নারী দীপাবলী: তুমি হবে সে সবের জ্যোতি

বিপাশা চক্রবর্তী: নারী কি পুরুষের চেয়ে বুদ্ধি আর কর্ম ক্ষমতায় কম? পুরুষের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতাই কি নারী মুক্তির পথ! নারীর ওপর সনাতন আধিপত্য বজায় রেখেই কি পুরুষ পেতে পারে জীবনের শ্রেষ্ঠ আনন্দ!

ভিভ ল্য দিফেরঁস! অর্থাৎ ‘বেঁচে থাক নারী-পুরুষের বিভেদ’–এই বলে এক সময় শোর তুলেছিলেন নারী মহিমার পূজারী ফরাসিরা। বলা ভাল, ফরাসি পুরুষরা। দেখা যায়, জগৎ জুড়ে পুরুষরা দুটো কাজই করেন- নারীর পূজা আর নারী নিপীড়ন। যেটা করে উঠতে পারেন না সেটা হল নিজের পাশাপাশি নারীকে সমমর্যাদায় স্থাপন। অভিযোগ হয়তো পুরুষেরও থাকতে পারে। সভ্যতার বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অঞ্চলে মাতৃতান্ত্রিক সমাজে পুরুষ হয়তো যথাযথ মর্যাদা পায়নি। তারপরেও অধিক শারীরিক বলের অধিকারী পুরুষের দাপটেই ছেয়ে আছে, নারী-পুরুষের যৌথ মানব সভ্যতার ইতিহাস। নারী-পুরুষের শারীরিক, মানসিক, জৈবিক ভূমিকায় পার্থক্য স্পষ্ট।

প্রাকৃতিক কারণে কেউ নারী কেউ পুরুষ হয়ে জন্মায়। বয়োসন্ধি বা একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর শারীরিক মানসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে হরমোনের প্রভাব এবং অবশ্যই বংশবিস্তারের প্রবণতা থেকে তারা একে অন্যের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে, কাছে আসে, ভালবাসে, মিলিত হয়, সন্তান জন্ম দেয়। এটাই জগতের নারী পুরুষের পরিপূরক শাশ্বত রুপ। অথচ এই রূপ কালে কালে তার প্রাধান্য হারিয়েছে। নারীর থেকে পুরুষ, পুরুষ থেকে নারী দূরে সরে গেছে ক্রমশঃ। নারী-পুরুষের গভীর অনুরাগের সম্পর্কে কোথায় যেন ঢুকে গেছে রাজনীতি। নারী স্বাধীনতার প্রবক্তা কেট মিলেটের ভাষায় ‘সেক্সুয়াল পলিটিক্স’। পৌরুষময় সমাজে ঘরে বাইরে নারীর সম-অধিকার, সম্মান, মর্যাদা ইত্যাদি–এসব নিয়ে ভেবেছেন ও এখনও ভেবে চলেছেন বহু নারীনেত্রী ও অতিউৎসাহী নারীবাদী লেখক। তাদের কাজগুলো কখনও ছিল যৌক্তিক ও ন্যায্য। তেমনি অনেকের কাজ ও কথায় ভ্রান্ত উদ্ভট সব দাবী ও ধারণাও রয়েছে। এমনকি কিছু কিছু নারীবাদী নারীকে স্পর্শকাতর, সংবেদনশীল, লাজুক, নরম, দুর্বল করেই উপস্থাপন করে নিজের কথাগুলো বলতে পছন্দ করেন। আর এসবই হয়ে উঠেছে কারো কারো কাছে বিখ্যাত হবার হাতিয়ার। বেশিরভাগ নারীবাদী লেখায়, আন্দোলনে ও উচ্চারণে নারীর যৌন বিষয় ও ঘরে-বাইরে সমঅধিকার যতটা আসে ততটা আসে না নারীপুরুষের বিবর্তমান সম্পর্ক ও ইতিহাস, জৈবিক ভূমিকা, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ, নতুন-পুরোনো সমস্যার সমাধান ও ভবিষ্যতের ভাবনা।

এই কিছুদিন আগেই, এক ঘনিষ্ঠজন আমার কাছে প্রশ্ন রেখেছিল, গণিত বা পদার্থের মতো বিষয়গুলোতে কেন খুব বেশি নারী শীর্ষস্থানে যেতে পারেনি? সঙ্গে সঙ্গেই আমি আমার স্বল্পজ্ঞান ও পর্যবেক্ষণ থেকে তাকে বুঝিয়েছিলাম, প্রজন্ম রক্ষায় নারীর যে প্রাকৃতিক ভূমিকা অর্থাৎ সন্তান জন্মদান, লালন পালনে নারীর যতখানি সময় ও মনোযোগ দিতে হয় হয় পুরুষকে তা দিতে হয় না। জৈবিক-সামাজিক বিবর্তন ও পরিবর্তনে নারীরা গড়পড়তায় পুরুষের চেয়ে তুলনামূলকভাবে এই উচ্চ-বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়গুলোতে পিছিয়ে আছে। কাকতালীয়ভাবে এর কয়েকদিন পরেই নারী-প্রসঙ্গের সমকালীন বাঙালী লেখকদের মাঝে বিশিষ্ট কন্ঠস্বর, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক পূরবী বসু রচিত নারী দীপাবলী বইটি পড়া শুরু করি। এবং লক্ষ্য করি ঐ প্রশ্নটির উত্তর আমি আরও ভালভাবে দিতে পারতাম যদি এই বইটি আমার আগেই পড়া থাকত।

নারীর জৈবিক ভূমিকা ও প্রতিভার বিকাশের ব্যাপারটিই এই বইতে বৈজ্ঞানিক-সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিস্তারিতভাবে উদাহরণসহ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

সম্পদ-প্রাপ্তি ও উন্নয়নের ফলে ক্রমবিকাশের ধারায় অধিক-শারীরিক-বলের-অধিকারী পুরুষের কাছে কুক্ষিগত হয়েছে ক্ষমতা। নিজের আধিপত্য বিস্তারের জন্য তৈরি করেছে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার। নারী বিবেচিত হয়েছে সন্তান উৎপাদনের ক্ষেত্ররূপে। কখনো কেবল শয্যাসঙ্গিনী। আর গৃহিণীপনায় ব্যস্ত রমনী। অন্যদিকে যাবতীয় সৃষ্টিশীলতার ভার যেন পুরুষের একার কাঁধে–এমন ভাব করে বেরিয়ে গেছে পুরুষ বিশ্ব জয়ে। আর যুগে যুগে নারীর বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে করেছে অবদমিত– এ ইতিহাস কারো অজানা নয়। এ ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই এসেছে পরিবর্তন, ঘটেছে বিপ্লব। বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও শিল্পবিপ্লব, সমাজ জীবন এবং অর্থনীতিতে সূচিত হয়েছে নাটকীয় পরিবর্তন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই বিপুলহারে নারীরা বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে কর্মজগতে। আর এখনকার প্রেক্ষাপটে শ্রমশক্তি আর বুদ্ধিবৃত্তিক বিবেচনায় নারীরা পিছিয়ে–এমন কথা বলার কোন অবকাশই নেই। শুধু বেশি ওজন তুলতে পারাটাই কি শারীরিক শক্তির পরিচায়ক? নারীর ভেতরের প্রাণশক্তি, আর বাইরের আঘাত বা বিরূপ আচরণকে প্রতিহত করে টিকে থাকার প্রবণতা কি যথেষ্ট শারীরিক শক্তির পরিচয় বহন করে না?

জৈবিক, নৃত্বাত্তিক কিংবা সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারায় আমরা দেখতে পাই নারীরা পুরষের চেয়ে আগে সভ্য হয়েছে। নারীরা যেখানে মায়া মমতা ভালবাসা আর অহিংসার চর্চা করেছে, পুরুষরা সেখানে বরাবরই বেছে নিয়েছে সহিংস পথ। আর এর প্রধান শিকার কিন্তু নারী ও তার কোলের শিশুরাই। নারী দীপাবলী বইটিতে বর্তমান পরিবর্তিত বিরূপ প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে প্রজন্ম রক্ষায় নারীর ভূমিকার কথা এসেছে। তেমনি ব্যাখা করেছেন ইকো-ফেমিনিজমের ব্যাপারটি। নারীর মাতৃত্বের সাথে সৃজনীশক্তি ও প্রতিভা বিকাশের দ্বন্দ্বটা আসলে কেমন? সামগ্রিক বিবেচনায় মানব সভ্যতার বিকাশে নারীর মাতৃত্বের গুরুত্ব, অবদান পাশাপাশি ব্যক্তি নারীর জন্য মাতৃত্বের ইচ্ছা বা ভূমিকা সম্পর্কে সুস্পষ্ট আলোচনা করেছেন লেখক। নারীর এই ভূমিকা পালনে পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্রের করণীয় সম্পর্কে চমৎকার বিশ্লেষণ করেছেন পূরবী বসু। ইতিহাসের পাতা থেকে এক এক করে তুলে এনেছেন নোবেলবিজয়ী উল্লেখযোগ্য নারী লেখক, বিজ্ঞানীদের জীবন সংগ্রামের কথা। তেমনি এই উপমহাদেশ ও বাংলাদেশের মহীয়সী নারীদের জীবনচিত্রের সাথে এসেছে পুরাণে বর্ণিত উল্লেখযোগ্য নারী চরিত্রগুলোর কথা। এর মাধ্যমেই যেন নারী দীপাবলী বইটির নাম করণের যথার্থতা প্রকাশিত হয়। পুরুষ নির্মিত সভ্যতার অবকাঠামোয় যে যে উপদানগুলো সরাসরি অথবা পরোক্ষভাবে নারী অধিকার ও স্বাধীনতার পরিপন্থী হয়েছে সেগুলো চিহ্নিত করে তার স্বরূপ উদ্ঘাটনের চেষ্টা করেছেন লেখক এই বইতে।

ইতিহাস ঘেটে পূরবী বসু দেখিয়েছেন নিজের শরীর ও মনোযোগ দিয়ে মানব প্রজন্মকে এগিয়ে নিয়ে যাবার মতো সর্বশ্রেষ্ঠ গুরু দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি প্রতিভা ও বুদ্ধিমত্তা বিকাশে পুরুষের চেয়ে নারী কোনো অংশে কম নয়। তারপরেও পৌরুষময় সমাজে পদে পদে নারীদের সৃজনীশক্তি বাধাগ্রস্ত হয়েছে, অবহেলিত হয়েছে। কখনো নারীর উদ্ভাবন ক্ষমতাকে স্বীকৃতি দেয়নি সমাজ, আবার কখনো দিলেও দিয়েছে অনেকে দেরীতে।

ইংরেজী বা অন্য ভাষায় এই জাতীয় পুস্তক আরও বিশদ ও বড় পরিসরে থাকলেও বাংলাভাষায় খুবই অপ্রতুল। তার উপর পূরবী বসুর ন্যায় এমন সহজ সরল বিশ্লেষণসহ নারীবিষয়ক গ্রন্থ বাংলাভাষায় আরো দুর্লভ। এক্ষেত্রে নারী দীপাবলী এই সময়ের বাংলা ভাষাভাষী আধুনিক নারীপুরুষ উভয়ের জন্য একটি অতিপ্রয়োজনীয় ও সুখপাঠ্য গ্রন্থ হিসেবে পঠিত হবার দাবী রাখে। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এই গ্রন্থটি পাঠের মাধ্যমে পুরুষ নারীকে নতুনভাবে জানবে, বিপরীত লিঙ্গের প্রতি তার এ যাবতকালের ধারণা ও ভাবনার জগত পুনরায় বিন্যাস্ত হবে বোধ করি। আর নারী নিজেকে নতুন রূপে আবিষ্কার করবে এই গ্রন্থে।
লেখনীর স্বার্থেই লেখক কখনো ইংরেজী উদ্ধৃতি, বাক্য ও শব্দ ব্যবহার করেছেন। বেশ কিছু মুদ্রণজনিত ভুল এড়ানো যায়নি। গ্রন্থের শুরুতে লেখক অথবা প্রকাশকের নিবেদন উল্লেখপূর্বক গ্রন্থ-সংশ্লিষ্ট কিছু কথার অনুপস্থিতি কোনো কোনো পাঠকের কাছে প্রয়োজনীয় হিসেবে ধরা দিতে পারে।
তবে এইসব ঊনতা নিতান্তই সামান্য। খুব বেশি খুঁতখুঁতে নাহলে এসব অগ্রাহ্য করার মতোই। পূরবী বসুকে অভিনন্দন জানাই এরকম একটি গ্রন্থ আমাদেরকে উপহার দেবার জন্য। আর বিপিএলকে ধন্যবাদ এমন একটি বোধ-উন্মীলক গ্রন্থ প্রকাশ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করার জন্য। বইটির মুদ্রণ সৌকর্যও বেশ দৃষ্টিনন্দন হয়েছে।

নারী দীপাবলী
লেখক: পূরবী বসু
প্রকাশক: বিপিএল (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর পাবলিশিং লিমিটেড)
প্রচ্ছদ: স্যাম
ইলাস্ট্রেশন: মোস্তাফিজুর রহমান
মূল্য: ৫৫০ টাকা
পৃষ্ঠা: ৩২৬
প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারী ২০১৫

বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গনে চলমান বইমেলা উপলক্ষ্যে বিশেষ ছাড়ে এ বইসহ বিপিএল-এর অন্যান্য বইও কেনার ‍সুযোগ পাবেন আগ্রহী ক্রেতারা। যারা অনলাইনে অর্ডার দিয়ে বিপিএল-এর বই কিনতে আগ্রহী তারা এই লিংকটি দেখতে পারেন:http://bpl.bdnews24.com/index.php/

বিডিনিউজ

Comments are closed.