জাপানে শারদীয় দুর্গাপূজা পালিত

রাহমান মনি: শঙ্খ, উলুধ্বনি, ঢাক-কাঁসরের বাদ্য-বাজনা, পূজারি-ভক্তদের পূজা-অর্চনা, অঞ্জলি প্রদান, প্রসাদ বিতরণ, পূজা বিষয়ক আলোচনা, ভক্তিমূলক গান, সন্ধ্যা আরতি এবং সব শেষে বিষাদের ছায়ায় মা দুর্গাকে বিদায়ের মধ্য দিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা পালিত হয়েছে জাপানে। সার্বজনীন পূজা কমিটি জাপানের এবারের আয়োজন ছিল ২০তম। টোকিওতে ছিল এ আয়োজন।

বাংলাদেশে ১৮ অক্টোবর রোববার ষষ্ঠীতে বোধনের মাধ্যমে দুর্গোৎসব শুরু হয়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মতে ওই দিন বোধনে ‘অরুণ আলোর অঞ্জলি’ নিয়ে আনন্দময়ী মা উমাদেবী গজে চড়ে মর্ত্যলোকে আসেন। ১৯ অক্টোবর সোমবার সব অশুভ শক্তিকে শোধন করে সব কিছু শুদ্ধে পরিণত করার মধ্য দিয়ে শুরু হয় মহাসপ্তমী। মঙ্গলবার মহাঅষ্টমীতে দেবীর কল্পারম্ভ ও কুমারীপূজা (বিহিত পূজা) করেন ভক্তরা। তিথি অনুযায়ী বুধবার ও বৃহস্পতিবার মহানবমী ও বিজয়া দশমী। ২২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার বিজয়া দশমীতে শোভাযাত্রা ও বিসর্জনের মাধ্যমে মহাময়ী-মমতাময়ী মা দুর্গা বা দেবী দুর্গতিনাশিনীকে কৈলাসে স্বামীগৃহে ফিরিয়ে দেয়া হয় বলে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস। নেচে গেয়ে আনন্দ উল্লাসের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে বিসর্জন দিলেও এই দিন সবার মাঝে এক বিষাদের ছায়া নেমে আসে। একটি বছরের অপেক্ষার পালা শুরু হয় দেবী দুর্গা ফিরে আসায়।

জাপানের মতো দেশে যেখানে ধর্মীয় আচার পুঙ্খানুপুঙ্খ পালন প্রায় অসম্ভব বিভিন্ন বাস্তবতার কারণে। তাই একদিনেই যাবতীয় ধর্মীয় আচার পালন করতে হয়। তাও আবার বন্ধের দিন। অর্থাৎ রোববার।

সার্বজনীন পূজা কমিটি জাপানের ২০তম আয়োজনটি ছিল টোকিওর কিতা সিটির আকাবানে কিতা কুমিন সেন্টারে। ২৫ অক্টোবর রোববারের এ আয়োজনে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে ঢাকের বোল, মন্ত্র পাঠ, কাঁসর ঘণ্টা, শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনির মাধ্যমে দেবী দুর্গার অর্চনা শুরু হয়। তারপর অঞ্জলি প্রদান, প্রসাদ ও ভোগ বিতরণ, পূজাবিষয়ক আলোচনা, শিশুদের অনুষ্ঠান, ভক্তিমূলক সংগীতানুষ্ঠান, সন্ধ্যাআরতি এবং সব শেষে মিষ্টি বিতরণ ও দেবী বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় পূজার কার্যক্রম। জাপানে নদীতে বির্সজন দেয়ার নিষেধাজ্ঞাজনিত কারণে প্রতীকী বিসর্জন দেয়া হয়। এবারের পূজা সর্বশ্রেণির প্রবাসীর উপস্থিতিতে পূজা সার্বজনীন রূপ পায়।
২০তম আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্রদূত মাসুদ-বিন-মোমেন।

তনুশ্রী বিশ্বাসের পরিচালনায় পূজা বিষয়ক আলোচনায় বক্তব্য রাখেন সার্বজনীন পূজা কমিটি জাপানের সভাপতি সুনীল রায়, সাধারণ সম্পাদক রতন কুমার বর্মন, সাংগঠনিক সম্পাদক অঞ্জন দাস এবং উপদেষ্টা সুখেন ব্রহ্ম।

শুভেচ্ছা বক্তব্যে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘প্রবাসে নতুন প্রজন্মকে বাংলাদেশের কৃষ্টি, ধর্মীয় সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য আমি আপনাদের ধন্যবাদ জানাই। স্বাধীন বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব সার্বজনীনভাবেই পালন করা হয়ে থাকে। যার মধ্যে দুর্গাপূজা অন্যতম। দুর্গাপূজা বাংলাদেশে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবে পরিণত হয়েছে। এই প্রবাসেও আপনারা ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও সম্প্রীতির যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তাতে আমি গর্ববোধ করি।

ববিতা পোদ্দারের পরিচালনায় শিশুদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে একঝাঁক শিশু-কিশোর অংশ নিয়ে তাদের প্রতিভার বিকাশ ঘটায়। কলির পরিচালনায় ও অংশগ্রহণে দলীয় নৃত্যটি দর্শক উপভোগ করেছে।

এছাড়াও উপস্থিত শিল্পীদের গান, আবৃত্তি এবং উত্তরণ ও স্বরলিপি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপহার দেয়।

দুর্গাপূজা উপলক্ষে তনুশ্রী বিশ্বাসের সম্পাদনায় ‘শারদীয়া’তে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রদূত মাসুদ-বিন-মোমেনের বাণী শোভা পায়। তবে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী দুটি যদি কেবল সার্বজনীন পূজা কমিটি জাপানের উদ্দেশ্যে হতো তা হলে আরও সমৃদ্ধ হতো।

বিদায় বেলায় আনন্দ-আমেজের মধ্যেও দেবীর বিদায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন ভক্তরা। কাঁসার ঘণ্টা বাজিয়ে ‘দুর্গা মায় কি জয়, মহা মায়া কি জয়, মাগো তুমি আবার এসো ধ্বনিতে প্রতীকী বিসর্জনে বিদায় জানান ভক্তরা।

rahmanmoni@gmail.com

সাপ্তাহিক

Comments are closed.