শ্রীনগরে খাল দখলের বেপরোয়া প্রতিযোগিতা

আমিনুল ইসলাম মাছুম: আড়িয়াল বিলে বিমান বন্দর ও পদ্মা সেতু নির্মানের ঘোষণার পর থেকে শ্রীনগরের জায়গা জমির দাম বেড়ে যাচ্ছে হু হু করে। এ সুযোগে ভূমি খেকোরা সরকারী খাস ও অর্পিত সম্পত্তি দখলের পাশাপাশি খাল দখলের বেপরোয়া প্রতিযোগীতায়ও মেতে উঠেছে। শ্রীনগর উপজেলার অধিকাংশ খাল এখন ভূমি দস্যুদের দখলে। তারা সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে দখলের মহোৎসবে নেমে পড়েছে। দখলদারদের কবলে পড়ে নাব্যতা হারিয়ে মরে যাচ্ছে, শ্রীনগর গোয়ালীমান্দ্রা খাল। ভয়াবহ দখলের কারণে অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে দেউলভোগ হরপাড়া খাল ও গড়িয়া ভাঙ্গা ধোপাবাড়ীর খাল।

উপজেলা সদরের দুই কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত এসব খালের দুপাশের সরকারী জায়গা দখল করে প্রভাবশালীরা পাকা বাড়ীঘর ও দোকানপাট নির্মান করছে। স্থানীয় প্রশাসনের নাকের ডগায় এসব ঘটলেও তারা না দেখার ভান করে বরং আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে। এতে একদিকে পরিবেশ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শন করা হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারের বেহাত হয়ে যাচ্ছে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি। বৃটিশ আমলে পশ্চিম বিক্রমপুরের শ্রীনগর বাজার ঘেঁষে বয়ে যাওয়া বর্তমান গোয়ালীমান্দ্রা শ্রীনগর খালটি ছিল পদ্মা ধলেশ্বরীর সংযোগ রক্ষকারী। নদী সদৃশ্য ছিল বলে খালটিকে পদ্মার শাখা নদীও বলা হতো।

এ নদী দিয়ে বড় বড় লঞ্চ, বেপারীদের হাজার মুনী নৌকা আর মালবাহী ট্রলার চলাচল করতো। এছাড়া বোরো মৌসুমে গোয়ালীমান্দ্রা থেকে আড়িয়াল বিলের আলমপুর পর্যন্ত খালের দুপাশের প্রায় ৭৫ হাজার একর ধানি জমিতে পাওয়ার পাম্পের মাধ্যমে সেচ দেয়া হতো এ খাল থেকে। কিন্তু কালের বিবর্তনে অবৈধ দখলদারদের কড়াল থাবা আর সংস্কারের অভাবে ক্রমেই ভরাট হয়ে মরে যাচ্ছে এ খালটি। এক সময়ের বহতা এ খাল যৌবন হারিয়ে আজ যেন মরমর অবস্থা। বিগত ৫৩ বছরে খালটি খনন না করায় প্রতি বর্ষা মৌসুমে পদ্মা থেকে নেমে আসা পলিতে খালের দুপার ভরাট হয়ে চর পরে গেছে।

এ সুযোগে দখলবাজরা স্থানীয় প্রশাসনকে হাত করে নানা ছলে গিলে খাচ্ছে খালের জমি। সরজমিনে দেখা গেছে, শ্রীনগর লঞ্চঘাট থেকে দক্ষিণ পাইকশা পর্যন্ত খালের দুই পাড়ের জায়গা স্থানীয় প্রভাবশালীরা দখল করে নিয়েছে। ভূমি অফিসের এক শ্রেণীর কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যোগ সাজশে এসব খালের পাড় প্রভাবশালীরা দখল করে নিচ্ছে। একইভাবে দখল করে নিয়েছে শ্রীনগর বাজারের উত্তর দিকের ধোপাবাড়ী গড়িয়া ভাঙ্গা খাল এবং ভূমি অফিস সংলগ্ন পূর্ব দিকের দেউলভোগ হরপাড়া খালটি। বিশেষ করে হরপাড়া খালটি এমনভাবে ভরাট করা হয়েছে যার কোন চিহ্নই রাখা হয়নি। কেবল কালের স্বাক্ষী হয়ে হবি ডাক্তারের বাড়ীর পশ্চিম দিকের ব্রীজের রেলিং দুটি জেগে না থাকলে বুঝাই যেতনা এখানে একটি খাল ছিল।

এলাকাবাসীর কাছ থেকে জানা যায়, খালটির নাম নিশানা গায়েব করে দেয়ার জন্য দখলবাজরা কালের স্বাক্ষী ঐ ব্রীজের রেলিং দুটি ভেঙ্গে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করছে। কেউ কেউ আবার মামলার ভয়ে বাধা দিচ্ছে বলেও জানা গেছে। শ্রীনগরে খাল দখলের কৌশল হিসেবে দুই পাড়ের দোকানদার ও বাড়ী ওয়ালারা প্রথমে ময়লা আবর্জনা ফেলে কাঁচা পাকা খুটি দিয়ে ৩০ থেকে ৫০ ফুট পর্যন্ত লম্বা টংঘড় তৈরী করে। শুকনা মওসুমে খালের মাঝ খান থেকে অপরিকল্পিতভাবে মাটি কেটে টংঘরের নীচে কিংবা খালের পাড় ভরাট করতে থাকে। এরপর সুযোগ বুঝে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ফাউন্ডেশন দিয়ে তৈরী করে ফেলে পাকা স্থাপনা। তবে শ্রীনগর হরপাড়া খালটি বর্ষা মৌসুমে ভরাট হয়েছে ড্রেজারের বালি দিয়ে।

সম্প্রতি এ ধরনের খাল ভরাট যারা করেছে তাদের ব্যাপারে শ্রীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা যতন মার্মাকে জানালে তিনি লোক পাঠাবেন বলে আশ্বাস দেন। কার্যত কোন প্রশাসনিক পদক্ষেপ না থাকায় এখনো খাল দখলে স্বক্রিয় রয়েছেন ফৈনপুর ব্যাটারী কারখানার দক্ষিণে সাইদুল পাঠান, কামারখোলা পাকা ব্রীজের দক্ষিণ পূর্ব পাড়ে মাহবুব মোল্লা, মাশুরগাঁও বাদল ব্যাপারীর বাড়ীর দক্ষিণে আজমল হোসেন, পুরাতন ফেরী ঘাটের উত্তরে হারুন মোল্লা, ইদ্রিস মোল্লা, ফরহাদ মিয়াসহ আরও অনেকে খাল ভরাট করে বাড়ীঘর তৈরীসহ দখল প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

অথচ স্থানীয় প্রশাসনকে কেউ জানালেও কখনো মোবাইল কোর্ট কিংবা উচ্ছেদের ভূমিকায় যেতে দেখা যায়নি। এ অবস্থা চলতে থাকলে অন্যান্য খালের মত শ্রীনগর গোয়ালীমান্দ্রা খালটিও দু এক বছরের মধ্যে নালায় পরিনত হবে। ফলে বন্ধ হয়ে যাবে পানি নিষ্কাশনের একমাত্র পথ। সৃষ্টি হবে জলাবদ্ধতা। পরিবেশ হবে বিপর্যস্ত। অকাল বন্যায় আড়িয়াল বিলে ফসল ডুবির যে ঘটনা শুরু হয়েছে তা রূপ নিবে ধারাবাহিকতা। তাই অনতিবিলম্বে দখলদারদের কবল থেকে শ্রীনগর গোয়ালীমান্দ্রা খাল পুনরুদ্ধার করে ড্রেজিং এর মাধ্যমে বহতা করে তোলা শ্রীনগরবাসীর প্রাণের দাবি।

Comments are closed.