মিরকাদিমে মুসলিম ঐতিহ্যের নিদর্শন অবহেলায়

বাবা আদম মসজিদ
মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার মিরকাদিমের রামপালে (রেকাবি বাজার সংলগ্ন) অবস্থিত মসজিদটি স্থানীয়দের কাছে পুরাতন মসজিদ হিসেবেই বেশি পরিচিত। ভাঙাচোরা, অতি প্রচীন এই স্থাপনার কথা এখানে যে কাউকে বললেই দেখিয়ে দেবে। ছোট থেকে বৃদ্ধ সবাই চেনেন। সময় মতো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ হয়, কোনো মাইক নেই— মসজিদের বাইরে দাঁড়িয়েই দেওয়া হয় আজান। আশপাশের মুসল্লিদের নিয়েই নামাজে দাঁড়িয়ে পড়েন ইমাম।

এমনই পরিস্থিতি; কেবলই চলমান সময়। কিন্তু কালের গর্ভে দিন দিন যে ঢলে পড়ছে ঐতিহাসিক এ স্থাপনাটি তা-বা ক’জন স্মরণ করছেন! হযরত বাবা আদম (রা.) শহীদ মসজিদ ও সমাধিসৌধের প্রসঙ্গে এলাকাবাসীর উদাসীনতা বা অসচেতনতা যাই থাকুক না কেন, তার চেয়ে বেশি অন্তরিকতার অভাব প্রশাসন/সরকারের- বলছেন সচেতন অনেকেই। ৫৩২ বছর আগের এই মসজিদটি দৃঢ় কোনো সংরক্ষণ-সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ। যেন ইতিহাসের সাক্ষী নিজেই বিলুপ্ত ইতিহাসের পথে!

সুদূর সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরের তায়েফে জন্মগ্রহণ (১০৯৯ সালে) করেও ইসলাম ধর্ম প্রচারে ভারতবর্ষে এসেছিলেন ধর্ম চর্চাকারী বাবা আদম। উপমহাদেশে প্রখ্যাত সেন শাসনামলে ১১৭৮ সালে ধলেশ্বরী নদীর তীরবর্তী মুন্সিগঞ্জের মিরকাদিমে আসেন তিনি। সে সময় বিক্রমপুর তথা মুন্সিগঞ্জ ছিল বল্লাল সেনের একক রাজত্বে। হিন্দু সমাজে অারব থেকে অাসা এবং ধর্ম প্রচারের অপরাধে সেন বংশের দ্বিতীয় রাজা বল্লালের হাতে প্রাণ হারাতে হয় বাবা আদমকে। তিনি শহীদ হন, সে জন্য তাকে বলা হয় আদম শহীদ (রা.)।

তার মৃত্যুর পর মিরকাদিমের দরগাবাড়িতে দাফন সম্পন্ন হয়। ৩১৯ বছর সেভাবেই ছিল। পরে তার স্মৃতি এবং এই স্থানে ইসলাম প্রতিষ্ঠায় বিশেষ অবদানের কথা স্মরণ করে মাজারের পাশে উদ্যোগ নেওয়া হয় মসজিদ নির্মাণের। ১৪৮১ থেকে ১৪৮৭ সালের মধ্যে নির্মাণ করা হয় হযরত বাবা আদম মসজিদ।

মসজিদের ইমাম হাফেজ মওলানা ফরিদ হোসেন, এখানে কাজ করছেন দীর্ঘ দিন ধরে। ঐতিহাসিক এ মসজিদটি সম্পর্কে তিনি বাংলানিউজকে বলেন, মুসলিম ঐতিহ্যের যতোগুলো প্রচীন স্থাপনা রয়েছে তার মধ্যে এটি একটি। সারা উপমহাদেশের প্রাচীনতম মসজিদগুলোর একটি বাবা আদম মসজিদ। এখন যা বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের আওতায় রয়েছে, মূলত তারাই সংরক্ষণের দায়িত্বে।

তবে মিরকাদিমে উপমহাদেশের অন্যতম সেরা মুসলিম ঐতিহ্যের নিদর্শন যেন আবহেলায়, মসজিদটির সংরক্ষণে অবহেলা প্রসঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, এ নিয়ে সরকারের আরও অান্তরিক হওয়া দরকার।

ছয় গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদটির নির্মাণশৈলী মনোমুগ্ধকর। দৈর্ঘ্যে ৪৩ ফুট ও প্রস্থে ৩৬ ফুট। দেয়াল প্রায় চার ফুট চওড়া। ইট-সুরকি দিয়ে গাঁথা ভেতরে। নির্মাণ নকশা বা স্থাপত্যকলা অনুযায়ী মসজিদ ভবন উত্তর-দক্ষিণে লম্বা। সম্মুখে রয়েছে খিলান আকৃতির প্রবেশপথ। দুই পাশে সম আকারের দু’টি জানালা। সব মিলিয়ে দারুণ সমন্বয়। মসজিদের সামনে ওপরের দিকে রয়েছে ফারসি ভাষায় খোদাই করা কালো পাথরের ফলক। তবে বোঝা কষ্টকর। ভেতরে ঢুকে সামনে এগিয়ে গেলে চার কোনায় চারটি ত্রিভুজাকৃতির স্তম্ভ চোখ এড়াবে না। মসজিদের খিলান, দরজা, স্তম্ভের পাদদেশ, মেঝে ও ছাদের কার্নিশের নিচে ইট কেটে মুসলিম স্থাপত্যকলার অপূর্ব নকশাও পরিলক্ষিত হয়। সব মিলিয়ে শত অবহেলার মাঝেও মুগ্ধ করবে যে কাউকে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে মিলেছে নানা তথ্য। তারা বলেন, এই এলাকাকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। বৃদ্ধি করা যেতে পারে আনুসঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা। পাশেই ধলেশ্বরী নদী, এর থেকে একটু এগিয়ে এলেই বিখ্যাত এই ইসলামিক ঐতিহ্য। তারপর আবার রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র ২৫-৩০ কিলোমিটারের মধ্যে। সব মিলিয়ে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণীয় স্থান হতে পারে মিরকাদিম।

স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা বাদশা মিয়া (৪৯) বাংলানিউজকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে সরকারের ভেবে দেখার সময় এখনই। পৌর মেয়রও এটি নিয়ে কাজ করতে পারেন।

তার পাশেই বসে ছিলেন রহমত উল্লাহ (২৭), বিদেশি নাগরিকদের আগমনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, মাঝে-মধ্যেই এখানে বিদেশিরা আসেন। তাদের গবেষণার জন্য এটি একটি ভালো স্থাপনা। প্রচার-প্রচারণা বাড়ালে আরও প্রসার হবে, এমন দাবি করেন তিনি।

অাবদুল কাদের (৫২) বলেন, মুসলিম ঐতিহ্যের অন্যতম এই স্থাপনা সংরক্ষণে দায়িত্ব সবার। ততক্ষণে এসে বসলেন মো. শাহজাহান (৮০)। বয়স হয়েছে অনেক তার। অভিজ্ঞতা থেকে বললেন, ডাক টিকিটে এই মসজিদ দেখেছি মনে হয়। তাছাড়া তেমন কোনো সরকারি প্রচারণায় এটিকে দেখা যায়নি। অাপনাদের সাংবাদিকদের (বাংলানিউজ) মাধ্যমে মসজিদটি নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আসলে উপকার এই এলাকাবাসীরই।

প্রায় ৫৩২ বছর ধরে ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে মসজিদটি। কিন্তু মুসলিম ঐতিহ্যের চোখজুড়ানো এই শৈল্পিক স্থাপনার গায়ে কেবলই অযত্ন-অবহেলার ছাপ। ইতিহাসের পাঠ্য থেকে জানা যায়, তৎকালীন ভারতবর্ষে যে কয়টি প্রাচীন মসজিদ ছিল, সেগুলোর একটি বাবা আদম শহীদ মসজিদ। বাংলার সুলতান জালাল উদ্দিন ফতেহ শাহর শাসনামলে যা প্রতিষ্ঠা পায়।

ধর্ম প্রচারক বাবা আদম ইসলামী জ্ঞান সাধনায় বড় পীর হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)’র সাহচর্য পেয়েছিলেন। ইরাকের বাগদাদে তার শিক্ষার বিস্তৃতি। পরে সরাসরি চলে আসেন ভারতবর্ষ তথা বঙ্গ অঞ্চল বিক্রমপুরের (বর্তমান মুন্সীগঞ্জ) মিরকাদিমে।

ব্রিটিশ ভারতের প্রত্নতত্ত্ব জরিপ বিভাগ ১৯০৯ সালে একবার মসজিদটি সংস্কার করে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু এরপর আর তা তেমনভাবে যত্ন পায়নি। নানামাত্রিক ইতিহাস ঐতিহ্যের এই বাংলায় মুসলিম স্থাপত্যের বিশাল ঐতিহাসিক এক নিদর্শন কালের গর্ভে কেবলই বিলীন হবে, আর চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কিছু করার থাকবে না- এমনটা হতে পারে না। ঐহিত্য রক্ষার্থে তাই তো নূন্যতম উদ্যোগ প্রশাসনের কাছে কাম্য— স্থানীয়দের।

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর

Comments are closed.