নতুন নিরাপত্তা আইন কার্যকর, প্রয়োজনে দেশের বাইরে যুদ্ধ করতে পারবে জাপান

রাহমান মনি: জাতীয় নিরাপত্তা আইন ২০১৫ বিলটি পাস হওয়ার ৬ মাসের মধ্যে তা কার্যকর করতে সক্ষম হয়েছে জাপান। এর ফলে এখন থেকে নিজ দেশ ছাড়াও প্রয়োজনে জাপান দেশের বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করতে পারবে এবং আন্তর্জাতিক শান্তি অভিযানে অংশ নিতে পারবে।

১৯৪৫ সালের বিশ্বযুদ্ধে আত্মসমর্পণের পর আত্মরক্ষা ব্যতীত অন্য কোনো কারণে যুদ্ধে জড়ানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল জাপানে। দীর্ঘ ৭০ বছর পর এমন একটি আইন করতে সক্ষম হলো।

নতুন আইনটি জাপানকে তার সমষ্টিগত আত্মরক্ষা চর্চায় সুযোগ করে দেবে, মিত্রশক্তির কোনো দেশ অস্তিত্ব সংকটে পড়লে জাপান সেখানে তার সৈন্য প্রেরণ করতে পারবে। আর এখানেই যত সংশয় সাধারণ জনগণ বিশেষ করে তরুণ সমাজের। স্বাভাবিকভাবেই তারা এই আইনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাদের মতে এই আইন যতটা না জাপানের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করবে তার চেয়ে বেশি স্বার্থ আদায় হবে যুদ্ধবাজ পশ্চিমা দেশগুলোর। মিত্রশক্তির নামে তারা জাপানকে ব্যবহার করবে। এই আইনের ফলে তাদের শান্তিপ্রিয় দেশে নতুন করে অশান্তির সৃষ্টি হবে।

পাস হওয়ার আগে ও পরে সংসদের ভেতরে এবং বাইরে তীব্র প্রতিবাদের মুখে ২৯ মার্চ ২০১৬ মঙ্গলবার থেকে আইনটি কার্যকর শুরু হয়েছে।

এই উপলক্ষে স্বল্প সময়ের নোটিসে প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে তার সরকারি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি আইনটি কার্যকরের স্বপক্ষে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করেন। আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের সশস্ত্র বাহিনীর অবস্থান উন্নত করার লক্ষ্যে তিনি ও তার ক্যাবিনেটের প্রতিরক্ষামন্ত্রী নাকাতানি গেনের অবস্থান নেন বলে তিনি জানান।

গত বছর সেপ্টেম্বরের প্রথম ভাগে জাপান পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে বিলটির পক্ষে এবং বিপক্ষের সদস্যদের মধ্যে হাতাহাতি এবং প্রবল বিশৃঙ্খলার মধ্যে পাস হওয়ার পর এ সংক্রান্ত কমিটি ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৫ বিলটি উচ্চকক্ষে পাঠানোর অনুমোদন দেন। ১৯ সেপ্টেম্বর ১৪৮-৯০ ভোটে পাস হয়।

অনুমোদনের খবরটি চাউর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মুহূর্তের মধ্যে সাধারণ জনগণ তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর রাজনৈতিক আইন প্রণয়ন নিয়ে এমন প্রতিক্রিয়া সাধারণ জনগণের মধ্যে আর পরিলক্ষিত হয়নি। রীতিমতো প্রতিবাদের সুনামি বয়ে যায় সারা জাপানজুড়ে। জাপানি জনগণ সাধারণত রাজনীতি নিয়ে এতটা মাথা ঘামান না। ‘নিরাপত্তা আইন বিল ২০১৫’ ছিল তার ব্যতিক্রম। কেননা যুদ্ধে জড়িয়ে জাপানের ক্ষতির ঘা জাপানিদের মন থেকে মুছে যায়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানের উন্নতি এবং শান্তি দুটোই সমান্তরাল বয়ে যাচ্ছিল। তরুণ সমাজ চায় না এতে ব্যাঘাত ঘটুক। তাছাড়া ভুক্তভোগী বয়োজ্যেষ্ঠরা তো রয়েছেনই। আর জাপানি সমাজে এদের সংখ্যা যেমন বেশি তেমনি অবদানও। ৩০% ছুঁই ছুঁই করছে।

নতুন আইনে জাপানের সেল্ফ ডিফেন্স ফোর্স (ঝউঋ) আরও আধুনিক এবং পরিসর বাড়বে। এতে বিপুল কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার পরও শান্তিপ্রিয় জাপানিরা এখনও তার বিরোধিতা করছে। কেবল মাত্র প্রধানমন্ত্রী আবের দৃঢ়তার জন্যই এমন একটি আত্মঘাতী আইন প্রণয়ন করতে হচ্ছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তবে এর প্রভাব আগামী সাধারণ নির্বাচন, যা এ বছরেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে তার ওপর পড়বে কিনা তা সময় বলে দিবে। এতদসত্ত্বেও এটাও সত্যি যে, আবের বিকল্প নেতা এখনও পরিলক্ষিত হচ্ছে না, যিনি জাপানকে শক্ত হাতে নেতৃত্ব দিয়ে সামনে এগিয়ে নেবেন। তাই বাধ্য হয়েই আবের ওপর নির্ভরতা কমানো যাচ্ছে না বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

rahmanmoni@gmail.com
সাপ্তাহিক

Comments are closed.