দীপন ভাই, মাফ করবেন আমাকে

রাহমান মনি: গত ৩১ অক্টোবর শনিবার সন্ধ্যার পর থেকে আজ (৫ নভেম্বর বৃহস্পতিবার) পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রিন্ট মিডিয়া, অনলাইন পত্রিকায় যে নামটি একাধিক হেড লাইন হিসেবে স্থান পেয়ে পত্রিকার পাতাজুড়ে আছে তার নাম দীপন, ফয়সাল আরেফিন দীপন। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ থেকে ডিগ্রি নেয়া একজন মেধাবী এবং একই সঙ্গে পরিশ্রমী ও সৎ ছাত্র হিসেবেই বন্ধু মহলে পরিচিতি পেয়েছিলেন দীপন। এখন কেবলই স্মৃতি।

হ্যাঁ, অত্যন্ত পরিশ্রমী মেধাবী ও সৎ দীপন আজ পরিবার, বন্ধু মহলে চেনা জানাদের মধ্যে কেবলই স্মৃতি হয়ে আছেন। ৩১ অক্টোবর ২০১৫ শনিবার সন্ধ্যায় নিজ প্রতিষ্ঠানের স্বীয় কক্ষে কিছুসংখ্যক দুষ্কৃতকারী তাকে স্মৃতির পাতায় স্থান করে নিতে বাধ্য করেছে। ৩১ অক্টোবর সন্ধ্যার পর ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াগুলো ব্রেকিং নিউজ হিসেবে, প্রিন্ট মিডিয়া অনলাইন সংস্করণে বিশেষ বুলেটিন হিসেবে স্থান সংবাদ পরিবেশন শুরু করে। এরপর নড়েচড়ে বসে সরকারের গোয়েন্দা বিভাগগুলো। সাংবাদিকদের ছুটোছুটি করতে হয় আজিজ সুপার মার্কেট পরিবাগ এবং ঢাকা মেডিকেলের মর্গ পর্যন্ত।

বাসায় থাকা অবস্থায় প্রতি মুহূর্তের সংবাদের ওপর চোখ রাখা আমার একটি অভ্যাস। রাত তখন সাড়ে ৯টারও কিছু বেশি (জাপানে) আমাদের সময় ডট কম হঠাৎই চোখে পড়ে দীপন হত্যার কথা। বিশ্বাস হয় না বিধায় আরও কয়েকটি পত্রিকায় অনলাইন সংস্করণে ব্রাউজ করি।

আধুনিক যুগের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক খোলামাত্র প্রিয় সম্পাদক গোলাম মোর্তোজা ভাইয়ের স্ট্যাটাসটি পড়ি। পড়ে মনে হলো দীপন ভাই আক্রান্ত হয়েছেন এটা সত্যি তবে গোলাম মোর্তোজা ভাই যখন নিশ্চিত করেননি (প্রথম স্ট্যাটাসে) তখন কিছুটা আশার আলো আশা জাগে। তাছাড়া একই দিন শুদ্ধস্বরের প্রকাশক টুটুলসহ আরও দুজনকে আক্রমণ করা হয়েছে। তারা তো আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। খোদার কাছে বলি, খোদা তুমি তো সব কিছুই পার। দীপন ভাইকে তুমি না হয় তোমার অলৌকিক ক্ষমতার বলে ফিরিয়ে দাও অন্তত তার পরিবারের প্রতি সদয় হয়ে। বাবা-মা, স্ত্রী সন্তানদের কাছে।

ফয়সাল আরেফিন দীপন ভাই আমার তেমন কেউ নন। আবার অনেক কিছুই। বন্ধু, ছোট ভাই, শুভাকাক্সক্ষী সর্বোপরি আপাদমস্তক একজন ভালো মানুষ। দীপন ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় পর্বটা শুরু হয় ২০০৩ সালের প্রথম দিকে। খুব সম্ভবত কাজী ইনসান ভাইয়ের মাধ্যমে। এরপর গোলাম মোর্তোজা ভাইয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সূত্রে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। দীপন ভাইয়ের আরেক বন্ধু ড. তুরীন চৌধুরীও লেখালেখি সূত্রে আমার বন্ধুর খাতায় স্থান পায়। দীপন ভাইয়ের একপর্যায়ে পরিচয় সূত্রে বন্ধু থেকে নিজের অজান্তেই একান্ত বন্ধু হয়ে যান। গোলাম মোর্তোজা, ড. তুরীন চৌধুরী এবং ফয়সাল আরেফিন দীপন আবার কলেজ জীবনের সহপাঠী।

দীপন ভাইয়ের সঙ্গে প্রথম প্রথম ফোনেই আলাপ হতো বেশি। পরে এসএমএস, ই-মেইল সর্বশেষ ফেসবুক। তবে ফোনের আলাপ বন্ধ হয়নি। কমেছিল মাত্র। যতই এসএমএস, ই-মেইল বা ফেসবুকে চ্যাটিং হোক না কেন, ফোন আলাপের হৃদ্যতা কখনো পূরণ হবার নয়। এক সময় আমাদের মধ্যে মনি ভাই কিংবা দীপন ভাই থেকে উভয় উভয়কে বস বলে সম্বোধন করা শুরু হয়ে গেল।

দীপন ভাই খুব তাড়া দিতেন। বই বের করার তাড়া। বলতেন, বস একটা বই বের করেন। রসিকতা করেই বলতাম, বস বই বের করা তো আপনার কাজ, আপনিই তো প্রকাশক, আমি তো নই। আমি বই বের করব কীভাবে? দীপন বলতেন আরে বস্ বের তো আমিই করব। আপনার বই। আপনি লিখবেন সে বই।
আমি?
হ্যাঁ, আপনি।
কীভাবে সম্ভব? আমি তো লেখক নই। আমি যা লিখি তা তো রিপোর্ট। সমসাময়িক বিষয় নিয়ে। আনন্দ পাই, সময় কাটে, প্রবাসের খবর দেশের মানুষকে জানান দিই। রুটি রোজগারের জন্য নয়।

তাছাড়া আমার লেখা তো বই বের করার মতো উপযুক্তও নয়।
আরে না মনি ভাই, আপনি আপনার কবিতাগুলো পাঠাবেন। সব কবিতা একটি ফাইল করে পাঠিয়ে দেবেন। ব্যাস, আপনার কাজ শেষ। যা করার আমিই করে নেব।
আমার কবিতা?
কেন নয়? আপনি তো ভালোই লেখেন, বাস্তবধর্মী বক্তব্য থাকে এবং শেষটাতে উপসংহারও থাকে। আরে ভাই পাঠানতো। বই আকারে বের হবার পর সত্যিই অবাক হবেন। ভালো লাগবে। পাঠকও গ্রহণ করবে।

আমি জানি বন্ধুবাৎসল্য স্বপ্নভাষী দীপন ভাই আমাকে উৎসাহ দেয়ার জন্য এই বই বের করতে চাচ্ছেন। আমার মতো অনেক প্রবাসী বাঙালিকেই তিনি উৎসাহ দিয়ে থাকেন। ব্যবসাটা তার কাছে মুখ্য নয়।

একদিন কথা প্রসঙ্গে জানতে চাইলাম, আচ্ছা বস্ সত্যি করে বলেন তো, আমার বা আমার মতো প্রবাসীদের কাঁচা লিখা কি সত্যিই বই বের করার উপযুক্ত? ব্যবসায়িক লস্ হয় না?

সেদিন দীপন ভাই উত্তর দিয়েছিলেন, মনি ভাই, আপনারা কেউ কেউ ২০/৩০ বছর ধরে দেশের বাইরে অবস্থান করার পরও যেভাবে বাংলা সাহিত্য চর্চা করছেন, নিজ ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা দেখাচ্ছেন তা অতুলনীয়। আপনাদের প্রতি এমনিতেই শ্রদ্ধা চলে আসে। আপনাদের কোনো বই বের করতে পারলে কিছুটা হলেও সেই শ্রদ্ধার প্রতি সম্মান দেখানো বা মূল্য দেয়া ধরে নিতে পারেন।

প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে বাংলা একাডেমি আয়োজিত ২১ বইমেলা আসলে দীপন ভাই খুব বেশি ব্যস্ত হয়ে যেতেন। এর মধ্যেও সময় বের করে লেখা পাঠাবার তাগিদ দিতে ভুলতেন না।

আমিও পরবর্তীতে পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে দীপন ভাইকে মেসেজ পাঠাতাম কাজের উৎসাহ জুগিয়ে। ৩-৪ দিন পর উত্তর দিতেন, বস্ আপনার ভাবীকেও সময় দেয়ার সুযোগ নেই। পোলাপান দুইটার সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলার মতো সময়ও পাচ্ছি না। আপনি খালি দোয়া করেন আল্লাহ শরীরটা সুস্থ রাখেন যেন। আপনার দোয়া কাজে লাগবে।

সর্বশেষ গত বইমেলায় (২০১৫) বই বের করার কথা দিয়েছিলাম দীপন ভাইকে। ডিসেম্বর ’১৪ বাংলাদেশ যাওয়ার সময় ৭২টি কবিতার পাণ্ডুলিপি সঙ্গে করে নিয়েছিলাম ও কিন্তু নিজের কবিতা পড়ার পর শব্দ চয়ন, বাক্য গঠন এবং বানানরীতি দেখার পর আবারও পিছ পা হই। সাত-পাঁচ ভেবে উদ্যোগ নেয়া হয়নি। দীপন ভাইয়ের সঙ্গে দেখা না করে জানুয়ারিতে চলে আসি।

দেখা না করে চলে আসতে দীপন ভাই কষ্ট পেয়েছিলেন। ফোন করার পর বলেছিলেন, মনি ভাই, আপনার সঙ্গে কি আমার সম্পর্ক কেবলি বই বের করার জন্য। এর চেয়ে বেশি কিছু নয় কি?

পরিচয় হবার পর থেকে যতবারই বাংলাদেশে এসেছিলেন, ততবারই আপনি আমার বাচ্চাদের জন্য কিছু না কিছু নিয়ে এসেছেন জাপান থেকে। জিনিসটা বড় নয়। আপনি যে আমার সন্তানদের কথা মনে রাখেন এটাই তো অনেক কিছু। এভাবে পালিয়ে যাবেন তা ভাবতে পারিনি।

কিছুটা সত্য, কিছুটা অর্ধ সত্য বলে বোঝবার চেষ্টা করেছি। কিন্তু দীপন ভাই ঠিকই বুঝে নিয়েছিলেন যে, এবারও বই বের করার ইচ্ছা ছিল না বলেই পালিয়ে চলে এসেছি।

দীপন ভাইয়ের সঙ্গে সরাসরি প্রথমবার দেখা হয়েছিল ২০০৭ সালের একুশের বইমেলাতে। জাগৃতি প্রকাশনী স্টলে। প্রথম দেখাতেই বুঝে নিয়েছিলাম, অত্যন্ত সুঠাম দেহের এই সুদর্শন যুবকটি বন্ধুসুলভ একজন আন্তরিক মানুষ। প্রচণ্ড ব্যস্ততার মধ্যেও অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গেই সেদিন তিনি আমাদের সময় দিয়েছিলেন। একটু দেরি করে আসার জন্য অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছিলেন। আরও বলেন, মনি ভাই আপনার যতগুলো ইচ্ছা ততগুলো বই নিয়ে যান। তিনি জানতেন আমি বইপাগল একজন মানুষ। দেশে গেলেই বই যোগাড়ে নেমে পড়ি।

দীপন ভাইকে জানতাম উঁচু মনের অত্যন্ত ভালো এবং অমায়িক একজন মানুষ।

সৃজনশীল এই মানুষটি সাহিত্য চর্চায় কেবলই উৎসাহ দিয়ে গেছেন। নিজ উদ্যোগে অনেক প্রবাসীকেই তিনি উৎসাহ জুগিয়েছেন।
অর্থ কামানোর পেছনে তিনি ছোটেননি। অর্থের প্রতি তার লোভ-লালসা ছিল না। যেটুকু না হলেই না হয় সেটুকু জোগানের ব্যবস্থা করতে পারলেই তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও দেশের বাইরে যাননি। অর্থের সন্ধানে। দেশের প্রতি, ভাষার প্রতি অপরিসীম মায়া ছিল তার। আর এ কারণেই তিনি চেয়েছিলেন দেশে থেকেই কিছু করতে এবং যে পেশায় থাকলে সৎভাবে বেঁচে থাকা যাবে সম্মানের সঙ্গে, সেই রকম একটি পেশাকেই বেছে নিয়েছিলেন উচ্চ শিক্ষিত হয়ে এবং অন্যান্য যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও।

হয়তো শিক্ষানুরাগী পরিবারে জন্ম নেওয়াতে পারিবারিক বলয় কিছুটা কাজও করেছে এ ক্ষেত্রে। তার পিতা বিশিষ্ট লেখক অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য একজন শিক্ষক তেমনি দীপনের স্ত্রী রাজিয়া রহমানও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন চিকিৎসক।

এই দুনিয়াতে সবচেয়ে ভারী বস্তু হচ্ছে পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ। ৭৬ বছর বয়স্ক একজন অধ্যাপক পিতা ৪৩ বছর বয়স্ক একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে যখন বলেন, আমি কোনো বিচার চাই না। আমি চাই শুভবুদ্ধির উদয় হোক। যারা ধর্ম নিরপেক্ষতা বাদ নিয়ে রাজনীতি করেন বা করছেন, যারা রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছেন, উভয়পক্ষ দেশের সর্বনাশ করছেন, উভয় পক্ষের শুভবুদ্ধির উদয় হোক। এটুকুই আমার কামনা। জেল-ফাঁসি দিয়ে কী হবে? দু’একজনকে জেল ফাঁসি নয়, আমি চাই সমাজের পরিবর্তন। তখন আর তিনি কেবল সন্তানহারা একজন পিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেন না, হয়ে ওঠেন মহীয়সী। মহাত্মা গান্ধী কিংবা নেলসন ম্যান্ডেলার পক্ষেই কেবল ওই রকম উক্তি শোনা যেত।

সন্তানের লাশ ভূ-পৃষ্ঠে রেখেই যে পিতা সমগ্র জাতির কথা চিন্তা করে এমন উক্তি করতে পারেন, সেই মনীষী পিতার আহ্বানের মূল্য আমাদের রাজনীতিবিদরা কীভাবে দিলেন। স্বপ্রণোদিত হয়ে আমাদের ঘাড়ে চেপে থাকা সেই সব নেতার প্রতি ঘৃণা জানাতেও ঘেন্না হয়। কী চরম পরিহাস, কী নিষ্ঠুরতা একজন সন্তানহারা পিতার প্রতি। সভ্য সমাজে কি তা ভাবা যায়?

হাতজোড় করে মাথাবনত চিত্তে ক্ষমা চাচ্ছি ভাই আপনার কাছে। কথা দিয়েও কথা রাখতে পারিনি বলে। বই বের করতে না পারায় গ্লানি আমাকে যতটা না কুরে কুরে খাচ্ছে তার চেয়েও ঢের বেশি যন্ত্রণা পাচ্ছি আপনাকে না বলেই চলে আসত। এবং পরবর্তীতে আপনি যখন বললেন যে আমার সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কেবল বই

বের করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, তার চেয়ে বেশি।
আপনার আন্তরিকতার মূল্য অনুধাবন করতে পারিনি।
ক্ষমা করবেন আমাকে, ক্ষমা করবেন আমাদেরকে!

আল্লাহ নিশ্চয়ই আপনাকে তার হেফাজতে ভালো রেখেছেন, ভালো রাখবেন।

রাহমান মনি : সাপ্তাহিক-এর জাপান প্রতিনিধি
rahmanmoni@gmail.com

সাপ্তাহিক

Comments are closed.