পৌরসভা নির্বাচন: অবরুদ্ধ মানু, ফুরফুরে বিপ্লব

নেসারুল হক খোকন ও আরিফ-উল ইসলাম: ধলেশ্বরী পাড়ের মুন্সীগঞ্জ পৌরসভায় নির্বাচনী প্রচারণার জন্য বের হতেই পারছেন না বিএনপি প্রার্থী একেএম ইরাদত মানু। প্রচারণায় নামলেই তার সমর্থকদের হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে। এমন অভিযোগ এনে তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছেও অভিযোগ দিয়েছেন। মানু ঢাকার অদূরে অবস্থিত এ পৌরসভার বিদায়ী মেয়র। সোমবার দলীয় কার্যালয়ে জিম্মি ছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

জানা গেছে, রোববার দুপুরে শহর জামে মসজিদ এলাকায় প্রচারণার সময় আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কর্মীদের হাতে সাবেক উপমন্ত্রী ও জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল হাই লাঞ্ছিত হন। মূলত এরপর থেকেই বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে আতংক বিরাজ করছে। এ নিয়ে এলাকার পরিবেশও কিছুটা থমথমে। তবে নির্বিঘ্নে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী মো. ফয়সল বিপ্লব। বঙ্গবন্ধুর প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা, জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি, জেলা পরিষদের প্রশাসক আলহাজ মো. মহিউদ্দিনের বড় ছেলে তিনি। এ পৌরসভায় মেয়র পদে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই প্রার্থীর মধ্যেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে মনে করেন ভোটাররা।

এদিকে রোববারের ঘটনার বিষয়ে ইরাদত মানু ওই দিনই প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। এতে উল্লেখ করা হয়, নির্বাচনী প্রচারণাকালে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের কর্মীরা নির্বাচনে গণসংযোগ করলেই হত্যা করা হবে বলে হুমকি দেন। এ ঘটনায় মুন্সীগঞ্জের মানুষ আতংকিত এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে সন্দিহান। তাই জানমালের নিরাপত্তা রক্ষায় অবিলম্বে দোষীদের গ্রেফতারের দাবি জানানো হয়।

সোমবার সরেজমিন মুন্সীগঞ্জ পৌরসভায় গিয়ে জুবলি রোড সুপার মার্কেট চত্বরে বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে গিয়ে পাওয়া যায় বিএনপির প্রার্থী ও পৌর বিএনপির সভাপতি একেএম ইরাদত মানুকে। জানতে চাইলে যুগান্তরকে তিনি বলেন, ‘প্রচারণায় তো বেরই হতে পারছি না। এখন কার্যালয়ে অবরুদ্ধ আছি।’ কারা অবরুদ্ধ করেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর কর্মীদের হাতে আমিসহ নেতাকর্মীরা অবরুদ্ধ। হামলার ভয়ে প্রচারণায় বের হতে সাহস পাচ্ছি না।’ অভিযোগের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পদক্ষেপ নেয়া হলে তো প্রচারণায় নামতে পারতাম। কার্যালয়ের সামনে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা মহড়া দিতে পারত না।’ তিনি বলেন, ‘জেলার সর্বজন শ্রদ্ধেয় নেতা জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল হাইসহ অন্তত ২০ জন রোববার প্রতিপক্ষের হামলায় আহত হয়েছেন। এ অবস্থায় পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিয়ে অগ্রসর হব।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুন্সীগঞ্জ পৌর নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত রিটার্নিং অফিসার ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ফজলে আজিম সোমবার যুগান্তরকে বলেন, ‘অভিযোগ পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে ম্যাজিস্ট্রেটসহ পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু কাউকে পাওয়া যায়নি। দলীয় কার্যালয়ে বিএনপির মেয়র প্রার্থী অবরুদ্ধ কেন জানতে চাইলে রিটানিং কর্মকর্তা বলেন, তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না। তার কাছে কেউ কোনো অভিযোগও করেননি।

এদিকে সোমবার দিনভর প্রচারণা চালান আওয়ামী লীগ প্রার্থী ও আওয়ামী লীগের উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক মো. ফয়সল বিপ্লব। এ সময় তাকে বেশ প্রফুল্ল দেখা যায়। বেলা ৩টার দিকে বিপ্লবের সঙ্গে কথা হয় তার মধ্য কোটগাঁওয়ের বাসায়। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে যুগান্তরকে তিনি বলেন, ‘রোববারের ঘটনার শুনে আমি শহর জামে মসজিদ মার্কেট এলাকায় যাই। সেখানে গিয়ে আমি কিছুই দেখতে পাইনি। তবে শুনেছি জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল হাই নৌকা প্রতীক নিয়ে স্ল্যাং ল্যাঙ্গুয়েজ (অশ্লীল শব্দ) প্রয়োগ করেন। আমাদের কর্মীরা এর প্রতিবাদ জানান। নৌকা প্রতীক নিয়ে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে উভয়পক্ষই আনারস, বেল এবং আপেল ছোড়াছুড়ি করেন। সেখানে ফলমূলের দোকান ছিল।’

বিএনপি প্রার্থীকে অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তিনি অবরুদ্ধ হবেন কেন? এসব অভিযোগ ঠিক নয়। আবদুল হাই প্রচারণায় নামার কারণেই আসলে সমস্যা হয়েছে। তিনি জেলা বিএনপির সভাপতি। তিনি বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে কেন প্রচারণায় নামলেন? এ বিষয়ে বিপ্লব আরও বলেন, আমার বাবাও তো জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। কই তিনি তো আমার পক্ষে প্রচারণায় বা ভোট চাইতে কোথাও যাননি। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মানু কাকা (বিএনপি প্রার্থী) ডিজঅনেস্ট নন। আসলে তার আশপাশে কিছু লোক আছেন যারা গত ৫ বছর পৌরসভাকে লুটেপুটে খেয়েছেন। কোনো উন্নয়নই হয়নি। তাই এবার উন্নয়নের জন্যই পৌরবাসী আমাকে সমর্থন দেবেন বলে আশা করছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি যদি মেয়র পদে নির্বাচিত হই তাহলে প্রথম সপ্তাহেই এলাকাকে মাদক মুক্ত করব। কারণ এ মাদকই সব অপকর্মের মূল। এছাড়া একটি আধুনিক পৌরসভা হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন আমার দীর্ঘদিনের। নির্বাচিত হলে সরকারের কাছ থেকে অনুদান আনার যথেষ্ট সুযোগ আছে আমার।’

জানা গেছে, ২০১০ সালে অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনেও মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান বিপ্লব। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কারণে রাজনৈতিকভাবেও এলাকায় মহিউদ্দিনের প্রভাব রয়েছে। কিন্তু তিনি জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল হাইয়ের কাছে বারবার হেরে গেছেন। ১৯৮৬ সালে বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় সেবারই প্রথম এমপি হন মহিউদ্দিন আহমেদ। বর্তমানে তিনি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। তার আরেক ভাই আনিসুজ্জমান আনিস সদর উপজেলা চেয়ারম্যান।

বিপ্লব এবারও পৌরসভায় মেয়র পদে প্রার্থী হয়েছেন। জেলায় এ পরিবারের ব্যক্তি ইমেজ থাকলেও পৌর নির্বাচনে জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল হাই এখনও বড় ফ্যাক্টর।

এ বিষয়ে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, ‘আবদুল হাই ২০১০ সালের নির্বাচনে ইরাদত মানুর পক্ষে ভোট চাইতে মাঠে নামার সুবাদেই তিনি মেয়র নির্বাচিত হতে পেরেছিলেন। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আবদুল হাই যার পক্ষে মাঠে নামবেন তিনিই হবেন মুন্সীগঞ্জের পৌরপিতা। যে কারণে আবদুল হাই যাতে প্রচারণায় নামতে না পারেন সে চেষ্টাই করা হচ্ছে।’

এ বিষয়ে সোমবার রাতে আবদুল হাই যুগান্তরকে বলেন, ‘মুন্সীগঞ্জ বিএনপির শক্ত ঘাঁটি। দলীয়ভাবে যাকে সমর্থন দেয়া হয়েছে ব্যক্তি হিসেবেও তার যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় আওয়ামী লীগ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ভয় পাচ্ছেন। যে কারণে নিরীহ বিএনপি কর্মীদের ওপর হামলা চালিয়ে ঘায়েল করার চেষ্টা করছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘রোববারের ঘটনায় আমরা বিস্মিত। আজ (গতকাল সোমবার) কার্যালয়ে ছিলাম অবরুদ্ধ। অভিযোগের পর পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হল আজ আর আপনার মাঠে নামার প্রয়োজন নেই। কাল (আজ) থেকে আবার শুরু করেন।’ আবদুল হাই বলেন, ‘কর্মীদের নিরাপত্তার বিষয় চিন্তা করে আমরা আজ প্রচারণায় নামিনি। কারণ প্রচারণায় নেমে যদি একটি দুর্ঘটনা ঘটে তাহলে পুলিশ বিএনপি কর্মীদেরকেই হয়রানি করবে।’ সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপি প্রার্থীই বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হবেন বলে দাবি করেন আবদুল হাই।

৪৬ হাজার ভোটার সমৃদ্ধ মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার যাত্রা শুরু ১৯৭২ সালে। স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রথম শ্রেণীর পৌরসভা হলেও এলাকার উন্নয়ন তেমন একটা হয়নি। তাই ভোটারদের মধ্যে কিছুটা অসন্তোষ লক্ষ্য করা গেছে। মুন্সীগঞ্জ পৌরসভায় ৯টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে প্রার্থী ৪১ জন। ৩টি সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদের মধ্যে ১, ২ ও ৩নং ওয়ার্ডে নার্গিস আক্তার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। এ ছাড়া মেয়র পদে স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন রেজাউল ইসলাম সংগ্রাম। সোমবার তিনি মোবাইল ফোন প্রতীক বরাদ্দ পেয়েছেন।

যুগান্তর

Comments are closed.