বলিউডের আমিরের ওপর আক্রমণ ও সাম্প্রতিক ভারত

পূরবী বসু: বহুদিন আগে আমি নিউ ইয়র্কের এক ম্যাগাজিনে (পরিচয়) একটি দীর্ঘ নিবন্ধ লিখেছিলাম। বলাবাহুল্য, সেই কাগজটি প্রায় তিরিশ বছর ধরে প্রকাশিত হয়ে চলেছে্ নিউ ইয়র্ক শহরে। আজও প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত প্রকাশ পায় ‘পরিচয়’, তবে আগের মতো ম্যাগাজিনের আকারে নয়, ট্যাবলয়েড খবরের কাগজের অবয়বে। আগস্ট ১৯৯৩ সালে লেখা আমার সেই নিবন্ধটির শিরোনাম ছিল, ‘দেশপ্রেমের পরীক্ষা আর দিতে চাই না’। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে, বহুদিনের জমাটবাঁধা গভীর হিমশীতল কতগুলো কষ্ট বুকে ধারণ করে, কিছুটা আবেগতাড়িত হয়ে লেখাটি লিখেছিলাম। প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, দেশের প্রতি আমার টান-মমতা-ভালোবাসা খাঁটি বা অন্তর্গত কিনা তা প্রমাণ করার চেষ্টা আর আমি করব না। ওটা আমার নাগরিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না।

কাগজটির সম্পাদক নাজমুল আহ্‌সান, আজও স্বস্থানে আসীন, খুব যত্নসহকারে প্রচ্ছদে বড় বড় হরফে আমার লেখার শিরোনাম ছাপিয়ে ম্যাগাজিনের কভার স্টোরি হিসেবে লেখাটি মুদ্রিত করেছিলেন। আর তাই আমির খানের আজকের মনোবেদনা আর কেউ বুঝুক না বুঝুক্, আমি হাড়ে হাড়ে টের পাই। আমি বাংলাদেশের সাধারণ এক নাগরিক। আমির খানের মতো সুপারস্টার যখন এমন এক অসহিষ্ণুতার শিকার হন, যখন প্রকাশ্য জনসভায় চরমপন্থী এক রাজনৈতিক দলের নেতা বুক ফুলিয়ে ঘোষণা করেন আমির খানকে মারা প্রতিটি চড়ের জন্যে এক লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে, তখন মনে প্রশ্ন জাগে, আমরা মধ্যযুগে বাস করছি না একবিংশ শতাব্দীতে? তখন মনে হয়, এরপর মুখ খুলে নিজের বা পরিবারের সদস্যের নিরাপত্তাজনিত আশঙ্কার কথা বলার সাহস বা প্রবৃত্তি আর কি হবে কারও? বিশেষ করে কোনো লঘু সম্প্রদায়ের?

কেবল এই বছরেই আমার নিজের দেশে পর পর যে বীভৎসতা ঘটল, তাতেও কষ্টে পাথর বনে যাই। লজ্জায়-দুঃখে মাথা গুঁজবার জায়গা খুঁজে পাই না আর। শুধু কি আমির খানের কাছেই পরিস্থিতি অসহিষ্ণু মনে হয়েছে? তাই যদি সত্যি হত, শুধুমাত্র এই বিষয়ের ওপর কথা বলার জন্যে কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীকে ছুটে যেতে হত না রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির কাছে। এছাড়া ওখানকার অন্য সুপারস্টাররা, এমনকি পৃথিবীবিখ্যাত সংগীতজ্ঞ এ আর রহমান, যিনি এবং যাঁর পরিবার এই সেদিনও অর্থাৎ এই জীবনেই, এই প্রজন্মেই, এই শতকেই ভারতের সংখ্যাগুরু ছিলেন এবং পারিবারিক এক গভীর সংকটকালে স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন, তিনিও এই অসহিষ্ণুতার উত্তাপ টের পেয়েছেন এবং শঙ্কিত হয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন।

তবে আমির খানকে নিয়ে সর্বশেষে লুধিয়ানাতে যা হল, তারপর এ আর রহমান কেন, অহিন্দু কেউ হয়তো আর সাহস করে মুখ খুলে নিজের প্রকৃত অনুভূতি বা উদ্বেগ প্রকাশ করবেন না। কিন্তু সেটাই কি শুভ হবে ডিজিটাল ইন্ডিয়ার জন্যে? অন্যায়ের প্রতিবাদ না করা, সহিষ্ণুতার অভাব অস্বীকার বা অগ্রাহ্য করাই কি শহুরে ভদ্রতা? দেশপ্রেমিক নাগরিকের কর্তব্য? তাতে যে বহির্বিশ্বে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ইনফরমেশন টেকনোলজিতে ভারতের অসামান্য সাফল্য ও কীর্তির গাথা বহুল পরিচিত– সাহিত্য, সংস্কৃতি, দর্শনের জন্যে পৃথিবীময় এ দেশটির এত যে সুনাম-সমাদর– মাইক্রোসফট এবং পেপসির মতো অগুনতি সব বিশাল বহুজাত কোম্পানির প্রধান নির্বাহী পদে যেখানে মাথা উঁচু করে অধিষ্ঠিত হয়ে আছেন ভারত-সন্তানগণ– সে ভারতের আজ এ কী চেহারা? এ কী দশা?

আপন দেশের নাগরিককে কেবল ‘সংখ্যায় লঘু’ এই দোষে তাঁর ব্যক্তিস্বাধীনতা, তাঁর পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা এবং নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কথা নির্ভয়ে প্রকাশ করার মতো মৌলিক বাকস্বাধীনতাটুকু পর্যন্ত দেও্য়া হবে না? এটা যদি অসহিষ্ণুতা না হয়, অসহিষ্ণুতা তাহলে কাকে বলে? মুখের খাবার কেড়ে নিয়ে মানুষকে হত্যা করার পর আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠে এক-আধজন আমতা আমতা করে যদি বলে, ‘কাজটা আসলে হয়তো খুব ভালো হয়নি’, সেই সঙ্গে ঘটা করে নি্ষিদ্ধ খাদ্য প্রকাশ্যে আনুষ্ঠানিকতার সঙ্গে যদি ভক্ষণ করে, তাহলেই কি সব দায় সারা হয়ে যাবে? সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? (এই প্রসঙ্গে পুরস্কার ফিরিয়ে দেও্য়াসহ ওখানকার বুদ্ধিজীবীদের সরব প্রতিবাদের প্রশংসা অবশ্যই করি আমি)।

আর প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মি্ডিয়াকেও বলি– বাপু, তিলকে তাল করতে অথবা তিল ছাড়াই তাল বানাতে এত সিদ্ধহস্ত যখন আপনাদের, সেটা জরুরি অবস্থার সময়েও ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করতে দেখি না কেন কখনও? নিরপেক্ষতার নামে তখন তো সত্য ঘটনাই বর্ণনা করা হয় সবিস্তারে, খোলা আগুন দাউ দাউ করে ছড়িয়ে দিতে যা গান পাউডারের মতোই সাহায্য করে। গণমাধ্যমকে প্রশ্ন করি, সর্বদা বিরোধ জাগিয়ে রেখে, বিতর্ক উস্কে দিয়ে, বৈষম্যের চিড় আরও গভীর করে, ব্যক্তিমানুষের মনোকষ্ট বাড়িয়ে দিয়ে, তাঁর জীবন বিপন্ন করার ঝুঁকি সৃষ্টি করে এ কী ধরনের পেশাগত দায়িত্ব পালন করছেন আপনারা?

আর ইন্টারনেটের সব সোশ্যাল মিডিয়ার কথা কী বলব। যদিও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে আজ আমিও তা ব্যবহার করি। আংশিক সত্যের সঙ্গে বহু রকম মিথ্যে গুলিয়ে খাওয়াতে খাওয়াতে আজ আমরা ছাপার অক্ষরে নির্ভেজাল সত্য দেখতে ভুলে যাচ্ছি। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর কথা, আমরা কেউ এখন জানি না কোন্‌টা সত্য, কোনটা মিথ্যে প্রতিবেদন, কোনটা সঠিক, কোনটা বানোয়াট তথ্য। মানুষের জীবন, বিশ্বাস আর অনুভূতি নিয়ে ছিনিমিনি খেলার মতো নিষ্ঠুরতা আর কিছু হয় না।

ভাবি, আমরা সকলেই কি অপ্রকৃতিস্থ কিংবা পুরোপুরি বেসামাল বা নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছি? আজ যা ঘটে চলেছে আমার দেশসহ চারপাশে সর্বত্র, তাতে মনে প্রশ্ন জাগে বৈকি, মানুষ হিসেবে আমাদের যুক্তি, বুদ্ধি, সহমর্মিতা কি সম্পূর্ণ লোপ পেয়ে গেছে? অগ্রগামী সভ্যতার রথটি গায়ের জোরে উল্টোমুখী করে চালিয়ে আমরা কি তাহলে আদিমতায় ফিরে যাচ্ছি?

আ্রমির খানকে ধন্যবাদ, এত কিছুর পরও তিনি পুনঃপুনঃ তাঁর আপন প্রত্যয় ব্যক্ত করছেন। জোর দিয়ে নিজের অধিকার, মাতৃভূমির প্রতি তাঁর ভালোবাসা প্রতিষ্ঠা করছেন দেশ ছেড়ে কোথাও যাবেন না এই দৃঢ় অঙ্গীকারে। আমির খানের সমাজ-সচেতনতার সাক্ষ্য হিসেবে বৈচিত্র্যময় ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু সামাজিক সমস্যার ওপর তাঁর কয়েকটি টক শো দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার ভারতীয় টেলিভিশনে। সেইসব বিষয়ে তাঁর অবস্থান, তাঁর নাগরিক দায়বদ্ধতা, সাহসী প্রতিবেদন আমাকে মুগ্ধ করেছে। তাই বলি, আমির, কারও সাধ্য নেই জীবনের ভয় দেখিয়ে, মিথ্যে অপবাদ দিয়ে বা অনর্থক অপমান করে তোমাকে তোমার দেশ থেকে, তোমার কোটি কোটি ভক্তের হৃদয় থেকে উৎখাত করার। জন্মসূত্রে এ অধিকার তুমি অর্জন করেছ। তাই গলা খুলে তুমি গাইতে থাক, ‘যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক, আমি তোমায় ছাড়ব না মা’।

কিন্তু তুমি তো আবার বাংলা জান না। এ গান গাইবে কী করে? তা নইলে হয়তো বলতাম নির্মলেন্দু গুণের সেই কবিতাটার দুটি লাইনই না হয় মনে মনে আউড়ে ফেল:

তাড়াতে তাড়াতে তুমি কতদূর নেবে?
এই তো আবার আমি ফিরে দাঁড়িয়েছি।

আজ আমি বিক্রমপুরের পূরবী বসু, দীপনের মা (আমার একমাত্র পুত্রের নামও দীপন), আরেক দীপনের (নিহত) বাবার বিপন্ন কণ্ঠের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে বলি, যে যেখানে থাকুক, সবার মধ্যে মানবিকতা জেগে উঠুক। শুভবুদ্ধির উদয় হোক। মনুষ্যত্বের জয় হোক। শান্ত হোক সকলে। ধৈর্য, সহনশীলতা বাড়ুক। শান্তি বর্ষিত হোক ধরায়।

সাংস্কৃতিক বিভাজন, বৈষম্যের জয়গান আর নয়; পারস্পরিক মিল ও ঐক্যের কথা বলি আজ। বহু নিরপরাধ মানুষের রক্তে ভেসেছে এই মাটি। আমরা আর রক্ত দেখতে চাই না। শান্তি চাই, স্বস্তি চাই, সকল মানুষের মঙ্গল চাই, সবার জন্যে ন্যায়ের শাসন চাই।

আমাদের দেশের বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক শামসুদ্‌দীন আবুল কালাম তাঁর পরিণত জীবনের বেশিরভাগ সময় রোমে স্বেচ্ছা-নির্বাসনে কাটিয়েছেন। আমার অতি সৌভাগ্য, তাঁর জীবনের শেষ ষোল বছর আমার সঙ্গে তাঁর পত্র-যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। রোমের শহরতলির ছোট্ট পরিপাটি এক চিলেকোঠার ঘরে তাঁর নিঃসঙ্গ মৃত্যুর অব্যবহিত আগে, ১৯৯৬ সালে, আমাকে লেখা তাঁর শেষ দুটি চিঠি তিনি সমাপ্ত করেছিলেন তাঁর প্রিয় অকালপ্রয়াত কবি আবুল হাসানের একই কবিতার কয়েকটি লাইন দিয়ে। আমিও আমার এই ছোট্ট লেখা শেষ করছি সেই একই উদ্ধৃতি দিয়ে:

একদিন শোনাবে তুমি এদেশের সেই রূপকথা
শঙ্খমালা, রাজপুত্র, শস্যসালা, আহা মরি,
আরও কত কিছু।
সব গিয়ে তবু কিছু থাকে
একদিন আমদেরও ভালোবাসা হবে
ভালোবাসা হোক,
যে যেখানে আছে ভালো হোক
তালুর ভেতর তামাদগ্ধ দেশ তুলে বলি,
ভালো হোক, যে যেখানে আছে ভালো হোক।

বিডিনিউজ

Comments are closed.