার বিল ২০১৫ সালের জুলাই থেকে বাকী ছিলো। যা জানুয়ারি মাসে পাওয়ার দাবীদার ছিলো। বিল পাওয়ার জন্য উপজেলা শিক্ষক সমিতির কয়েকজন কর্মকর্তা ও উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তা শিক্ষকদের নিকট মোটা অংকের অর্থ দাবী করে। দাবীকৃত অর্থ তোলেন উপজেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোঃ আনোয়ার হোসেনর নেতৃত্বে কয়েকজন শিক্ষক। তবে উপজেলা প্রাইমারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি আনোয়ার হোসেন অর্থ গ্রহণের কথা অস্বীকার করেন।

আর উপজেলা প্রাইমারী শিক্ষা কর্মকর্তা বেলায়েত হোসেন জানান, বেশ কিছু শিক্ষককের কাগজে ভুল থাকায় বিল দিতে বিলম্ব হয়েছে। টাকা ওঠানোর বিষয় আমি কিছুই জানি না। তবে আগামী রোববার বিল ছাড়া হবে। সূত্র আরো জানায়, সমিতির পক্ষ থেকে সমিতির সভাপতি চম্পকদী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মোঃ আনোয়ার হোসেন, কালীনগর প্রাইমারী স্কুলের মহসিন, মধুপুর সরকারী প্রাইমারী স্কুলের সাইফুদ্দিন বেপারী ,উত্তর ফুরসাইল সরকারী প্রাইমারী স্কুলের অভিজিৎ দাস অন্তত ৭৮০ জন সহকারী শিক্ষককের নিকট থেকে ৫শ’ টাকা করে উত্তোলন করেছেন। এসব টাকা সিংহভাগই এসব শিক্ষক নেতাদের পকেটে বলে জানাগেছে।

এছাড়া নবজাতীয়করণকৃত উপজেলার ১৭টি স্কুলের ৫২ জন শিক্ষক আছে। এ সব শিক্ষকের নিকট থেকে বেতন সমন্বয় ও এরিয়ার বিল প্রদান বাবদ ১ হাজার টাকা করে আদায় করা হয়েছে। তাদের নিকট থেকে টাকা আদায়ে নেতৃত্ব দেন কালীনগর প্রাইমারী স্কুলের মহসিন, মধুপুর সরকারী প্রাইমারী স্কুলের সাইফুদ্দিন বেপারী ,গুয়াখোলা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আতিকুর রহমান,উত্তর ফুরসাইল সরকারী প্রাইমারী স্কুলের অভিজিৎ দাস, জৈনসার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কামাল হোসেন,উত্তর ফুরসাইল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মো. আসাদুজ্জামান তালুকদার,পূর্ব শিয়ালদি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আবুল হাসনাত,খালপাড় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মো. হানিফ, শেখরনগর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রকাশ চন্দ্র সরকার, ধামালিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তসলিম হোসেন খান,মালপদিয়া বালক সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিরঞ্জন চন্দ্র দাস,দক্ষিন তাজপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নূর মোহাম্মদ, চম্পকদী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মো. আনোয়ার হোসেন ।

উত্তোলনকৃত টাকার একটি অংশ শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও উপজেলা হিসাবরক্ষক কর্মকর্তাকে দেওয়া হবে। বাকী অর্থ সমিতির কতিপয় কর্মকর্তার পকেটে যায়। ফলে এরিয়ার বিল পেতে হয়রানির শিকার হচ্ছে শিক্ষকরা। সূত্র আরো জানায়, উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামকে ও অফিস সহকারী মজিবর রহমানকে অর্থ না দিলে তারা কোন কাজ করেনা বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষকরা জানান। দক্ষিন তাজপুর সরকারী প্রাইমারী স্কুলের প্রধান শিক্ষক নূর মোহাম্মদ জানান, টাকা উত্তোলন শিক্ষক সমিতির ব্যাপার। তারা এটা উত্তোলন করেছে।

তিনি টাকা উত্তোলনের সাথে জড়িত নন দাবী করে বলেন, কেউ বলতে পারবে না আমার কাছে টাকা দিয়েছে। সিরাজদিখান উপজেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও চম্পকদী প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক আনোয়ার হোসেন জানান, কোন শিক্ষককের নিকট থেকে অর্থ আদায় করা হয়নি। প্রত্যেক শিক্ষক নিজ উদ্যোগে এরিয়ার বিল করেছে। তিনি আরো বলেন, কাজ শেষ হয়নি বলে বিল দেওয়া হয়নি। হিসাবরক্ষণ অফিস ও সমিতির কর্মকর্তাদের টাকা কিভাবে দেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা প্রত্যেক শিক্ষকের ব্যাপার। ১২ জন শিক্ষকদের ১৩ রকম মত। তারা তাদের মতো করে ম্যানেজ করেছে। তবে উপজেলা হিসাবরক্ষন কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম জানান, হিসাবরক্ষন অফিসের কেউ টাকা চায়নি। আমাদের টাকা দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।

সিরাজদিখান উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, উপরোক্ত এসব দুর্নীতিবাজ শিক্ষক নেতারা বিভিন্ন অজুহাতে সহকারী শিক্ষকদের কাছ থেকে প্রায় উৎকোচ আদায় করে থাকেন। এটা তাদের ব্যবসায় পরিনত হয়েছে। নতুন পে-স্কেলের বেতন উত্তোলনের জন্য প্রত্যেক শিক্ষকের কাছ থেকে ৫শ’ টাকা করে আদায় করা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু টাকা উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসে দিয়েছে বলে জানাগেছে। বেতন ছাড় করা নিয়ে তিনি নানা অজুহাত দেখাচ্ছেন। অথচ অন্যান্য উপজেলার শিক্ষকরা মন্ত্রনালয়ের নির্দেশ মোতাবেক এরিয়াসহ বেতন উত্তোলণ করেছেন।

এ ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী , শিক্ষা সচিব , সিরাজদিখান উপজেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিস্ট মহলের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন শিক্ষকরা। একই সাথে বেতন উত্তোলনের নামে উৎকোচ আদায়কারী শিক্ষক নেতা, ও উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কঠোর ব্যবস্থা গ্রহনের জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।

জনকন্ঠ

Comments are closed.