শ্যামবাজারে ‘লোকসানের গল্প’

পুরান ঢাকার ব্যবসা–বাণিজ্য
দোকানের এক পাশে বস্তা বস্তা ভারতীয় পেঁয়াজ। যশোরের বেনাপোলের আমদানিকারকদের কাছ থেকে ১৮ টাকা কেজি দরে কেনা। পেঁয়াজের বস্তাগুলো দেখিয়ে রাজীব বাণিজ্য ভান্ডারের কর্মকর্তা অনাথ সাহা বললেন, ৫৪ হাজার টাকা লোকসান।

জানতে চাইলাম, কেন? অনাথ সাহা বললেন, ‘তিন দিন আগে বেনাপোল থেকে এক গাড়ি, মানে ১৮ টন ভারতীয় পেঁয়াজ কিনে আনি। সেদিন কেজি ছিল ১৮ টাকা। ঢাকা পর্যন্ত আনতে কেজিতে ৩ টাকা খরচ। ফলে দাম দাঁড়াচ্ছে ২১ টাকা। কিন্তু ওদিকে বেনাপোলে পেঁয়াজের দাম কমে গেছে। কেজি এখন ১৫ টাকা। সে জন্য ঢাকায় পাইকারেরা ১৮ টাকার বেশি দামই বলছেন না। লোকসানে বিক্রি করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।’

পুরান ঢাকার শ্যামবাজারের এটি একটি চিত্র, বিশেষ করে যাঁরা আমদানি করেন তাঁদের। তবে এখানে আড়তের সংখ্যাই বেশি, প্রায় ৩০০। আমদানিকারক ২০-২৫ জন। তাঁদের অধিকাংশের আবার আড়তদারি ব্যবসাও আছে। আড়তদারেরা মূলত আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের ‘কমিশন এজেন্ট’ হিসেবে কাজ করেন। কমিশন এজেন্ট হচ্ছে, এক কেজি পেঁয়াজ বিক্রিতে আড়তদার সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকের কাছ থেকে ৩০ পয়সা এবং যে পাইকার পেঁয়াজ কিনবেন, তাঁর কাছ থেকে কেজিতে ৫০ পয়সা পাবেন। রসুনে কমিশন হচ্ছে ১ এবং ১ করে ২ টাকা। আর আদায় ১ টাকা ও ৫০ পয়সা।

শ্যামবাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী জানালেন, ভোক্তার চাহিদার বিষয়ে এখানকার আমদানিকারকদের কোনো ধারণা নেই, জোগান নিয়েও নেই। সে জন্য প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পণ্য আমদানি করেন। এতে করে আরেকটি বড় সমস্যাও হচ্ছে। বাজারে পণ্যের জোগান বেশি হওয়ায় দাম পড়ে যাচ্ছে। তাতে কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য না পেয়ে ক্ষতির মুখে পড়ছেন। যদিও পণ্যের দাম কমায় মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে খুচরা পর্যায়ে সেটির সুফল খুব একটা পান না সাধারণ ভোক্তারা।

গত সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শ্যামবাজারে গিয়ে দেখা যায়, বুড়িগঙ্গার নদীতীরে লালকুঠি ঘাটের মোড় থেকেই আড়ত শুরু। ফরাশগঞ্জের বি কে দাশ রোড ধরে এগোতেই চোখে পড়ল সারি সারি আড়ত। সেখানে পেঁয়াজ, রসুন, আদা, শুকনো মরিচ, হলুদ, ধনে, আলু ইত্যাদি ভোগ্যপণ্যের বস্তা থরে থরে সাজানো। দু-চারটি ট্রাক থেকে পণ্য নামছে। গলি পথ ধরে হেঁটে নদীর পাশে গিয়ে সবজির ছোট আড়ত মিলল। নদীপথে মুন্সিগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ থেকে ট্রলারে করে লাউ, ফুলকপি ইত্যাদি সবজি ঘাটে ভিড়ছে। বেশ কর্মচাঞ্চল্য। সদরঘাটের দিকে এগোতেই পানের আড়ত। হাঁকডাক দিয়ে পান বিক্রি হচ্ছে। সব মিলিয়ে ৫০-৫৫টি পানের আড়ত আছে। তবে ব্যবসায়ীরা জানালেন, শ্যামবাজারের মূল ব্যবসা ওই পেঁয়াজ, আদা, রসুন, হলুদ ও শুকনা মরিচের আড়তদারি।

বি কে দাশ রোডে ভাই ভাই ট্রেডার্স। শ্রমিকেরা পেঁয়াজের বস্তা ট্রাকে তুলে দিচ্ছেন। এর মধ্যেই আড়তের স্বত্বাধিকারী নারায়ণ চন্দ্র রায়ের সঙ্গে কথা হলো। ব্যবসা কেমন চলছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শ্যামবাজারে আগের মতো ব্যবসা নাই। আগে একসময় সারা দেশের পাইকাররা আসতেন। এখন কেবল ঢাকা ও আশপাশের জেলার পাইকারি ব্যবসায়ীরাই আসেন। চাহিদা কমে গেছে। কিন্তু পণ্য আমদানি কমে নাই। ধরেন, প্রতিদিন লাগবে ৫ গাড়ি পণ্য, কিন্তু আসছে ২৫ গাড়ি।’
নারায়ণ চন্দ্র বলেন, দেশে এবার প্রচুর পেঁয়াজ হয়েছে। কিন্তু আমদানি এতটাই বেশি যে দাম গেছে কমে। দেশি পেঁয়াজ ১৮-২০ টাকায় কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। মেহেরপুরের একটি পেঁয়াজ আছে, সেটির দাম আরও কম, ১২-১৩ টাকা কেজি। কিন্তু চাষিদের পেঁয়াজ উৎপাদনের খরচই আছে কেজিতে ২২-২৫ টাকা।

এজেন্টের মাধ্যমেই শ্যামবাজারের ব্যবসায়ীরা ভোগ্যপণ্য আমদানি করেন। তেমনটি একটি প্রতিষ্ঠান রতন এন্টারপ্রাইজ। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী রতন কুমার সাহা বলেন, শ্যামবাজারের ব্যবসা অন্ধকারে সাপ ধরার মতো হয়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা যে যার মতো পণ্য আমদানি করে লোকসানে পড়ছেন। তিনি বলেন, ‘দেশে উৎপাদিত পণ্যের উৎপাদন, মজুত ও চাহিদার হালনাগাদ পরিসংখ্যান ইত্যাদি দিয়ে তথ্যভান্ডার করে ব্যবসায়ীদের সেটি দিতে হবে, না হলে এই ব্যবসা ঠিকপথে আসবে না। তবে আমরা বহুবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে একটি তথ্যভান্ডার করে দেওয়ার অনুরোধ করেছি। কাজ হয়নি।’

শ্যামবাজার কৃষিপণ্য আড়ত বণিক সমিতির কোষাধ্যক্ষ মহসিন উদ্দিন গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, লাভ-লোকসান এভাবেই ব্যবসায়ীরা পুষিয়ে নেন। তবে চলতি বছর ধারাবাহিকভাবে লোকসান গুনছেন ব্যবসায়ীরা। পচনশীল হওয়ায় কাঁচামাল দু-এক দিনের বেশি রাখা যায় না। সরকার যদি ইতিবাচক উদ্যোগ নেয়, তবেই এই সমস্যা কাটানো সম্ভব। কীভাবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যেমন এবার প্রচুর পেঁয়াজ হয়েছে। সরকার চাইলে মাস খানেকের জন্য পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রাখতে পারত।

প্রথম আলো

Comments are closed.