জাপান: ‘উত্তরণ’-এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন

রাহমান মনি: জাপানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের দ্বারা গঠিত দুটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের একটি হচ্ছে ‘স্বরলিপি বাংলাদেশি কালচারাল একাডেমি’ এবং অপরটি ‘উত্তরণ বাংলাদেশ কালচারাল গ্রুপ’, জাপান।

স্বরলিপি গত ১১ অক্টোবর সাড়ম্বরে পালন করেছে তাদের ২৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। আর তারই এক মাস পর এবং ঠিক একই হলে উত্তরণ পালন করল তার ২৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। জাপানের মতো দেশে একটি সংগঠন জনপ্রিয়তা অক্ষুণœ রেখে ২৭ বছর চালিয়ে নেয়াটা যে সহজ নয়, একবাক্যে সবাই তা স্বীকার করবেন।

২৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য আয়োজন করা হয়েছিল বর্ণাঢ্য এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। ২২ নভেম্বর রোববার টোকিওর কিতা সিটি তাকিনোগাওয়া কাইকানে আয়োজিত এই বর্ণিল আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দূতাবাস চার্জ দ্য এফেয়ার্স (সি.ডি.এ) জীবন রঞ্জন মজুমদার।

বরাবরের মতো উত্তরণ এবারও নির্দিষ্ট সময়ে অনুষ্ঠান শুরু করে। শুরুতেই শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন গ্রুপ ম্যানেজার মো. নাজিম উদ্দিন, সি.ডি.এ জীবন রঞ্জন মজুমদার এবং দলনেতা জাহিদ চৌধুরী।

শুভেচ্ছা বক্তব্যের পর শুরু হয় মূল আকর্ষণ অর্থাৎ সাংস্কৃতিক পর্ব। সাংস্কৃতিক পর্বটিকে ঢেলে সাজানো হলেও কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া দর্শক হৃদয় জয় করতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে উত্তরণ। ২৭ বছরের পরিপূর্ণ একটি গ্রুপের কাছে দর্শকের প্রত্যাশার পরিমাণটা একটু বেশিই বলা যায়। সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে দর্শক গ্যালারিতে গুঞ্জন শোনা গেছে। শুরুটাই হয়েছে বাংলাদেশে নারী সমাজের নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে ‘চিৎকার কর মেয়ে’ কোরাস গেয়ে যার ধারা বর্ণনা দেয়া হয় জাপানি ভাষাতেও। এতে করে জাপানে বাংলাদেশের সামাজিক পরিবেশে নারী সমাজের অবস্থানের কী ম্যাসেজ দেয়া হলো বলে দর্শকসারিতে গুঞ্জন শোনা গেছে।

শরাফুল, রুমি, ছুটি, মিথুন, গোমেজ, রতন, মামুন, তুলি এবং বাচ্চুর গান দর্শক হৃদয় স্পর্শ করতে পেরেছে নিঃসন্দেহে। দর্শক উপভোগ করেছেন শিশুদের (রুহি, রামিশা, শ্রেয়া, মিহি, মাহা, রিবু, দীপ্ত, সৌমিত, গোধুলী) দলীয় নাচটি। তবে সবকিছু ছাড়িয়ে দর্শক মাতিয়েছেন মিথুন ও তার ছেলে শব্দ। রকস্টার খ্যাত শব্দ সত্যিকার অর্থেই রকস্টার পারফরম্যান্স উপহার দেয় এবং দর্শকদের তাক লাগিয়ে দেয়।

শত ব্যস্ততা সত্ত্বেও প্রবাসীরা এসব আয়োজনে সমবেত হন মনোরঞ্জনসহ বিনোদনের জন্য। সেই ক্ষেত্রে দেশাত্মবোধক, ফোক, রবীন্দ্র সংগীত, নজরুল গীতি, ব্যান্ড কিংবা ক্লাসিক্যাল যে গানই হোক না কেন জনপ্রিয় এবং একই সঙ্গে কমন গানগুলো পরিবেশন করা হলে দর্শকরাও ঠোঁট মেলাতে পারেন, আনন্দে আন্দোলিত হন, ওয়ান মোর, ওয়ান মোর বলে আবেদন করেন। আর যতই ভালো বা অর্থবোধক হোক না কেন অজানা গান দর্শক বিদেশের মাটিতে বসে শুনতে আগ্রহ প্রকাশ করে না। এক্ষেত্রে উত্তরণ মুনশিয়ানার পরিচয় দিতে পারেনি।

দলনেতা জাহিদ চৌধুরীর রচনা ও নির্দেশনায় নাটক ‘মামা, মামী এবং সেলফি’র কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেন জাহিদ চৌধুরী, মিথুন এবং নবাগত ছোটন। মিথুন এবং জাহিদ ভালো করবেন এটাই স্বাভাবিক এবং করেছেনও তাই। নবাগত ছোটনও খুব ভালো করেছেন। নাটকটিতে সম্প্রতি জাপানে প্রবাসীদের হল পেতে যে বিড়ম্বনার শিকার হতে হয় তার কারণগুলো সুনিপুণভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম প্রধান ছিল হলের ম্যানার না মানার বিষয়টি। যদিও ওই সময় জনৈক কতিপয় ব্যক্তি হলের বাইরে অবস্থান করছিলেন নাটকের বিষয়বস্তুর ওপর বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে। এইসব লোকের কারণে প্রবাসীদের জন্য জাপানের হলগুলো সীমিত হচ্ছে।

২৭তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে উত্তরণ একটি সুভেনির বের করে। রাষ্ট্রদূতের বাণী, লিডার, ম্যানেজারের বক্তব্য, কবিতা, বিগত দিনের কার্যক্রম, সদস্যর ছবি, শুভেচ্ছা বাণী এবং বিজ্ঞাপন পাওয়া গেলেও সম্পাদক ও সম্পাদনা পাওয়া যায়নি।

সবশেষে বিভিন্ন সংগঠন, দর্শকদের ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত হওয়ায় ধারাবাহিকতার ছন্দপতন ঘটে, হঠাৎ সঞ্চালনা ক্যুতে, বাপ্পা দত্ত এবং মৌ দত্ত সঞ্চালনার দায়িত্ব পালন করলেও হঠাৎ করে ম্যানেজার কর্তৃক সঞ্চালনা ক্যু করে নিজ পছন্দের বিজ্ঞাপন দাতাদের অতি পরিচিত এবং বিশেষ সুবিধা ছিল, নিন্দনীয়, অশোভনীয় এবং দৃষ্টিকটু। ইহাকে কেবলই সঞ্চালনা বা উপস্থাপনা ক্যু-ই বলা যায়। কিন্তু দরকারটা কী ছিল তা বোধগম্য নয়।
rahmanmoni@gmail.com

সাপ্তাহিক

Comments are closed.